তেল নিয়ে তেলিসমাতি
শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬ ৮:০৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
জ্বালানি তেল নিয়ে দেশ সংকটে! সংকটটা গভীরতর হচ্ছে। মহানগরীর পাম্পগুলোতে সাইনবোর্ড। বলা হচ্ছে তেল নেই পাম্পে। পরিবহনের দীর্ঘতম লাইন।
তেলের এ সংকটকে কেন্দ্র করে বেশ কিছুদিন ধরে অপ্রত্যাশিত ও শোকাহত ঘটনা ঘটেছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে জ্বালানি তেল না পেয়ে বিক্ষুব্ধ এক ট্রাকচালক নগরীর এক পাম্প স্টেশনের ব্যবস্থাপককে চাকায় পিষিয়ে মেরে ফেলেছে! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সে দৃশ্য ভাইরাল হয়েছে! কী ভয়ংকর ও দানবীয় সে দৃশ্য! ঘাতক ধরা পড়েছে। হয়তো বিচার হবে তার। কিন্তু ব্যবস্থাপকের পরিবারের সদস্যদের জীবন সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার মধ্যেই চলে গেল। কী সুরক্ষা দেবে তার পরিবারকে?
নগরীতে জ্বালানি তেলের সংকটের রহস্য উদঘাটনে প্রশাসন অবশ্য হয়েছে তৎপর হয়েছে। তল্লাশি অভিযানে বের হচ্ছে তেলের মজুদ। সে অপরাধে জরিমানা করা হচ্ছে মাত্র। কিন্তু মজুতদারির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিতো হচ্ছে না। মজুতকারিদের অধিক ব্যবসায়িক লাভ ঠেকাতে সরকার এরিমধ্যে একটা উত্তম সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারি এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হবে না। এতে মজুতকারিরা বেকায়দায় পড়েছে।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সংকট চলছে। যে দেশের দীর্ঘ সময়ের জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে তারাও অন্য দেশে রফতানি কার্যক্রম থেকে বিরত রয়েছে। কেননা, ইরান, ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ কতটা প্রলম্বিত হয় তা অনিশ্চিত।
হরমুজ প্রণালীর সংকটতো আছেই। ইরান বলছে ব্যারেল প্রতি মূল্য দিতে হবে আলাদাভাবে। দেশের জ্বালানি তেল সংকট আমাদের দেশে হঠাৎ করেই সৃষ্টি হয়েছে। আমাদানিনির্ভর দেশে জ্বালানি তেল কিনতে অনেক অর্থেই ব্যয় হয়। কিন্তু আমাদের মজুদ ব্যবস্থাপনা খুবই দুর্বল। বাস্তবতা হলো সংকট তৈরি হবার আগে আমরা তৎপর হই না। যেমন ভূমিকম্প বা ঘূর্ণিঝড়ের পূর্ব প্রস্তুতি।
সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে জ্বালানি তেলের সংকট নেই। অথচ একজন মন্ত্রি বললেন, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করে হেঁটে যান গন্তব্যে; তাতে শরীর সুস্থ থাকবে। জ্বালানি সংকট চিন্তা করে শিক্ষামন্ত্রি শিক্ষালয়ে ৩ দিন অনলাইন ক্লাশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন! অনেকেই এর সমালোচনা করে বলেছেন, দেশেতো ফের অতিমারির করোনায় পড়েনি। সরকারি অফিসগুলোতে সাপ্তাহিক ছুটি বৃদ্ধি করে 'ওয়ার্ক ফর্ম হোম' পদ্ধতিতে নেওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে! সরকারি দফতরগুলোতে কর্মঘন্টা কমিয়ে অফিস সময় ৯-৪টা এবং বিপনীগুলো বিকেল ৬টা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সারাদেশে পাম্পগুলোতে পরিবহনের দীর্ঘ লাইন কেন? কেনই বা এসব স্থানে তেল সংগ্রহ নিয়ে অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটবে? ফেসবুকে একজন রস মন্তব্য করেছেন রাজনীতিবিদদের উদ্দেশ্যে! বলেছেন, ভাইসব আপনারা দয়া করে মন্ত্রি নেতাদের তেল না দিয়ে পাম্পে তেল দেন। মন্তব্য বটে!
