রাজশাহীর চারটি আসনে বিএনপি-জামায়াতের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই
সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৭:৪৪ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজশাহীর ছয়টি সংসদীয় আসনে জমে উঠেছে নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ ভোটারদের মতে, অন্তত চারটি আসনে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে পারে বিএনপি। তবে বাকি দুইটি আসনে দলটির প্রার্থীরা তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও নয়টি উপজেলা নিয়ে গঠিত এ অঞ্চলে বর্তমানে ছয়টি সংসদীয় আসন রয়েছে। ২০০৮ সালের পুনর্গঠনের মাধ্যমে আসন সংখ্যা পাঁচ থেকে ছয়ে উন্নীত হয়। অতীত নির্বাচনের পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯১ সালে একটি আসনে আওয়ামী লীগ, একটি জাতীয় পার্টি এবং তিনটিতে বিএনপি জয়ী হয়। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সব আসনেই জয় পায় বিএনপি। তবে ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা চার নির্বাচনে রাজশাহীর সব আসন দখলে রাখে আওয়ামী লীগ।
অন্যদিকে, একসময় শক্ত অবস্থান থাকলেও ১৯৮৬ সালের পর আর জয় পায়নি জামায়াতে ইসলামী। তবে ৫ আগস্টের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চার দশক পর দলটি আবার নতুন কৌশলে মাঠে নেমেছে। বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির চেয়েও জামায়াতের প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগ বেশি চোখে পড়ছে বলে ভোটারদের অভিমত।
স্থানীয়দের মতে, রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর), রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর), রাজশাহী-৪ (বাগমারা) এবং রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর)—এই চারটি আসনে দলীয় কোন্দল, বিদ্রোহী প্রার্থী এবং জামায়াতের সক্রিয় অবস্থানের কারণে বিএনপির জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলটির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল শরীফ উদ্দীন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। শরীফ উদ্দীন নতুন মুখ হলেও তিনি প্রয়াত মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ছোট ভাই। অন্যদিকে, মুজিবুর রহমান ১৯৮৬ সালে এখান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং একাধিকবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে এখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে।
বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন দ্বিতীয়বার দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ, যিনি প্রথমবার দলীয় মনোনয়ন পেলেও টানা ২৭ বছর পবার হড়গ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিজ্ঞতা ও জনপ্রিয়তায় দুই প্রার্থী সমান হওয়ায় এখানে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ডি এম ডি জিয়াউর রহমান জিয়া। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের ডা. আব্দুল বারী সরদার। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জিয়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও ডা. বারীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি তাকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছে। ফলে এখানেও জমজমাট লড়াইয়ের পূর্বাভাস রয়েছে।
সবচেয়ে জটিল পরিস্থিতি এ আসনে। বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক নজরুল ইসলামের পাশাপাশি ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে মাঠে রয়েছেন ইসফা খায়রুল হক শিমুল ও প্রবাসী নেতা ব্যারিস্টার রেজাউল করিম। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী মনজুর রহমানও সক্রিয় প্রচার চালাচ্ছেন। একাধিক প্রভাবশালী প্রার্থী থাকায় এখানে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অপরদিকে রাজশাহী-২ (সদর) ও রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনে বিএনপির প্রার্থীরা তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছেন বলে মনে করছেন ভোটাররা।
রাজশাহী-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু এবং রাজশাহী-৬ আসনে আবু সাঈদ চাঁদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ দুই আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন যথাক্রমে ডা. জাহাঙ্গীর ও অধ্যক্ষ নাজমুল হক, যারা নির্বাচনী মাঠে নতুন মুখ।
রাজশাহী মহানগর জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি এমাজ উদ্দিন মণ্ডল বলেন, “রাজশাহীর ছয়টি আসনেই আমাদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। আমাদের প্রার্থীরা সৎ, যোগ্য ও জনপ্রিয়। মানুষ পরিবর্তন চায়, তাই আমরা ভালো ফলের আশাবাদী।”
অন্যদিকে রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, “রাজশাহী বিএনপির ঘাঁটি। আমাদের সব প্রার্থীই অভিজ্ঞ ও জনপ্রিয়। ফলে ছয়টি আসনেই বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিএনপি জয়লাভ করবে।”
সব মিলিয়ে রাজশাহীর ছয়টি আসনেই এবার জমজমাট নির্বাচনী লড়াইয়ের আভাস দেখা যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত কার পক্ষে যায় সেটিই এখন দেখার বিষয়।
১২৩ বার পড়া হয়েছে