গোপালগঞ্জ–৩ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা, আওয়ামী ভোটব্যাংক ঘিরে জল্পনা
শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১২:৫৫ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে ‘আওয়ামী লীগের দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জ–৩ আসনে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচন ঘিরে টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া উপজেলাজুড়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা ও হিসাব-নিকাশ। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ না নেওয়ায় তাদের ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক কোন দিকে যাবে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত গোপালগঞ্জ–৩ আসনে রয়েছে ২টি পৌরসভা ও ১৬টি ইউনিয়ন। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৮৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪০৩ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৫০ হাজার ৩৮০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন একজন। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে মোট ১০৮টি কেন্দ্রে।
স্বাধীনতার পর থেকে এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। একাধিকবার আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা বিপুল ভোটের ব্যবধানে এখান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা জামানত হারিয়েছেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ভিন্ন বাস্তবতায়।
এবার গোপালগঞ্জ–৩ আসনে বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ৬ জন দলীয় এবং ২ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। মাঠপর্যায়ে গণসংযোগ ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে মূলত ত্রিমুখী লড়াই হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
আলোচনায় থাকা তিন প্রার্থী হলেন—বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী, স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান হাবিব এবং অপর স্বতন্ত্র প্রার্থী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা জোরদার হচ্ছে। সভা-সমাবেশ, পথসভা ও ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের কাছে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তারা। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ভোট নিজেদের পক্ষে টানতে প্রার্থীদের তৎপরতা চোখে পড়ার মতো।
স্থানীয় ভোটারদের মতে, ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হওয়ায় দলটি নির্বাচনে না থাকলেও তাদের ভোটব্যাংক যেদিকে যাবে, ফলাফল মূলত সেদিকেই ঝুঁকবে। তবে এসব ভোটারের একটি বড় অংশ এখনো সিদ্ধান্তহীন। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এবং ঐতিহ্যগত ভোটাররা কেন্দ্রে এলে, যে প্রার্থী সেই ভোট পাবে—তিনিই বিজয়ী হবেন বলে মত ভোটারদের। এ আসনে আদর্শের চেয়ে ভোটব্যাংকের ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপির প্রার্থী এস এম জিলানী বলেন, “বিগত কয়েকটি নির্বাচনে ভোটাররা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেননি। ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিবেশ বদলেছে। এবার ভোটাররা নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারবেন। এতে বিএনপি জয়ী হবে বলে আমি আশাবাদী।”
স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, “এ আসনটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার জন্মস্থান হওয়ায় আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত। আমি বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রচারণা শুরু করেছি। নির্বাচিত হলে মিথ্যা মামলায় হয়রানি বন্ধ, স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন ও বেকার সমস্যা সমাধানে কাজ করবো।”
অপর স্বতন্ত্র প্রার্থী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক বলেন, “মানুষের কল্যাণে কাজ করার লক্ষ্যেই আমি প্রার্থী হয়েছি। নির্বাচিত হলে মিথ্যা মামলায় সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধে ভূমিকা রাখবো এবং এলাকার উন্নয়নে কাজ করবো। সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ আমার পক্ষে রয়েছে।”
সব মিলিয়ে, গোপালগঞ্জ–৩ আসনে এবারের নির্বাচন হতে যাচ্ছে ব্যতিক্রমী ও গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে ভোটারদের অবস্থান, সংখ্যালঘু ভোটের সমীকরণ এবং দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের শক্ত অবস্থান—সবকিছু মিলিয়ে এই আসনের ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
১২১ বার পড়া হয়েছে