হালুয়াঘাটে ১৯ বছরের বিরোধের অবসান, পিবিআই তদন্তে ১৩১৩২ নং দলিল জাল প্রমাণ
বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৯:৫২ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার কৈচাপুর মৌজার ৬০ শতাংশ পৈত্রিক জমি নিয়ে দীর্ঘ ১৯ বছরের আইনি বিরোধের অবসানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে। আদালতের নির্দেশে তদন্ত শেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ১৩১৩২ নম্বর সাফ কবলা দলিলটি জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, দলিলটি প্রতারণার আশ্রয়ে প্রস্তুত এবং এতে দণ্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৬৯ ও ৪৭১ ধারার অপরাধের উপাদান রয়েছে। দীর্ঘদিন বহাল থাকা একটি দলিলের ভেতরের অসঙ্গতি উদঘাটনে এ তদন্ত নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, আর.ও.আর ও বি.আর.এস রেকর্ড অনুযায়ী নালিশি জমির প্রকৃত মালিক ছিলেন ইমন আলী মুন্সী। পৈত্রিক সূত্রে তার ছেলে আব্দুল গনি দীর্ঘদিন জমিটি ভোগদখলে রেখে কৃষিকাজ চালিয়ে আসছিলেন। তবে ১৯৮০ সালের ১৩ জুন নিবন্ধিত ১৩১৩২ নম্বর সাফ কবলা দলিলের ভিত্তিতে নেওয়াজ আলী মালিকানা দাবি করেন। অভিযোগ রয়েছে, ২০০৭ সালে ওই দলিলের ভিত্তিতে জমি দখলের চেষ্টা চালানো হলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলাও হয়।
দলিল বাতিলের দাবিতে ২০১৩ সালে আব্দুল গনি হালুয়াঘাট সহকারী জজ আদালতে মামলা করেন। আদালতে মহাফেজখানার রেকর্ড কিপার সাক্ষ্যে জানান, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের থাম বহিতে দলিলদাতার নামের স্থলে অন্য দুই ব্যক্তির নাম রয়েছে। তবুও মামলা খারিজ হলে জেলা জজ আদালতে আপিল করা হয়। পরবর্তীতে আব্দুল গনির ছেলে আব্দুল মোতালেব জাল দলিলের অভিযোগে ময়মনসিংহ সদর অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালত বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দেন।
পিবিআই, ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশে তদন্তভার অর্পণ করেন ইন্সপেক্টর মুসলেউদ্দিনের ওপর। তদন্তে সংশ্লিষ্ট দলিল, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নথি, খতিয়ান ও দাগ নম্বর পর্যালোচনায় গুরুতর অসঙ্গতি ধরা পড়ে। দলিলে দাতা হিসেবে মো. ইমান আলীর নাম উল্লেখ থাকলেও থাম বহিতে টিপসইয়ের পাশে দাতা হিসেবে অন্য দুই ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়। এছাড়া বাদীপক্ষের জমির খতিয়ান নম্বর ৭৮৪ হলেও বিতর্কিত দলিলে ৮৮৪ নম্বর খতিয়ান উল্লেখ রয়েছে। দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণেও গরমিল পাওয়া গেছে।
এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদনে মত দেন, প্রকৃত মালিকের অজ্ঞাতে ও প্রতারণার মাধ্যমে দলিলটি সৃজন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী আব্দুল গনি বলেন, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং সামাজিকভাবে হয়রানি ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকতে হয়েছে।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) হালুয়াঘাট উপজেলা শাখার সভাপতি বাবুল হোসেন বলেন, ভূমি সংক্রান্ত বিরোধে জাল দলিলের ঘটনা নতুন নয়; তবে প্রায় দুই দশক একটি জাল দলিল কার্যকর থাকা বিচারব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। তিনি পিবিআইয়ের তদন্তকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের পর এখন চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্টরা। ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে প্রতিপক্ষের লোকজন বাড়িতে না থাকায় তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
১৩৬ বার পড়া হয়েছে