শেরপুর-১: বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্রের লড়াই: কে হাসবে শেষ হাসি?
সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৬:৪২ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একেবারে শেষ মুহূর্তে শেরপুর-১ (সদর) আসনে জমে উঠেছে ত্রিমুখী লড়াই।
বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘিরে এখন চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে পথঘাট, বাজার ও মাঠ-সবখানেই একটাই প্রশ্ন, শেষ হাসি কে হাসবেন?
এ আসনে মোট ছয়জন প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ তিনজনকে ঘিরে। তারা হলেন-বিএনপি জোটের ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা, ১১ দলীয় জামায়াত জোটের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এবং বিএনপির বিদ্রোহী হিসেবে স্বতন্ত্র মোটরসাইকেল প্রতীকের প্রার্থী মো. শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
তফসিল ঘোষণার পর থেকেই শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত বইছে ভোটের গরম হাওয়া। মহল্লা, ইউনিয়ন ও গ্রামের চায়ের দোকানগুলোতে চায়ের ধোঁয়ার সঙ্গে জমে উঠছে নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ। প্রচারণা শেষ হলেও আলোচনা থামেনি-ত্রিমুখী এই লড়াইয়ের ফল কী হবে, সেটিই এখন সবার কৌতূহল।
বিএনপির প্রার্থী প্রিয়াঙ্কা: তরুণ নেতৃত্বে নতুন আশা
ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা শেরপুরের রাজনীতিতে এক নতুন চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। পেশায় চিকিৎসক, বয়সে তরুণ এবং নারী প্রার্থী হওয়ায় নারী ভোটারদের কাছেও তার আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে।
২০১৮ সালের নির্বাচনে জেলা বিএনপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও তার পিতা মো. হযরত আলী কারাগারে অন্তরিন থাকায় বিকল্প প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন তিনি। সে সময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী প্রার্থী, সাবেক এমপি ও হুইপ আতিউর রহমান আতিকের বিরুদ্ধে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলেন। ফলাফল অনুকূলে না এলেও দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন প্রিয়াঙ্কা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শেরপুর-১ আসনে দীর্ঘ ৪১ বছর ধরে বিএনপির কোনো সংসদ সদস্য নেই। প্রায় এক দশক ধরে ধানের শীষ প্রতীকও অনুপস্থিত ছিল। জোট রাজনীতির কারণে টানা দুইবার আসনটি জামায়াতকে ছেড়ে দেয় বিএনপি। সর্বশেষ ১৯৭৯ সালে খোন্দকার আব্দুল হামিদ বিএনপি থেকে নির্বাচিত হন। ১৯৮৩ সালে তার মৃত্যুর পর আর কেউ নির্বাচিত হতে পারেননি। শুধু ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সাবেক সচিব মো. নজরুল ইসলাম মাত্র ১৫ দিনের জন্য নামমাত্র এমপি ছিলেন। ফলে এবারের নির্বাচন বিএনপি সমর্থকদের কাছে বিশেষ আবেগ ও প্রত্যাশার।
জামায়াতের রাশেদুল: তৃণমূলভিত্তিক সংগঠক
দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী হাফেজ রাশেদুল ইসলাম ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সাবেক সভাপতি এবং ঢাকার ধানমন্ডি দক্ষিণ থানা জামায়াতের আমীর। ভদ্র, মার্জিত ও মিষ্টভাষী নেতা হিসেবে তার আলাদা ইমেজ রয়েছে।
এই আসনে অতীতে জামায়াতের হয়ে টানা চারবার নির্বাচন করেছেন কেন্দ্রীয় সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। যুদ্ধাপরাধের মামলায় তার ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর ধারণা ছিল পরিবার থেকেই প্রার্থী আসবেন। তবে তার পুত্র হাসান ইমাম ওয়াফী এবি পার্টিতে যোগ দেওয়ায় সেই সমীকরণ বদলে যায়।
পরবর্তীতে মাঠে সক্রিয় হন একই এলাকার বাসিন্দা রাশেদুল ইসলাম। তিনি দীর্ঘদিন তৃণমূল সংগঠন, সভা-সমাবেশ ও জনসংযোগে সক্রিয় ছিলেন। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে নানা মত, পথ ও ধর্মের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে সাধারণ মানুষের মাঝে প্রভাব বিস্তার করেন। শেষ পর্যন্ত ১১ দলীয় জোটের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচনে নেমে উল্লেখযোগ্য জোয়ার তুলতে সক্ষম হয়েছেন।
এদিকে এনসিপির প্রার্থী প্রকৌশলী লিখন মিয়া সময় স্বল্পতার কারণে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে না পারলেও পরে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে রাশেদুল ইসলামের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী মাসুদ: দলীয় বিভেদের সুযোগে মাঠে শক্ত অবস্থান
বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামেন জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় তাকে পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
তবে তিনি জোরালোভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে পরাজিত হলেও উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়ে আলোচনায় ছিলেন। দলীয় বিভেদের সুযোগে মাঠ পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী তার পক্ষে সক্রিয় হয়েছেন।
এছাড়া স্থানীয় রাজনীতির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অপর স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো. ইলিয়াস উদ্দিন নিজে নির্বাচন থেকে সরে গিয়ে প্রকাশ্যে মাসুদের পক্ষে কাজ শুরু করায় চরাঞ্চলের ভোটে বিভক্তি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
অন্যান্য প্রার্থী ও ভোটারদের দাবি
এ আসনে জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক মাহমুদুল হক মনি লাঙল প্রতীক নিয়ে কারাগার থেকে নির্বাচন করছেন। তবে মাঠ পর্যায়ে তার তেমন প্রভাব বা আলোচনা নেই।
মাঠের ভোটাররা উন্নয়নকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে রেললাইন স্থাপন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা।
প্রবীণ ভোটারদের ভাষ্য, ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে যিনি শেরপুরবাসীর প্রাণের দাবিগুলো সংসদে জোরালোভাবে তুলতে পারবেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত জয়ী হবেন।
সব মিলিয়ে শেরপুরের প্রতিটি বাজার ও জনপদে এখন নির্বাচনী উত্তাপ। অভিজ্ঞতা বনাম নতুন প্রজন্মের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কে জয়ী হবেন, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এবারের নির্বাচন যে শেরপুরবাসীর জন্য ব্যতিক্রমী ও ঐতিহাসিক হতে যাচ্ছে-এ বিষয়ে প্রায় সবাই একমত।
১৭৯ বার পড়া হয়েছে