মানিকগঞ্জে কোন উন্নয়নে নেই প্রশাসন, নির্বাচনের মাঠে কেবল প্রতিশ্রুতি
রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৪:০০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
মানিকগঞ্জ যেন কেবল নামেই জেলা। দৃশ্যমান উন্নয়ন নেই, দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত শহরজীবন, বন্ধ হয়ে গেছে শিল্পকারখানা-এমন বাস্তবতায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির বন্যা বইলেও আস্থা পাচ্ছেন না সাধারণ ভোটাররা। তাদের দাবি, মুখের কথা নয়,বাস্তব কাজই হবে ভোটের একমাত্র মানদণ্ড।
নির্বাচন ঘিরে ইতোমধ্যে মানিকগঞ্জ শহর, উপজেলা, ইউনিয়ন ও পাড়া-মহল্লায় সরব হয়ে উঠেছেন প্রার্থীরা। যেখানে যে সমস্যা, সেখানেই সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছেন তারা। তবে ভোটারদের ভাষ্য- সস্তা প্রতিশ্রুতিতে আর বিশ্বাস নেই, কার্যকর উদ্যোগ নিলেই মিলবে সমর্থন।
জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসন মানিকগঞ্জ-৩, যা সদর ও সাটুরিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত। এ আসনকে কেন্দ্র করে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। প্রার্থীরা গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন সমর্থন আদায়ে।
তবে জেলার দীর্ঘদিনের প্রধান সংকট গ্যাস। প্রায় ১৫ বছর ধরে এই সংকটে ভুগছেন বাসিন্দারা। গ্যাসের অভাবে বিসিক শিল্পনগরীর অধিকাংশ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। শিল্পায়নের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও গ্যাস সংকটের কারণে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এতে জেলার অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে।
প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা শেষ করলেও কর্মসংস্থানের অভাবে বাড়ছে বেকারত্ব। অনেক পরিবারে এটি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার অভাবে অনেক যুবক মাদকাসক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বারাহীচর এলাকার ষাটোর্ধ আবুল হাসেম বলেন, “নির্বাচন আসছে হাট-বাজারে গেলেই বোঝা যায়। কিন্তু প্রার্থীদের চোখে পড়ছে না। জীবনের শেষ সময়ে ব্যক্তিগত চাওয়া নেই, শুধু চাই দেশটা ভালোভাবে চলুক।”
পশ্চিম দাশড়া এলাকার গৃহিণী রাবেয়া বেগম বলেন, “প্রায় দশ বছর ধরে শহরে থাকি, কিন্তু গ্যাস পাইনি। শুনেছি আরও ৫-৭ বছর আগে থেকেই গ্যাস বন্ধ। জেলা শহরে গ্যাস নাই-এটা কল্পনাও করা যায় না। নির্বাচনের সময় সবাই প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু আমরা এখন কাজ দেখেই ভোট দেবো।”
বিসিক শিল্পনগর এলাকার কারখানাসংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানান, একসময় এই এলাকা ছিল জমজমাট। গ্যাস সংকটের কারণে অধিকাংশ কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শত শত শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। এতে জেলার অর্থনৈতিক চাকা প্রায় থেমে গেছে।
এদিকে প্রার্থীরাও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন ভোটারদের কাছে।
যুক্তফ্রন্ট মনোনীত (বাংলাদেশ জাসদ) প্রার্থী মোহাম্মদ শাজাহান আলী সাজু বলেন, “সাধারণ মানুষের কথা বলতেই নির্বাচনে এসেছি। বড় দলের বাইরে থেকেও জনগণের অধিকার নিয়ে রাজনীতি করছি। শ্রমজীবী, কৃষক ও নিম্ন আয়ের মানুষের সমর্থন পাচ্ছি। বিকল্প ও প্রগতিশীল রাজনীতির জন্য মোটরগাড়ি প্রতীকে ভোট চাই।”
খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ সাঈদ নূর বলেন, “মানবসেবার জন্য নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। সকল শ্রেণির মানুষকে নিয়ে মানবকল্যাণে কাজ করতে চাই।”
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আফরোজা খানম রিতা বলেন, “জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে প্রার্থী হয়েছি। সুখে-দুঃখে তাদের পাশে আছি এবং থাকব। দীর্ঘদিন পর মানুষ তাদের পছন্দের নেতৃত্বকে বেছে নেবে। মানিকগঞ্জের মানুষ ধানের শীষকে ভালোবাসে।”
উল্লেখ্য, মানিকগঞ্জ-৩ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখের বেশি। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯৯ হাজার ৩৯৮ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৬৬০ জন এবং একজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।
এ আসনে মোট ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন- বিএনপির আফরোজা খানম রিতা (ধানের শীষ), জাতীয় পার্টির আবুল বাশার বাদশা (লাঙ্গল), স্বতন্ত্র মফিজুল ইসলাম খান কামাল (সূর্যমুখী ফুল), খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ সাঈদ নূর (রিকশা), জাতীয় পার্টি (জেপি) মনোনীত মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিস (বাইসাইকেল), বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আতাউর রহমান আতা (ফুটবল), বাংলাদেশ জাসদের মোহাম্মদ শাজাহান আলী (মোটরগাড়ি), স্বতন্ত্র রফিকুল ইসলাম খান (মোটরসাইকেল) এবং ইসলামী আন্দোলনের শামসুদ্দিন (হাতপাখা)।
সব মিলিয়ে উন্নয়ন বঞ্চিত মানিকগঞ্জে ভোটারদের প্রত্যাশা একটাই-প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পরিবর্তন।
১৭৬ বার পড়া হয়েছে