অপসংস্কৃতি: নববর্ষে পান্তা ভাত ভক্ষণ
শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬ ৪:৩০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
আমাদের প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ। বাংলাদেশের একমাত্র সার্বজনীন উৎসব। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে মিলেই পালন করে এ দিনটি। প্রতিবছর দেখা যায় পহেলা বৈশাখে আমরা অনেকেই মজা করে পান্তাভাত খেয়ে থাকি।
নববর্ষে পান্তা ভক্ষণ কি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের খাবার? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা অতীব প্রয়োজন বলেই মনে করি। সংস্কৃতির মাঝে অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ রোধে পান্তা ভক্ষণের বিষয়টি আসলেই যৌক্তিক কি-না আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের খাবার—তা ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
আর্থ-সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালি জাতির অতীত জীবনধারা কিছুটা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। অতীতে গ্রামীণ কৃষিপ্রধান এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনমান ছিল দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত। আর্থিক দৈন্যদশা সারাবছরই লেগে থাকত। অধিকাংশ পরিবারেই তিনবেলা খাবার জুটত না। সাধারণ মানুষ খেয়ে না খেয়ে জীবন অতিবাহিত করত। আয় ছিল নিম্নগতির। খেটে খাওয়া গ্রামীণ গরিব নিরন্ন মানুষেরা তাই রাতে খাওয়ার পরে যদি ভাত থেকে যেত, তাহলে সেগুলো উচ্ছিষ্ট খাবার হিসেবে না ফেলে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রেখে দিত, যাতে পচে না যায়। রাতে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখা ভাতগুলোই সকালে কাঁচা মরিচ বা পোড়ানো শুকনো মরিচ, পেঁয়াজ, লবণ দিয়ে খেয়ে নিত। অর্ধেক বেলা পার করে দিত। এমনকি পূর্বের রাতের পানি ভেজানো ভাত সকালে খেয়ে সারাদিনই পার করে দিত। রাতে পানিতে ভিজিয়ে রাখা হতো বলে ভাতগুলো পান্তা হিসেবে আখ্যায়িত হয়। প্রশ্ন এসে যায়, কেন খেত? সহজেই অনুমেয়—অনন্যোপায় হয়ে খেত। কারণ, প্রতিদিন সকালে গরম ভাত পেটে দেওয়ার সামর্থ্য তাদের ছিল না।
অতীতের মতো বর্তমানের চিত্র কি? বর্তমানেও একই চিত্র। নিম্নআয়ের গ্রামীণ ও শহুরে বস্তিবাসী খেটে খাওয়া মানুষ রাতে খাবারের পর ভাত যদি অবশিষ্ট থেকে যায়, তাহলে তা ফেলে না দিয়ে অতীতের অসহায় মানুষদের মতোই পানিতে ভিজিয়ে রেখে দেয়। পরের দিন সকালবেলায় পেঁয়াজ, মরিচ, লবণ দিয়ে খেয়ে নেয়। কেন খায়? পূর্বপুরুষদের মতোই অনন্যোপায় হয়ে খায়। এই হলো আবহমান বাংলার গরিব খেটে খাওয়া মানুষদের পান্তা ভাত খাওয়ার চিত্র ও কারণ।
অতীত ও বর্তমানের চিত্র ঘেঁটে আমরা দেখতে পাই, পান্তা ভাত হচ্ছে খেটে খাওয়া নিরন্ন গ্রামীণ ও শহুরে বস্তিবাসী অসহায় মানুষদের প্রায় নিত্যদিনের খাবার। কারণ, প্রতিদিন সকালে গরম ভাত বা অন্য কোনো নাস্তা খাওয়ার সামর্থ্য তাদের নেই বা থাকে না। তাই নিরুপায় হয়ে বাঁচার তাগিদে রাতের অবশিষ্ট ভাতগুলো ফেলে না দিয়ে পানিতে ভিজিয়ে রেখে পরদিন সকালে খেতে হয়।
আমরা কিছু শহুরে মানুষ অতি উৎসাহী হয়ে অতি সংস্কৃতিবান সেজে পান্তা ভাতকে তুলে ধরার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছি বাঙালির সার্বজনীন উৎসব নববর্ষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের খাবার হিসেবে। দিনদিন এই অপসংস্কৃতির চিত্রটি বিস্তার লাভ করেছে। এটা অসহায় নিরন্ন মানুষদের নিত্যদিনের খাবার নিয়ে পরিহাস, উপহাস বা মস্করা বৈ কিছু নয়।
বর্তমানে আমরা নববর্ষে পান্তাভাত খাওয়ার জন্য ব্যয় করি শত শত, হাজার হাজার টাকা। এই পান্তাভাত কি নববর্ষের দিন ব্যতীত অন্যদিন আমরা খাই? কখনোই খাই না। একটি খাবার তখনই একটি জাতির সার্বজনীন বা সাংস্কৃতিক খাবার হয়, যখন তা সকলে সকল সময় খেতে পারে বা খায়। আমি শুধুমাত্র বছরে একটি দিন মজা করে খেতে পারি, অন্যদিন তার ঘ্রাণও সহ্য করতে পারি না—তা কী করে আমাদের সার্বজনীন উৎসবের সার্বজনীন বা সাংস্কৃতিক খাবার হয়? তা কি আমরা একটিবার ভেবেছি?
আসলে পহেলা বৈশাখে ধুমধাম আয়োজন করে গাছের তলায়, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ডাইনিং টেবিলে বসে পান্তা খাওয়া অসহায়, উপায়হীন গরিবের নিত্যদিনের খাবারের প্রতি অবজ্ঞা বৈ কিছু নয়। আমরা কেউ তা জেনে করি, কেউ না জেনে করি। প্রতি নববর্ষে এ চিত্র দৃশ্যমান হয়। আবহমান বাংলার সার্বজনীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মাঝে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছি মজা করে হৈহুল্লোড় করে পান্তা ভাত খাওয়ার অপসংস্কৃতি। বাঙালি সংস্কৃতির সার্বজনীন রূপকে স্বচ্ছ রাখার স্বার্থে পান্তা ভক্ষণের অপসংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসাটা অতীব জরুরি।
লেখক: সভাপতি, সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘ, ময়মনসিংহ।
১২৭ বার পড়া হয়েছে