বেগম জিয়ার ১৬ বছরের নিরব সাক্ষী ভোলার মেয়ে ফাতেমা
বৃহস্পতিবার , ১ জানুয়ারি, ২০২৬ ৬:৫৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
দীর্ঘ ১৬ বছরের সঙ্গী, গৃহকর্মী ফাতেমা বেগমকে শেষ বিদায় জানালেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এভারকেয়ার হাসপাতালে খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন তিনি।
গৃহকর্মীর পরিচয়ের বাইরে গিয়ে ফাতেমা বেগম হয়ে উঠেছিলেন সময়ের নীরব সাক্ষী- রাজনৈতিক টানাপোড়েন, কারাবাস, গৃহবন্দিত্ব ও অসুস্থতার প্রতিটি অধ্যায়ে অবিচ্ছেদ্য এক উপস্থিতি।
কারাগারের অন্ধকার কক্ষ, দীর্ঘ গৃহবন্দিত্বের দিন, হাসপাতালের নিঃসঙ্গ রাত কিংবা বিদেশ সফরের নীরব করিডোর- সবখানেই নিঃশব্দে ছিলেন ফাতেমা। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় পদ না থাকলেও ইতিহাসের কঠিন মুহূর্তগুলোতে তাঁর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।
ভোলার সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের শাহ-মাদার গ্রামে জন্ম ফাতেমা বেগমের। বাবা রফিকুল ইসলাম ও মা মালেকা বেগমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। একই ইউনিয়নের কৃষক হারুন লাহাড়ির সঙ্গে সংসার বাঁধেন তিনি। তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় মেয়ে জাকিয়া ইসলাম রিয়া ও ছেলে মো. রিফাত। তবে ২০০৮ সালে, ছেলে রিফাতের বয়স মাত্র দুই বছর থাকতেই অসুস্থ হয়ে মারা যান তাঁর স্বামী। স্বামীর মৃত্যুর পর দুই সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে যান ফাতেমা।
সংসারের হাল ধরতে হিমশিম খাওয়া মুদি দোকানি বাবার পক্ষে সব সামলানো কঠিন হয়ে পড়লে সন্তানদের গ্রামে রেখে কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসেন তিনি। ২০০৯ সালে পূর্বপরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে খালেদা জিয়ার বাসভবনে গৃহকর্মীর কাজ পান ফাতেমা। সেখান থেকেই শুরু হয় দীর্ঘ এক সহযাত্রা।
২০১৪ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচির সময় প্রথমবার জনসমক্ষে নজরে আসেন ফাতেমা বেগম। গুলশানের বাসভবনের সামনে বালুভর্তি ট্রাক দিয়ে পথরোধের ঘটনায় গাড়িতে উঠেও বেরোতে পারেননি খালেদা জিয়া। ফিরোজার গেটের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় পুলিশের চাপ সামলাতে না পেরে দুর্বল হয়ে পড়লে শক্ত করে তাঁর হাত ধরে পাশে দাঁড়ান ফাতেমা। সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হলে আলোচনায় আসেন তিনি।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি আদালতের রায়ে খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে আইনজীবীরা আবেদন করেন, তাঁর গৃহকর্মী ফাতেমা যেন সঙ্গে থাকতে পারেন। আদালতের অনুমতিতে ছয় দিন পর কারাগারে প্রবেশ করেন ফাতেমা। রাজনৈতিক কোনো পরিচয় ছাড়াই স্বেচ্ছায় তিনি কারাবরণ করেন- কারণ তিনি জানতেন, ওই সময় একা থাকা মানে ভেঙে পড়া।
একবার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কটাক্ষ করে মন্তব্য করেছিলেন, কারাগারেও খালেদা জিয়ার ফাতেমা লাগবে। সেই মন্তব্যই যেন তুলে ধরে দেয়, একজন সাধারণ গৃহকর্মী কীভাবে হয়ে উঠেছিলেন এক নেত্রীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়।
রাজনীতির ইতিহাসে নেতা, আন্দোলন আর ক্ষমতার গল্পই বেশি বলা হয়। কিন্তু সেই ইতিহাসের আড়ালে থেকে যায় কিছু নীরব মুখ, যাঁরা আলোচনার কেন্দ্রে না থেকেও সময়ের সাক্ষী হয়ে থাকেন। খালেদা জিয়ার জীবনে তেমনই এক ছায়াসঙ্গীর নাম- ফাতেমা বেগম।
১২৪ বার পড়া হয়েছে