অনেকদিন পর ঘর থেকে বের হয়ছি। বন্ধুপত্নীর চোখ অস্ত্রোপচারে সময় দেওয়ার জন্য উবারে করে মহানগরীর ধানমন্ডিস্থ একটি বেসরকারি চিকিৎসালয়ে গিয়েছিলাম আজ (১ এপ্রিল, ২০২৬) দুপুরে। ফিরেছি সন্ধ্যায় উবারেই। রাজধানীর রাস্তাঘাট বেশ ফাঁকা চোখে পড়ল। উবার চালকও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করেছেন তা জানালেন। সারাদিনে তিনি মাত্র দুটি ট্রিপ দিতে পেরেছেন। তেল সংকটের কারণে আয় রোজগার বন্ধ হয়ে আসছে তারও!
পত্রিকার খবর- ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আমদানি করা হচ্ছে। সীমান্ত পথ দিয়ে জ্বালানি তেলের সারি সারি পরিবহন; ঢুকছে দেশে। এমন ছবিও প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এর পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৬৫-৬৮ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে, যার সিংহভাগ (প্রায় ৬৩ লাখ টন) বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশেরও বেশি ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও ফার্নেস অয়েল আমদানিনির্ভর, বাকিটা স্থানীয়ভাবে পরিশোধিত হয় । প্রধানত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়। জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশের বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। আমাদের জ্বালানি তেল কত মজুদ আছে, বর্তমান ঘাটতি কত তা সরকার থেকে জানানো হয়নি। মজুদ ব্যবস্থাপনার মানও নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
আমাদের দেশে তেলের মাথায় সবাই তেলের ঢালেন। বৃহৎ জনগোষ্ঠী সাধারণ জনগণের কথা ভোটের আগে রাজনীতিবিদরা ভাবেন। প্রতিশ্রুতি দেন এটা করবেন, সেটা করবেন। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে তাদের মৌলিক চাহিদার পুরণ না করে বরং নিজের আখের গোছান। এটা দেশের বহুদিনের নিগূঢ় বাস্তবতা। মানচিত্রের তুলনায় সংখ্যাধিক্যের আমাদের দেশে বিশেষ করে শহর বা নগরে পর্যাপ্ত রাস্তাঘাট ও ডোবা-নালা-খাল নেই। কিন্তু আছে বিপুল পরিমাণ পরিবহন। একটি পরিবারে একাধিক ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাও কম নয়। অধিক পরিবহনের কারণে যানজট লেগেই থাকে রাস্তায়। এসব পরিবহনের জ্বালানির উপযোগিতাও কম নয়। যানজটে দীর্ঘতর সময়ের প্রতীক্ষায় জ্বালানির ব্যবহার বাড়ে। অচল ও ফিটনেসবিহীন পরিবহনের জ্বালানি তেলের ব্যবহার হয় বেশি। পরিবেশ দূষণের হয়। অচল ও মেয়াদোত্তীর্ণ পরিবহন বন্ধে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) কঠোর হতে হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দফতরের সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে।
সরকারের দেশ পরিচালনার সময় বেশি হয়নি। নতুনই বলা যায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর সরকার! নিকট অতীতের 'ফ্যাসিস্ট' সরকারের অনিয়ম ও দুর্নীতির ভুলগুলোর আমরা পুনরাবৃত্তি প্রত্যাশা করি না।
দায়িত্বশীল পদে থেকে মূল সমস্যা নিরসনের পথে না হেঁটে অবিবেচক ও অসংলগ্ন কথা না বলাই ভালো। অনুচিত কথায় বিতর্ক বাড়ে। শত্রু তৈরি হয়! তীক্ষতা বাড়ে এতে।
তাই অন্যায্য প্রশংসার তেল না মেরে পাম্পের তেলের দেওয়ার ব্যবস্থায় উদ্যোগী হন। মনে রাখতে হবে জ্বালানি তেলের অভাবে সারাদেশে পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে যেতে পারে! এ সংকটে তৈরি হয় পণ্য সরবরাহের বড় ঘাটতি। ফলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। ঘটে মূল্যস্ফীতি! এরিমধ্যে মূল্যস্ফীতি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে রয়েছে! জনগণের দুর্ভোগ আর বাড়ানো যাবে না। তাই জনগণের সরকার জনগণের কল্যাণ করবে তেমনটাই আশা করছি।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, কবি ও অর্থকাগজ সম্পাদক।
১৪৫ বার পড়া হয়েছে