জয়পুরহাট-১ আসনে দুই নারী প্রার্থীর লড়াই, মাঠে সক্রিয় গণসংযোগ
শনিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:৫৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়পুরহাট-১ (জয়পুরহাট সদর ও পাঁচবিবি) আসনে এবার ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা যাচ্ছে।
এ আসনে সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দুইজন নারী প্রার্থী। তারা হলেন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ মার্কসবাদী) মনোনীত প্রার্থী তৌফিকা দেওয়ান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেকুন নাহার শিখা।
বাসদ (মার্কসবাদী) থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তৌফিকা দেওয়ানের নির্বাচনী প্রতীক ‘কাঁচি’। তিনি ভোটের মাঠে ব্যাপক গণসংযোগ চালাচ্ছেন। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সমর্থন চাইছেন। এ সময় তার সঙ্গে রয়েছেন দলের জেলা সমন্বয়ক ও তার বাবা একরামুল হক। গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে তিনি কৃষক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন।
অন্যদিকে, স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেকুন নাহার শিখা ‘ঘোড়া’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। তিনি কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে গণসংযোগ ও পথসভা করছেন। একজন নারী প্রার্থী হিসেবে অন্তত একবার তাকে ভোট দিয়ে সংসদে পাঠানোর আহ্বান জানাচ্ছেন ভোটারদের কাছে।
নির্বাচন ও রাজনীতি প্রসঙ্গে তৌফিকা দেওয়ান বলেন, বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনে প্রার্থীরা জনগণের কাছে নানা প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাস দিয়েছেন। তবে বাস্তবতা হলো, গত ৫৪ বছরেও কৃষকদের ভাগ্যের মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। তার মতে, শুধু একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে-এ ধারণা মানুষের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে তিনি কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করে আন্দোলন গড়ে তুলতে চান, যাতে তারা নিজেদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সংগঠিত হতে পারেন। জয়পুরহাট অঞ্চলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে কৃষিভিত্তিক সমাজ গঠনের লড়াই চালিয়ে যেতে চান তিনি।
নারী প্রার্থী হিসেবে কোনো চাপ অনুভব করছেন কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তৌফিকা দেওয়ান বলেন, প্রচারণার ক্ষেত্রে সরাসরি কোনো চাপ না থাকলেও নারীর রাজনৈতিক অধিকার বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তার ভাষায়, নারীকে রাজনীতিতে এগিয়ে নিতে মানুষের আচরণ, মনোভাব ও সহযোগিতার ঘাটতি স্পষ্ট। তিনি উল্লেখ করেন, এ আসনে কোনো বড় রাজনৈতিক দল থেকে মনোনীত নারী প্রার্থী নেই। একজন নারী প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে আছেন, আর তিনি নিজে একটি রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী। তার মতে, নারীর রাজনৈতিক অধিকার প্রশ্নে এখনও দেশের মানুষের মধ্যে পর্যাপ্ত সচেতনতা তৈরি হয়নি। তিনি আরও বলেন, এখানে মন খুলে কথা বলার পরিবেশ খুব একটা ভালো নয়। মুক্তিযুদ্ধ বা চব্বিশের আন্দোলনের কথা বললেও ভিন্ন ভিন্নভাবে ট্যাগ দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে, ফলে সব বিষয় একসঙ্গে তুলে ধরার ক্ষেত্রে চাপ ও বাধা কাজ করে।
নির্বাচনের আচরণবিধি প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, রিটার্নিং অফিসার যে নিয়ম-কানুনের কথা বলেছেন, সব প্রার্থী তা মানছেন না। নারীর অধিকারের প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রতিটি দলের নির্বাচনে শতকরা ৫ ভাগ নারী প্রার্থী থাকার কথা থাকলেও কেউ তা মানছে না। একমাত্র বাসদ (মার্কসবাদী) এবারের নির্বাচনে ৩৪ জন প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে, যার মধ্যে ১০ জনই নারী।
নির্বাচনী ব্যয় প্রসঙ্গে তৌফিকা দেওয়ান বলেন, তিনি একজন কৃষকের সন্তান। তার কোনো অর্থ-বিত্ত বা বিত্তশালী পৃষ্ঠপোষকতা নেই। আত্মীয়-স্বজনের সহায়তায় তার নির্বাচনী ব্যয় পরিচালিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেকুন নাহার শিখা আগে পাঁচবিবি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। জুলাই আন্দোলনের পর সরকার পতনের প্রেক্ষাপটে তাকে ওই পদ থেকে অপসারণ করা হয়। এরপর তিনি সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে নামেন এবং এলাকায় এলাকায় গণসংযোগ শুরু করেন।
নারী প্রার্থী হিসেবে অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সাবেকুন নাহার শিখা বলেন, আমাদের সমাজে নারী হয়ে নির্বাচন করা অত্যন্ত কঠিন। নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। মুখে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নারীরা স্বাধীনভাবে কাজ করবে-এমন পরিবেশ এখনও গড়ে ওঠেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি জানান, একজন গৃহবধু হয়েও তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ নির্বাচন করছেন, যা অনেকের কাছে সহ্য হচ্ছে না।
ভোটার তালিকায় এক শতাংশ নামের গড়মিলের অভিযোগে তার প্রার্থিতা এক পর্যায়ে বাতিল করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি। তবে আপিল করে তিনি পুনরায় প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা আদায় করেন। তার মতে, নারীদের প্রতি সহযোগিতা এখনও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।
সাবেকুন নাহার শিখা বলেন, আগের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে পাঁচবিবির মানুষ বিপুল ভোটে তাকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেছিলেন। তবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পাননি। সে কারণে এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি দাবি করেন, এলাকায় তিনি ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন এবং আশা করছেন মানুষ এবার তাকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করবেন। নির্বাচিত হলে সন্ত্রাস দমন ও বেকার সমস্যা সমাধানে কাজ করার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন তিনি।
জয়পুরহাট-১ আসনে এবার মোট পাঁচজন প্রার্থী সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করছেন। এর মধ্যে বাসদ (মার্কসবাদী) থেকে ‘কাঁচি’ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন তৌফিকা দেওয়ান, একমাত্র স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী হিসেবে ‘ঘোড়া’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাবেকুন নাহার শিখা। এছাড়া বিএনপি থেকে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন মাসুদ রানা প্রধান, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন ফজলুর রহমান সাঈদ এবং বাসদ থেকে ‘মই’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মো. ওয়াজেদ পারভেজ।
এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৬৬ হাজার ২৭৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩১ হাজার ৯৮৩ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৩৪ হাজার ২৮৩ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ৮ জন।
১০৬ বার পড়া হয়েছে