সর্বশেষ

সারাদেশ

ধান সংরক্ষণ পরবর্তী ক্ষতি কমাতে উদ্ভাবিত ‘গ্রেইন গার্ড’ ডিভাইস

আওলাদ রুবেল, ময়মনসিংহ
আওলাদ রুবেল, ময়মনসিংহ

মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬ ১:১৭ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
পোকা ও ছত্রাকের আক্রমণের কারণে ধান কাটার-পরবর্তী ক্ষতি মোকাবেলা করা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর ফলে সংরক্ষিত ধানের গুণগতমান খারাপ হয়ে যায়, যা অঙ্কুরোদগমের হার এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি সুরক্ষাকে প্রভাবিত করে।

এই ক্ষতি কৃষকের আয় এবং খাদ্যের সহজলভ্যতা ও ক্রয়ক্ষমতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশের কৃষকরা সাধারণত নিজেদের ভোগ, জরুরি প্রয়োজন এবং পরবর্তী বপন মৌসুমের জন্য বীজের চাহিদা মেটাতে ধান সংরক্ষণ করেন। কৃষকরা সবচেয়ে প্রচলিত ঐতিহ্যবাহী সংরক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করেন, যা বায়ুরোধী নয়। এই ধরনের কাঠামোতে সংরক্ষিত ধান জৈবিক, পরিবেশগত, পোকামাকড় এবং অন্যান্য কারণে ক্ষতির শিকার হয়।

বাংলাদেশে ধান কাটার-পরবর্তী ক্ষতি প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। প্রধান কারণ হলো পোকামাকড়ের আক্রমণ। বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া পোকামাকড়, ছত্রাক এবং ফাঙ্গাসের দ্রুত বংশবৃদ্ধি ও বীজের অবনতির জন্য অনুকূল।

গবেষণায় দেখা গেছে, পোকা/কীটপতঙ্গের আক্রমণের কারণে বাংলাদেশে ধানের সংরক্ষণকালীন ক্ষতি ৭-১২%। তবে ধান কাটার-পরবর্তী ক্ষতি শুধু খাদ্যের ক্ষতি হিসেবেই নয়, বরং উৎপাদনে ব্যবহৃত সকল সম্পদেরও ক্ষতি ঘটায়, যেমন—শ্রম, জমি, পানি, সার, কীটনাশক, শক্তি ইত্যাদি।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকরা উদ্ভাবন করেছেন নতুন ডিভাইস ‘গ্রেইন গার্ড’। এটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব আল্ট্রাসনিক প্রযুক্তিনির্ভর ডিভাইস, যা উদ্ভাবন করেছেন বাকৃবির কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আওয়ালের নেতৃত্বে একদল গবেষক।

দেশে ধান কাটার-পরবর্তী ক্ষতি হ্রাসের এই প্রকল্প ক্ষুদ্র কৃষকদের জীবিকার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা, প্রতিযোগিতা, পরিবেশগত স্থিতিশীলতা এবং নীতি ও নিয়ন্ত্রক উন্নয়নের উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। প্রকল্পটি ফসল-কাটার ক্ষতি কমাতে, সংরক্ষণ সুবিধার উন্নতি করতে, সচেতনতা ও জ্ঞানগত সক্ষমতা বাড়াতে, কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির মান উন্নত করতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সহনশীলতা বাড়াতে এবং বাজারের সুযোগ বৃদ্ধি করতেও অবদান রাখে। এর প্রাথমিক প্রভাব হলো ফসল কাটার পর ক্ষতি কমানো। কীটপতঙ্গ বিতাড়িত করার মাধ্যমে এই ব্যবস্থাটি নিশ্চিত করে যে আরও বেশি ধান ভোক্তার কাছে পৌঁছায়।

যেহেতু এই ব্যবস্থায় রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না, তাই এটি স্বাস্থ্যখাতের খরচ বাঁচায় এবং গুণমান ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যও রক্ষা করে। ডিভাইসটির ব্যয়-সাশ্রয়ী বৈশিষ্ট্য ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য এটিকে সহজলভ্য করেছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট ধান উৎপাদন ছিল ৫৮.৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন (FAO, ২০২৩)। এর মাত্র ৫% সাশ্রয় করা গেলেই বছরে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।

