সর্বশেষ

মতামত

ইরান-ইসরায়েল সংঘাত: এক পৈশাচিক আগ্রাসন ও বিপন্ন মানবতা

শামসুল ইসলাম
শামসুল ইসলাম

সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:৫৩ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
সভ্যতা যখন একবিংশ শতাব্দীর মধ্যগগনে দাঁড়িয়ে অগ্রগতির আস্ফালন করছে, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ আর লাশের সারি আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে—মানবতা আজও কতটা অসহায়।

পবিত্র রমজান মাস, যা সংযম ও শান্তির বার্তা বয়ে আনে, সেই পবিত্র সময়েই মধ্যপ্রাচ্যের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী দেশ ইরানের ওপর নেমে এসেছে ইসরায়েল ও তার মিত্র আমেরিকার সম্মিলিত আঘাত। এটি কেবল একটি ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত নয়; বরং এটি আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার নৈতিক পতনের এক চরম দৃষ্টান্ত।

আগ্রাসনের ব্লু-প্রিন্ট ও 'বৃহৎ ইসরায়েল' স্বপ্ন
ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধের নকশা দীর্ঘদিনের। জায়নবাদী ইসরায়েল মনে করে, মধ্যপ্রাচ্যে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের পথে ইরানই একমাত্র দুর্ভেদ্য প্রাচীর। ফিলিস্তিনকে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার পর, এবার তাদের লক্ষ্য ইরানকে পঙ্গু করে দেওয়া। তথাকথিত 'গ্রেটার ইসরায়েল' বা বৃহৎ ইসরায়েল গঠনের যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা তারা লালন করছে, ইরানকে উৎখাত করতে না পারলে তা বাস্তবায়ন অসম্ভব। গাজায় ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে ইহুদি বসতি স্থাপনের যে নীল নকশা আমরা দেখছি, ইরানের ওপর এই হামলা সেই একই পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই আগ্রাসনের প্রধান ইন্ধনদাতা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র আমেরিকা। বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের কর্মকাণ্ড আজ বিশ্ববিবেককে স্তব্ধ করে দিয়েছে। ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত একজন প্রেসিডেন্ট বিশ্ব নিরাপত্তাকে নিজের ড্রয়িংরুমের পুতুল খেলায় পরিণত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অবিরাম এবং পরস্পরবিরোধী বার্তা বিশ্বজুড়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তার মানসিক সুস্থতা নিয়ে খোদ মার্কিন মুলুকে প্রশ্ন উঠলেও, যুদ্ধের এই উন্মাদনা থামছে না। একজন নেতার খামখেয়ালি সিদ্ধান্তে আজ পুরো মধ্যপ্রাচ্য জ্বলছে, আর তার মূল্য দিচ্ছে নিরপরাধ সাধারণ মানুষ।

যুদ্ধের এই দামামা দ্রুতই প্রান্তিক মানুষের আর্তনাদে রূপ নিয়েছে। আসলে যেকোনো যুদ্ধের প্রথম ও প্রধান বলি হয় নারী এবং শিশুরা। ইরানের রাজপথে আজ লাশের স্তূপ, অথচ বিশ্ববিবেক সেখানে কার্যত নির্বাক। তবে এই যুদ্ধের প্রভাব কেবল ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমান বিশ্ব এতটাই আন্তঃসংযুক্ত যে, তেহরানে পড়া একটি বোমার কম্পন অনুভূত হয় হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশের কোনো প্রত্যন্ত গ্রামেও।
যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। যে ইরান ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বের সিংহভাগ জ্বালানির জোগান দেয়, সেখানে অশান্তি মানেই বিশ্ববাজারে তেলের দামের অগ্নিমূল্য। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের ওপর।
একটি অদৃশ্য শিকল: যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে একজন দরিদ্র কৃষকের সেচ পাম্প আজ বন্ধ। ডিজেলের উচ্চমূল্য তার ফসলের মাঠকে চৌচির করে দিচ্ছে। যে কৃষক যুদ্ধ কী তা জানে না, তার অনাগত সন্তানের ক্ষুধার দায়ভার কি যুদ্ধবাজ শক্তিগুলো নেবে?

এই চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও মানবিক সংকট নেমে এসেছে। জ্বালানি সংকটের হাত ধরে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। পরিবহন খরচ থেকে শুরু করে জীবনযাত্রার প্রতিটি ধাপে সাধারণ মানুষ পিষ্ট হচ্ছে। এটি কেবল ইরানের সংকট নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির এক ভয়াবহ অধঃপতন। আমেরিকার সাধারণ করদাতা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের দিনমজুর, সবাই আজ এই চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের পরোক্ষ শিকার।
ইতিহাস সাক্ষী, কোনো আগ্রাসনই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়নি। ধ্বংস আর মৃত্যুর মিছিল সাজিয়ে কোনো জাতি টেকসই শান্তি অর্জন করতে পারে না। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের এই দাবানল যদি এখনই থামানো না যায়, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্বকে এক অন্ধকার যুগে ঠেলে দেবে। মানবতার এই পশ্চাৎযাত্রা রুখে দিতে বিশ্ববাসীকে আজ একতাবদ্ধ হতে হবে। গায়ের জোর আর অস্ত্রের আস্ফালন নয়, বরং সংলাপ আর মানবিক মূল্যবোধই হোক আগামীর পাথেয়।

লেখক: লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক।

১২৩ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন