প্রতিশ্রুতি ও প্রচারণায় সরগরম খাগড়াছড়ি, ১১ প্রার্থীর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই
বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১০:৫২ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জমে উঠেছে খাগড়াছড়ির নির্বাচনী মাঠ। উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতিশ্রুতি, গণসংযোগ, মিছিল-শোডাউন আর প্রচারণায় জেলা থেকে উপজেলা, গ্রাম ও পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে পড়েছে নির্বাচনী আমেজ।
দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে প্রার্থীদের তৎপরতা। ২৯৮ নম্বর খাগড়াছড়ি আসনে ১১ জন প্রার্থী নিজ নিজ প্রতীক ও কৌশল নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটে চলছেন।
এ আসনে উল্লেখযোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া (ধানের শীষ), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. এয়াকুব আলী চৌধুরী (দাঁড়িপাল্লা), স্বতন্ত্র প্রার্থী সমীরণ দেওয়ান (ফুটবল), ধর্ম জ্যোতি চাকমা (ঘোড়া), ইসলামী আন্দোলনের কাউসার আজিজী (হাতপাখা), বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির উশ্যেপ্রু মারমা (রকেট), গণঅধিকার পরিষদের দীনময় রোয়াজা (ট্রাক), জাতীয় পার্টির মিথিলা রোয়াজা (লাঙল), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. নুর ইসলাম (আপেল), বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মো. মোস্তফা (হারিকেন) এবং স্বতন্ত্র জিরুনা ত্রিপুরা (কলস)।
প্রার্থীরা নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং ক্ষমতায় গেলে কী করবেন—তা তুলে ধরে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছেন। ব্যানার, লিফলেট ও প্রতীক নিয়ে চলছে ব্যাপক প্রচারণা।
পাহাড়ের ভোটের সমীকরণ ভিন্ন
স্থানীয় ভোটারদের মতে, পাহাড়ের রাজনীতি সমতলের তুলনায় আলাদা। পাহাড়ি ভোটাররা সাধারণত ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট দেন। ফলে বাঙালি প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় ভোটের ফলাফল কোন দিকে যাবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। পাহাড়ি ও বাঙালি ভোটের সমীকরণ এবারের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিএনপির সক্রিয় প্রচারণা
সরকার পতনের পর থেকেই বিএনপি খাগড়াছড়িতে ধারাবাহিক মিছিল-শোডাউন ও গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়ার পক্ষে নেতাকর্মীরা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। দলটির দাবি, অতীতের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বিবেচনায় ভোটাররা আবারও ওয়াদুদ ভূঁইয়ার ওপর আস্থা রাখবেন। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমএন আবছার বলেন, “পাহাড়ের উন্নয়নের রূপকার ওয়াদুদ ভূঁইয়ার কোনো বিকল্প নেই।”
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের চমক
২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা সমীরণ দেওয়ান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামায় ভোটের সমীকরণে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। আঞ্চলিক সংগঠনের সমর্থন পাওয়ার গুঞ্জন থাকলেও এ বিষয়ে তিনি প্রকাশ্যে মন্তব্য করেননি।
জামায়াতের নীরব প্রচারণা
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট এয়াকুব আলী চৌধুরী নীরবে জনসেবামূলক কার্যক্রম ও গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি শান্তি, ন্যায়বিচার ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার করে ভোট চাইছেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন, মেডিকেল কলেজ স্থাপন এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
অন্যান্য প্রার্থীদের তৎপরতা
স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্ম জ্যোতি চাকমা ঘোড়া প্রতীকে পাহাড়ের প্রত্যন্ত এলাকায় প্রচারণা চালাচ্ছেন। ইসলামী আন্দোলনের কাউসার আজিজী হাতপাখা প্রতীকে আইনশৃঙ্খলা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন।
রকেট প্রতীকের উশ্যেপ্রু মারমা স্থানীয় কর্মসংস্থান ও টেকসই উন্নয়নের অঙ্গীকার করেছেন। জাতীয় পার্টির মিথিলা রোয়াজা লাঙল প্রতীকে শান্তিপূর্ণ বসবাস, নিরাপত্তা ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
প্রশাসনের প্রস্তুতি
নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে প্রশাসনও ব্যস্ত। জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার মো. আনোয়ার সাদাত, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এস. এম শাহাদাত হোসেন এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোস্তফা জাবেদ কায়সার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ জানান, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনী কাজ করছে।
ভোটার ও কেন্দ্রের তথ্য
খাগড়াছড়ি জেলার ৩ পৌরসভা, ৯ উপজেলা ও ৩৮ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১১৪ জন।
পুরুষ: ২,৮০,২০৬
নারী: ২,৭৩,৯০৪
তৃতীয় লিঙ্গ: ৪
মোট ভোটকেন্দ্র ২০৩টি। এর মধ্যে ৫৩টি দুর্গম কেন্দ্র, ৬৮টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ, ১২১টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৪টি সাধারণ হিসেবে চিহ্নিত। তিনটি কেন্দ্রে হেলিসোর্ট সুবিধা রাখা হয়েছে। সীমান্তবর্তী কেন্দ্র রয়েছে ২০টি।
সব মিলিয়ে প্রতিশ্রুতি, কৌশল ও সমীকরণের লড়াইয়ে এবারের খাগড়াছড়ি নির্বাচন হতে যাচ্ছে উত্তেজনাপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ- এমনটাই বলছেন স্থানীয়রা।
২১০ বার পড়া হয়েছে