মুনাফার আগুনে পুড়ছে মানবতা
রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬ ৮:৫৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
গতকাল, ৪ এপ্রিল ২০২৬ (শনিবার), ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের কদমতলী এলাকায়- দুপুরের দিকে একটি গ্যাস লাইটার তৈরির কারখানায় এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে, যার ফলে এখন পর্যন্ত ৬ জন শ্রমিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে!
ফায়ার সার্ভিসের ৭টি ইউনিটের প্রচেষ্টায় বিকেলের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।
ধোঁয়াটে আকাশ আর কারখানার সাইরেন আজ আর কেবল উৎপাদনের কথা বলে না, অনেক সময় তা মৃত্যুকূপের সংকেত হয়ে দাঁড়ায়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদন (১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ প্রকাশিত) অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা বাংলাদেশে অগ্নিকাণ্ডের যে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, তার একটি বড় অংশই ছিল ঢাকা কেন্দ্রিক। তবে সরকারি পরিসংখ্যানে বিভাগভিত্তিক আলাদা হিসাবের চেয়ে জাতীয় তথ্যগুলো বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
সারা দেশে মোট ২৭,০৫৯টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে । প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭৫টি অগ্নিকাণ্ড রেকর্ড করা হয়েছে ।
এই অগ্নিকাণ্ডগুলোতে মোট ৮৫ জন নিহত হয়েছেন ; এর মধ্যে ৪৬ জন পুরুষ ও ৩৯ জন নারী।
দগ্ধ বা আহত হয়েছেন আরও ২৬৭ জন ।
আগুনের কারণে আনুমানিক ৫৬৯.৯৭ কোটি টাকার (৫.৭ বিলিয়ন টাকা) সম্পদ ভস্মীভূত! ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতায় প্রায় ৩,২৬৩.৬২ কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
কেন আগুনের ঘটনা ঘন ঘন ঘটছে?
আবাসিক এলাকায় বা কারখানার ঠিক পাশেই রাসায়নিকের গুদাম থাকায় ছোট আগুনও দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়, যা নিয়ন্ত্রণ করা ফায়ার সার্ভিসের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
ঢাকা ও এর আশপাশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি সময়মতো পৌঁছাতে পারে না। এছাড়া পর্যাপ্ত পানির অভাব এবং সংকীর্ণ রাস্তার কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়।
শিল্প অগ্নিকাণ্ডের প্রায় ৩৪.৭১% ঘটে শর্ট সার্কিট থেকে। গরমকালে এসি, ফ্যান এবং ভারী মেশিনারিজ একটানা চলায় লোড বেড়ে যায়, যা পুরোনো ও নিম্নমানের তার সহ্য করতে পারে না।
গ্রীষ্মের তাপমাত্রা ৪২° সেলসিয়াসে পৌঁছালে কারখানার ভেতরে জমে থাকা রাসায়নিক পদার্থ বা দাহ্য বস্তু সহজেই প্রজ্বলন তাপমাত্রায় পৌঁছে যায়।
অনেক কারখানায় দাহ্য পদার্থ এবং সাধারণ উৎপাদন ইউনিট একই ভবনে থাকায় ছোট আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে বাইরে চলে যায়।
রপ্তানিমুখী বড় কারখানাগুলো কিছু আন্তর্জাতিক মান (যেমন: Accord বা Alliance) মানলেও, ঢাকার অলিগলিতে থাকা শত শত ছোট ও মাঝারি কারখানা কোনো নিয়ম মানে না।
বাস্তব চিত্র হলো, অনেক সময় চুরির ভয়ে বা শৃঙ্খলার নামে জরুরি বহির্গমন পথ (Emergency Exit) তালাবদ্ধ রাখা হয়, যা মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায় !
প্রতি বছর গরম শুরু হওয়ার আগে কারখানার বৈদ্যুতিক অডিট বাধ্যতামূলক করা এবং পুরোনো তার পরিবর্তন করা।
শুধু ফায়ার এক্সটিংগুইশার নয়, প্রতিটি ফ্লোরে স্মোক ডিটেক্টর এবং অটোমেটিক স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম স্থাপন করা।
দাহ্য পদার্থ বা কেমিক্যাল সাধারণ উৎপাদন ইউনিট থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ভবনে বা সুরক্ষিত গুদামে রাখা নিশ্চিত করা।
তিতাস গ্যাসের পুরোনো লাইন বা সিলিন্ডার লিকেজ থেকেও বড় বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। এছাড়া কর্মীদের অসতর্কতা এবং বিড়ি-সিগারেটের অবশিষ্টাংশ থেকেও আগুনের সূত্রপাত হয়।
প্রতিটি কারখানায় কমপক্ষে ২৫% কর্মীকে ফায়ার ফাইটিংয়ে দক্ষ করে তোলা এবং প্রতি মাসে অন্তত একবার অগ্নিনির্বাপক মহড়া করা।
যে সব ভবনে জরুরি বহির্গমন পথ নেই বা গেটে তালা থাকে, সেগুলোর লাইসেন্স বাতিল এবং মালিকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।
আগুনের এই মিছিল কেবল দুর্ঘটনা নয়, বরং অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার ফল। যদি কারখানা মালিকদের মুনাফার চেয়ে শ্রমিকের জীবনের মূল্য বেশি হয় এবং সরকারি তদারকি সংস্থাগুলো রাজউক ও ফায়ার সার্ভিস সক্রিয় হয়, তবেই এই মৃত্যুচক্র বন্ধ করা সম্ভব।
রাজউক বা ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র যখন কেবল 'টেবিলের তলায় লেনদেনের' মাধ্যমে পাওয়া যায়, তখন আগুনের পথ প্রশস্ত হয়।
এই সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে। আমাদের দেশে শ্রমিকের জীবনের চেয়ে অনেক সময় 'উৎপাদন' আর 'মুনাফা'কে বড় করে দেখা হয়।
ফায়ার সেফটি ইকুইপমেন্ট কেনাকে অনেক মালিক 'অপ্রয়োজনীয় খরচ' মনে করেন। অথচ একটি জীবনের মূল্য কোনো কোটি টাকার মেশিনের চেয়ে কম নয়।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এখন যেটুকু নিরাপদ হয়েছে, তা মূলত বিদেশি ক্রেতাদের চাপের কারণে। যদি স্থানীয় বাজারের জন্য পণ্য তৈরি করা কারখানাগুলোতেও একই ধরনের কঠোর অডিট ব্যবস্থা চালু করা যায়, তবে মালিকরা বাধ্য হয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন।
শ্রমিকদের যদি নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলার অধিকার এবং সাহস থাকে, তবে কোনো মালিক তালাবদ্ধ গেটে কাজ করাতে পারবেন না। কারখানার ভেতরে কোনো ত্রুটি দেখলে শ্রমিকরাই যেন তা কর্তৃপক্ষকে বা ফায়ার সার্ভিসকে সরাসরি জানাতে পারেন, এমন একটি স্বতন্ত্র হেল্পলাইন থাকা প্রয়োজন।
এটি আর কেবল 'দুর্ঘটনা' নয়, বরং কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। যতদিন পর্যন্ত একজন মালিককে তার অবহেলার জন্য কাঠগড়ায় দাঁড়াতে না হবে, ততদিন এই আগুনের মিছিল থামানো কঠিন।
যেদিন একটি কারখানার নকশা অনুমোদনের সময় 'জরুরি বহির্গমন পথ' আর 'স্মোক ডিটেক্টর'কে বিলাসিতা নয়, বরং বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে দেখা হবে—সেদিনই এই নিয়তি থেকে রেহাই মিলবে।
রাষ্ট্রকে কেবল তদন্ত নয়, বরং শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করতে হবে। কারণ, পুড়তে থাকা প্রতিটি শ্রমিকের আর্তনাদ কেবল একটি পরিবারের স্বপ্ন ছাই করে না, বরং দেশের উন্নয়নের ভিতকেও ভেতর থেকে নড়বড়ে করে দেয়।
প্রতিটি বড় অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্ত কমিটি হয়, কিন্তু দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় আইন অমান্য করার সংস্কৃতি ডালপালা মেলছে।
লেখক : সমাজকর্মী, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার।
২৯৩ বার পড়া হয়েছে