ভেজাল ও নিম্নমানের কসমেটিকসের আগ্রাসন রুখতে কড়া নীতিমালার দাবি
বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ৪:৫৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে বক্তারা ভেজাল ও নিম্নমানের কসমেটিকস, হোমকেয়ার ও স্কিনকেয়ার পণ্যের ভয়াবহ আগ্রাসনের বিষয়টি তুলে ধরেন।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত সেমিনারে তারা বলেন, এই ভয়াবহতা দিন দিন বাড়ছেই। এ থেকে উত্তরণে নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সঠিক নীতিমালা বাস্তবায়ন করা ছাড়া বিকল্প নেই। জনসম্পৃক্ত এসব বিষয় নিশ্চিত করা না হলে চরম হুমকির মুখে পড়বে জনস্বাস্থ্য।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (ডিএনসিআরপি) ও অ্যাসোসিয়েশন অব স্কিন কেয়ার অ্যান্ড বিউটি প্রোডাক্টস ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অব বাংলাদেশ (এএসবিএমইবি)-এর যৌথ উদ্যোগে এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম।
সেমিনারের প্রধান অতিথি, ডিএনসিআরপি-এর মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ বলেন, ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্যের আগ্রাসন রোধে ব্যর্থ হলে আগামী প্রজন্ম মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। তিনি হালাল পণ্যের বৈশ্বিক বাজারের বিশাল সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করে বলেন, এই বাজারে প্রবেশে দেশের কসমেটিকস ও বিউটি পণ্যের অপরিসীম সুযোগ রয়েছে। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
মূল প্রবন্ধে ড. আইনুল ইসলাম বলেন, দেশে কসমেটিকস খাত এখনো অনেক উপেক্ষিত। কসমেটিকস শুধুমাত্র সাজসজ্জা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, সামাজিক কল্যাণ এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত। তিনি ভেজাল ও নিম্নমানের আমদানিকৃত পণ্যের ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরে বলেন, এ পরিস্থিতি দেশীয় শিল্পের বিকাশকে রুদ্ধ করছে। তিনি উল্লেখ করেন, ভেজাল পণ্য যদি আসল পণ্যের তুলনায় সস্তায় পাওয়া যায় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা কার্যকর না হয়, তাহলে খারাপ পণ্য ভালো পণ্যের বাজার দখল করে ফেলে।
এফবিসিসিআই-এর সাবেক পরিচালক ইসহাকুল হোসেন সুইট কসমেটিকস শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে আরোপিত ১২৭.৭২ শতাংশ শুল্ককে দেশের শিল্প বিকাশে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, উচ্চ শুল্কের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যা স্থানীয় শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে পিছিয়ে ফেলছে। তাই তিনি কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে নামমাত্র পর্যায়ে আনার দাবি জানান।
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের (আইবিএফবি) সহসভাপতি এম. এস. সিদ্দিকী ভোক্তাদের সর্বোচ্চ সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য ক্রয় থেকে বিরত থাকলেই এ ধরনের পণ্যের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
বাংলাদেশ কসমেটিকস অ্যান্ড টয়লেট্রিজ ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সাহিদ হোসেন বলেন, ভেজাল পণ্যের বিস্তার রোধ এবং দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো অপরিহার্য। তিনি আরও বলেন, শুল্ক কমালে শিল্প-উদ্যোক্তারা আরও বেশি বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন, যা শিল্পের টেকসই বিকাশে সহায়ক হবে। এছাড়া তিনি দেশীয় উৎপাদকদের স্বার্থ রক্ষায় বিশেষভাবে আমদানিকৃত কসমেটিকস ও বিউটি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করার পরামর্শ দেন।
এসএমই ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আলী জামান দেশীয় শিল্পের টেকসই বিকাশের স্বার্থে লাগেজ পার্টি বা অনানুষ্ঠানিক পথে পণ্য আমদানি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, লাগেজ পার্টির মাধ্যমে নিম্নমানের ও অনিয়ন্ত্রিত পণ্য দেশীয় শিল্পের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কঠোর নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. শারমিনা হক ভেজাল ও নিম্নমানের কসমেটিকস ব্যবহারের ভয়াবহ প্রভাবের দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এসব পণ্যের ক্ষতিকর প্রভাবে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে কেউ কেউ চরম হতাশায় আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছেন। তিনি সতর্ক করেন, এই ঝুঁকি এড়াতে ভোক্তাদের প্রথমেই সচেতন হতে হবে এবং ব্যবহৃত কসমেটিকস পণ্যের নিরাপদ ও মানসম্মততা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তিনি ভেজাল ও ক্ষতিকর পণ্যের বিস্তার রোধে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদারকি ও নজরদারি জোরদার করার আহ্বান জানান।
সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আজিজুল ইসলাম, উপ-পরিচালক আতিয়া সুলতান, বিএসটিআই-এর উপ-পরিচালক আলাউদ্দিন হুসাইন ও সিনিয়র সাংবাদিক মনোয়ার হোসেন।
১৬২ বার পড়া হয়েছে