দঙ্গলবাজির পৃষ্ঠপোষকতায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হুমকির মুখে: কামাল আহমেদ
মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ৪:৫২ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
দঙ্গলবাজিকে উৎসাহিত ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হলে দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা টিকে থাকার কোনো সুযোগ থাকবে না—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও ডেইলি স্টার-এর কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ।
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশে গণমাধ্যম সংস্কার: স্বাধীনতা, দায়িত্ব ও ক্ষমতার সমন্বয়’ শীর্ষক নীতি সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। সংলাপটির আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)।
কামাল আহমেদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীল কয়েকজন ব্যক্তি ‘মব’ শব্দটি ব্যবহার না করতে বলেছেন। সে ক্ষেত্রে একে ‘মব’ না বলে ‘দঙ্গলবাজি’ বলা যেতে পারে। কিন্তু যেভাবেই বলা হোক, এ ধরনের সহিংসতা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য ভয়ংকর হুমকি।
তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেউ মুখে তুলে দেয় না; এটি আদায় করে নিতে হয়। সাংবাদিকদের নিজেদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার থাকতে হবে। পাশাপাশি তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু ক্ষমতাসীন দল নয়, বিরোধী দলও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে—অতীতে যার উদাহরণ রয়েছে।
সংলাপে বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক—সব ধরনের গোষ্ঠীর কাছ থেকেই গণমাধ্যম আজ চাপের মুখে রয়েছে। কামাল আহমেদ সাংবাদিকদের পেশাগত ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে বলেন, সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোর মধ্যে ঐক্য না থাকায় স্বাধীন সাংবাদিকতা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
আলোচনায় একাধিকবার প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের প্রসঙ্গ উঠে আসে। এ বিষয়ে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ডেইলি নিউ এজ-এর সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, এসব ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ‘মব’ সহিংসতা নয়, বরং সুপরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধ হামলা।
নূরুল কবীর বলেন, দূর থেকে সংগঠিতভাবে হামলা পরিচালনা করা হয়েছে। সাংবাদিকদের অফিসের ভেতরে আটকে রেখে চারদিকে আগুন দেওয়া হয়েছে, ফায়ার সার্ভিসকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। তাঁর মতে, এটি স্পষ্টতই একটি ‘অর্গানাইজড ভায়োলেন্স’।
তিনি আরও বলেন, এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার অর্থ হলো সরকার—পুরোটা না হলেও এর একটি অংশ—এই সহিংসতাকে হতে দিয়েছে।
সংলাপে গণমাধ্যমের আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক এস এম শামীম রেজা বলেন, বিগত বছরগুলোর ভুল ও সীমাবদ্ধতা মূল্যায়ন না করলে ভবিষ্যতে স্বাধীন গণমাধ্যম নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
তিনি বলেন, গণমাধ্যম আন্দোলনে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা কম। এ দূরত্ব কেন তৈরি হয়েছে, তা চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি আসন্ন নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে সাংবাদিকদের বেতন কাঠামো, সুরক্ষা আইন, প্রেস কাউন্সিলের কার্যকারিতা এবং দমনমূলক আইন বাতিলের অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে হবে এবং তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের মধ্যে সরকার তোষামোদের প্রবণতা স্বাধীন সাংবাদিকতার বড় বাধা।
ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ বলেন, সীমিত সময় ও সম্পদের মধ্যেও গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের কাজ প্রশংসনীয় হলেও সরকার এখনো সুপারিশ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়নি।
প্রথম আলোর ইংরেজি ওয়েব বিভাগের প্রধান আয়েশা কবির বলেন, বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়তে হলে গণমাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব বাড়ানো জরুরি। নারীদের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নে পুরুষ সাংবাদিকদেরও সোচ্চার হতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, সিপিবির নেতা সাজেদুল হক রুবেল, বিএনপির থিঙ্কট্যাংক জি-৯-এর সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদ নেওয়াজ খানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সম্পাদক ও সাংবাদিকেরা। আলোচনা সঞ্চালনা করেন সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান।
১৪৩ বার পড়া হয়েছে