ফরিদপুরে হারাচ্ছে খেজুরের রস ও গুড়ের ঐতিহ্য, বাড়ছে ভেজালের ঝুঁকি
সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:৫৪ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
এক সময় ফরিদপুর জেলার খেজুরের গুড় ও রসের সুখ্যাতি ছিল দেশজুড়ে। শীত এলেই এ অঞ্চলের মানুষের পিঠা-পুলিতে খেজুরের রস ছিল অবিচ্ছেদ্য উপাদান।
জামাই-আপ্যায়ন ও অতিথি সেবায় খেজুরের রস ও গুড় ছিল ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এক সময় জেলাজুড়ে বিপুল সংখ্যক খেজুর গাছ থাকলেও বর্তমানে গাছির সংকটের কারণে অনেক খেজুর গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। বয়সের কারণে স্থানীয় অনেক গাছি এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের পরবর্তী প্রজন্মও আর এ পেশায় আগ্রহী নয়। অন্যদিকে নতুন করে খেজুর গাছ রোপণে কৃষকদের আগ্রহ নেই বললেই চলে। কারণ একটি খেজুর গাছ থেকে রস ও ফলন পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। এসব কারণে ফরিদপুরে খেজুর গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
গ্রামাঞ্চলে এখন আর আগের মতো খেজুর গাছ চোখে পড়ে না। এই পরিস্থিতিতে সুযোগ নিয়েছে এক শ্রেণির প্রতারক ব্যবসায়ী। তারা চিনি, মিষ্টির গাদ ও কৃত্রিম রং মিশিয়ে ভেজাল খেজুর গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করছে। প্রশাসন মাঝে মধ্যে ভেজাল গুড়ের কারখানায় অভিযান চালিয়ে সিলগালা করলেও ভেজাল গুড় বিক্রি বন্ধ হচ্ছে না।
স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েক বছরে খেজুর গাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে খেজুরের রস এখন দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে। কয়েক বছর ধরে গাছির অভাবে অনেক খেজুর গাছ অব্যবহৃত পড়ে থাকলেও এ বছর দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে কয়েকজন গাছি ফরিদপুরে এসে রস আহরণের উদ্যোগ নেন। এতে খাঁটি খেজুরের রস ও গুড় কিনতে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতাদের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বর্তমানে গাছিদের উৎপাদিত খাঁটি খেজুর গুড় প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফরিদপুর সদর, নগরকান্দা, সালথা, বোয়ালমারী, চরভদ্রাসন ও আলফাডাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সচেতন মহল নতুন করে খেজুর গাছ রোপণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় চাষিরা জানান, আগে প্রতি খেজুর গাছে প্রচুর রস পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় রসের পরিমাণও কমে গেছে। সেই সঙ্গে গাছির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। নতুন করে কেউ এই পেশায় আসছে না। ফলে বাধ্য হয়ে রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চল থেকে মৌসুমি গাছিরা এসে ফরিদপুরে রস আহরণ করে গুড় উৎপাদন টিকিয়ে রাখছেন। এতে গুড়ের দাম বেড়ে গেছে। আগে যেখানে প্রতি কেজি খেজুর গুড় ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় পাওয়া যেত, বর্তমানে খাঁটি গুড় কিনতে হলে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা গুনতে হচ্ছে।
ফরিদপুর সদর উপজেলার দক্ষিণ বায়তুল আমান এলাকায় কথা হয় রাজশাহীর বাঘা উপজেলা থেকে আসা গাছি নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানান, তিনজন মিলে তারা ফরিদপুরে এসেছেন খেজুরের রস আহরণের জন্য। তাদের লিজ নেওয়া রয়েছে প্রায় ১৩০টি খেজুর গাছ। এসব গাছ থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ লিটার রস সংগ্রহ করেন। ভোরবেলা গাছ থেকে রস পেড়ে কিছু কাঁচা রস বিক্রি করেন এবং বাকি রস দিয়ে গুড় তৈরি করেন ক্রেতাদের সামনে। সকালে খাঁটি গুড় কিনতে স্থানীয় ও শহর থেকে আসা ক্রেতাদের ভিড় জমে।
অপর গাছি সাইদুল বলেন, আগে খেজুরের রস বিক্রি করে তারা ভালো আয় করতেন। কিন্তু বর্তমানে খেজুর গাছ কমে যাওয়ায় রস আহরণও কমে গেছে। গাছির সংকটের কারণে নতুন করে খেজুর গাছ লাগানো হচ্ছে না বললেই চলে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন ও রোগবালাইয়ের কারণেও দ্রুত ফলন পাওয়া যাচ্ছে না।
ফরিদপুর সদর উপজেলার কৃষক আব্দুল হক জানান, তার খেজুর বাগান থেকে এক সময় প্রচুর রস পাওয়া যেত। কিন্তু এখন গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় রসও কম হচ্ছে। গাছি না পাওয়ায় অনেক খেজুর গাছ কেটে ফেলতে হয়েছে।
ক্রেতা আবিদ জামান বলেন, বাজারে পাওয়া খেজুর গুড় ভালো মনে হয় না, গুড়ের তেমন ঘ্রাণ নেই। তাই কষ্ট করে বায়তুল আমান গ্রামে এসে চোখের সামনে রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি হতে দেখে খাঁটি গুড় কিনছেন। দাম প্রতি কেজি সাড়ে ৫০০ টাকা হলেও তিনি সন্তুষ্ট।
আরেক ক্রেতা হাসান সেক অভিযোগ করে বলেন, অনেক গাছি খেজুর গাছে হাড়ি পাতলেও বাদুড় বা অন্যান্য প্রাণী যাতে রস খেতে না পারে সে জন্য নেট বা জালের ব্যবস্থা রাখেন না। এতে বাদুড়ের মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। ফরিদপুর নিপাহ ভাইরাসপ্রবণ এলাকা হলেও এ বিষয়ে মানুষের সচেতনতা কম। তিনি এ বিষয়ে ব্যাপক সচেতনতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
নগরকান্দা উপজেলার খেজুর চাষি তমিজ উদ্দিন বলেন, খেজুর গাছের বয়সও একটি বড় সমস্যা। অনেক গাছ পুরোনো হয়ে গেছে। নতুন গাছ লাগাতে কৃষকদের আগ্রহ কম। পাশাপাশি গাছির সংকট, কাঠবিড়ালি ও বাদুড়ের উপদ্রবের কারণে অনেক গাছি রস আহরণে আগ্রহ হারাচ্ছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ফরিদপুরে দ্রুত খেজুর গাছ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে খেজুরের রস বিলাসী পণ্যে পরিণত হবে।
ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ডিডি) কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান জানান, বর্তমানে ফরিদপুর জেলায় প্রায় ৯৫ হাজার খেজুর গাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকে প্রতিবছর প্রায় ৩৫০ মেট্রিক টন খেজুর গুড় উৎপাদিত হয়। তিনি বলেন, খেজুরের রস কমে যাওয়া একটি গুরুতর বিষয়। এতে শুধু চাষিদের আয় নয়, গ্রামীণ ঐতিহ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় নতুন খেজুর গাছ রোপণ, রোগমুক্ত জাতের উন্নয়ন এবং চাষিদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে, যাতে কম সময়ে বেশি রস সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
১০৬ বার পড়া হয়েছে