বাংলাদেশে ধানের বীজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩৫.৮৩ লক্ষ মেট্রিক টন। এই ডিভাইস ব্যবহারের ফলে ধানের বীজের অঙ্কুরোদগম হার কমপক্ষে ১০% বৃদ্ধি পাবে (অর্থাৎ ১০% বীজ সাশ্রয় হবে), যার অর্থ ৩,৫০,০০০ মেট্রিক টন ধানের বীজ সাশ্রয় হবে। এছাড়াও শস্যের পুষ্টিগুণ সংরক্ষিত থাকবে, যা অমূল্য।

গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আওয়াল জানান, বাংলাদেশে ধান কাটার পর সংরক্ষণে পোকার আক্রমণে প্রায় ১৭% ক্ষতি হয়। গুদামে এই পরিমাণ আরও বেশি। দেশের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে এই সমস্যা দেখা দেয়। খাদ্যগুদাম বা অন্যান্য স্থানে ধান, গম ও অন্যান্য বীজ প্রতি বছর প্রায় ৫-১০% সংরক্ষণকালীন ক্ষতির শিকার হয়। খাদ্য নিরাপত্তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

এই সমস্যা মোকাবেলায় উদ্ভাবিত ডিভাইস ‘গ্রেইন গার্ড’ পোকা দমন করতে সক্ষম। এতে আল্ট্রাসনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ডিভাইসটি উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ তরঙ্গ উৎপন্ন করে, যা মানুষের কানে শোনা যায় না, তবে পোকামাকড়ের স্নায়ুতন্ত্র ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ফলে পোকাগুলো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না, খাদ্য গ্রহণে ব্যাঘাত ঘটে এবং প্রজনন প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হয়।

এই পদ্ধতিতে কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না। তাই ডিভাইসটি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশের জন্যও নিরাপদ। কৃষক এটি বীজ সংরক্ষণের স্থানে রাখতে পারেন, এবং খাদ্য গুদামগুলোতেও সহজেই ব্যবহার করা যাবে। ডিভাইসটিতে রিচার্জেবল ব্যাটারি রয়েছে, যা বিদ্যুৎ থাকুক বা না থাকুক চলবে।

পোকামাকড় শস্য ক্ষতি করতে না পারায় সহজে পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ সম্ভব হবে। ডিভাইসটির দাম কম হওয়ায় কৃষক ও সরকারি গুদামগুলো সহজে ব্যবহার করতে পারবে। কৃষক, গুদাম কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে এই ডিভাইস গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

অধ্যাপক ড. আব্দুল আওয়াল আরও জানান, এই প্রযুক্তির উন্নয়ন, নকশা প্রস্তুত, পরীক্ষামূলক বিশ্লেষণ এবং মাঠ পর্যায়ে গবেষণা ও উন্নয়ন প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে প্রায় ২-৩ বছর সময় লেগেছে। ডিভাইসটির কার্যকারিতা চূড়ান্ত করার জন্য বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা ও সংশোধন করা হয়েছে।

‘গ্রেইন গার্ড’ প্রযুক্তিটি কৃষিক্ষেত্রে পোস্ট-হারভেস্ট ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রে যুগান্তকারী উদ্ভাবন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি ভবিষ্যতে খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ, কার্যকর এবং পরিবেশবান্ধব করবে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ ও ইনোভেশন সেন্টার পরিচালিত ‘Development of Smart Ultrasonic Pest Control System for Post Harvest Loss Reduction in Store Paddy’ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংক অর্থায়ন করেছে। ইতিমধ্যেই বিএডিসিসি সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই ডিভাইস গ্রহণে আগ্রহ দেখিয়েছে। সরকারের অনুমোদন পেলে এটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনও সম্ভব হবে।

১০৫ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন