জসীম উদ্দীন এর কবিতায় গ্রামীণ জীবন ও নিসর্গ
বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬ ৪:৫৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
জসীম উদ্দীনের লোকভিত্তি ছিল লোকজ চেতনাকে সংহত করার মধ্যে। তিনি লোকজীবন ঘনিষ্ঠ উপাদানের ক্রমাগত ধারাবাহিক উপস্থাপন করে তাঁর সঙ্গে আধুনিক চেতনা ও আঙ্গিক কৌশলকে জুড়ে দিতে পেরেছিলেন বলেই জীবননির্ভর আধুনিক কাব্য রচনার জন্য তিনি বিশিষ্ট।
গ্রামীণ সমাজচেতনাকে কাব্যে সঞ্চারিত করে নিয়ে জসীম উদ্দীন যে পজেটিভ ভূমিকা পালন করেছিলেন, সেই ভূমিকাকে খাটো করে দেখার উপায় নাই। গ্রামীণ সমাজচেতনায় জসীম উদ্দীন প্রথম পূর্ণাঙ্গ এবং তাৎপর্যপূর্ণ নিদর্শন উপহার দিতে সক্ষম হয়েছেন।
জসীম উদ্দীন গ্রামকে খণ্ডিত করে দেখেননি। গ্রাম তাঁর ছিল পরিপূর্ণ এক বিশ্ব। তিনি গ্রামের মধ্যেই তাঁর নিজের শেকড়কে অনুসন্ধান করেছিলেন। জসীম উদ্দীন বিস্তৃত পার্সপেক্টিভ-এর মধ্যে লোকজীবনের তাৎপর্যকে তুলে ধরেছেন আবহমান ঐতিহ্যসূত্রে। জসীম উদ্দীনই প্রথম কবি যিনি গ্রামীণ উপকরণই শুধু নয়; গ্রামের মানুষের ভাব, ভাষা, কল্পনাপ্রবণতা, মেজাজ তথা অন্তর্গত ভঙ্গিকে কাব্যে ধারণ করতে পেরেছিলেন। জসীম উদ্দীনই প্রথম কবি যিনি লোকজীবনের আকাঙ্ক্ষাকে অগ্রসর শিল্পসভ্যতায় আত্মমর্যাদাসহ প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে হাসান হাফিজুর রহমান বলেন— লোকজীবনের বাইরে তার অস্তিত্বের অর্থ নেই এমন একনিষ্ঠভাবে সমকালীন মার্জনায় শিল্পবোধ এবং আঙ্গিকে তিনি সজ্জিত ও গঠন করতে পেরেছিলেন বলেই তার দ্বারা বাংলা কাব্যের স্বীকৃত প্রধান ধারা ও অবহেলিত লোকধারার একাত্ম মিলনের ক্ষেত্রে একটি স্বস্তিকর অন্তরায় অন্তর্হিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এতে এক অত্যন্ত ব্যঞ্জিত প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন হয়েছে তার হাতে। বস্তুত এই মিলন সম্ভাবনার তাৎপর্যময়তায় জসীম উদ্দীন এক ফলিত নিদর্শন, যা সঙ্গে সঙ্গে কাব্য সম্পদেরও তুচ্ছ নয়।
বাংলা কবিতায় প্যাস্টোরাল কবিতার উদ্ভব হলেও লোকজীবন জসীম উদ্দীনের কবিতায় নতুন ভাষা পেয়েছে। কবিতায় জসীম উদ্দীন লোকজ আবহ নির্মাণ করতে গিয়ে তাতে মিলিয়ে দিয়েছেন প্রকরণগত নিষ্ঠার নিশ্চিত স্বেদবিন্দু। তাঁর কবিতায় চিত্রকলা এসেছে বস্তুর প্রয়োজনকে ছাপিয়ে উচ্চতর সত্যকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার দুর্মর ইচ্ছে নিয়ে। ফলে স্বাপ্নিক কৌতূহলের জন্যে জসীম উদ্দীন নন্দিত হয়েছেন।
লোকজ জীবনকে কবিতায় স্থান দিলেও জসীম উদ্দীনের কবিতায় গ্রাম্যতা নেই, গ্রাম আছে। আধুনিক ও উন্নত রুচির পরিপোষক জসীম উদ্দীন তাই গ্রাম্য কবিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নন। তাঁর কাব্যের আধুনিকতা সহজেই লক্ষ্যযোগ্য। লোকজ ঐতিহ্যকে পুঁজি করে জসীম উদ্দীনের কাব্য আধুনিক কবিতার কলা-কৌশলের সব ধরনের দাবি মেটাতে আশ্চর্যভাবে সফল। ফলে সমসাময়িক অনেকেই গ্রাম আর গ্রামের মানুষকে নিয়ে কবিতা রচনা করলেও জসীম উদ্দীন পাঠকের মনোযোগ কেড়ে নেন তার কাব্যিক শক্তির বদৌলতে। জসীম উদ্দীন তার কবিতার মধ্য দিয়ে লোকজ উপাদান, উপকরণের শক্তিমত্তাকেই জোরালোভাবে স্বীকৃতি দিলেন। কিন্তু এই স্বীকৃতি দিয়ে তিনি অতিকথনের চোরাবালিতে পা রাখেননি। এ ব্যাপারে তাঁর সংযম তথা আত্মসংযম শিল্পকলার সংস্কৃতি নিজেই উপস্থিত হয়।
বাংলা সাহিত্যে জসীম উদ্দীন হাজার বছরের গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, লোকাচার, মন ও মানসকে যেভাবে চিত্রিত করেছেন, তা কেবলমাত্র ছবির সাথেই তুলনীয়। লোকজ জীবনের চলিষ্ণুতার সঙ্গে হৃদয়ের আর্তি আর ভালোবাসা মিলিয়ে দিয়ে জসীম উদ্দীন তাঁর কবিতায়, সাহিত্যে ঐতিহ্যের গুরুত্বকেই প্রকারান্তরে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর কবিতায় ঐতিহ্য-জিজ্ঞাসা তাই কোনো মতবাদের কুয়াশায় আচ্ছন্ন নয়।
জসীম উদ্দীনের কবিতা কাহিনী কাব্যের আদলে রচিত হলেও কাহিনী কাব্যের লাগামহীন আবেগ-উচ্ছ্বাস তাঁর কবিতায় নেই। নেই খিস্তিখেউড়। যদিও তিনি আবেগের নিবিড় ঝর্ণাধারায় অবগাহন করেই কবিতা লিখেছেন। এই দুর্লভ ব্যতিক্রমের কারণেই সব শ্রেণির পাঠকের কাছেই জসীম উদ্দীন সমাদৃত। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর শেকড় অনুসন্ধানী কবি জসীম উদ্দীন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর শোক, ভাষা, ব্যথা-বেদনা, আনন্দ, আবেগকে আধুনিক আঙ্গিক কুশলতায় এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে কবিতায় তিনি যথার্থই জীবনশিল্পী। যাপিত জীবনের সংকট আর সম্ভাবনাকে তিনি যে অবয়ব দিয়েছেন তা কেবলমাত্র সন্ন্যস্থ একজন কবির পক্ষেই সম্ভব।
জসীম উদ্দীনের গ্রাম বাংলাদেশের গ্রাম। অন্য দেশের লোকজ জীবনের সঙ্গে সে গ্রামের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু মানবিক অনুভূতির যে স্পর্শময়তা তিনি কবিতায় ছড়িয়ে দিয়েছেন তা স্বীকার করতেই হবে। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত জসীম উদ্দীন নগর জীবনের ক্ষোভ, অন্তঃসারশূন্যতার কথা জেনেও সেই জীবনকে তিনি সাহিত্যে ঠাঁই দেননি। সম্ভবত এজন্য যে, সে জীবনের সঙ্গে তার নাড়ীর যোগ নেই। সে জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত ভাষারূপ তিনি দিতে সক্ষম হবেন— এমন ভরসাও তার ছিল না। কারণ নগরকেন্দ্রিক সাহিত্যের ইন্দ্রধনু প্রাচ্যের আকাশ থেকে পাশ্চাত্যের নীল দিগন্ত পর্যন্ত একই ব্যঞ্জনায় পরিব্যপ্ত হয়। কিন্তু জসীম উদ্দীনের কবিতার ইন্দ্রধনু বাংলাদেশের আকাশ পর্যন্তই পরিব্যপ্ত। বিশ্ববীক্ষার সঙ্গে বলতে গেলে তার কোনো সম্পর্ক নেই। জসীম উদ্দীনের কবি ব্যক্তিত্বের মধ্যে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের ভাবনার মেলবন্ধনটি খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁর কবি ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের গ্রামকে নিয়েই।
বাংলার শ্যামল গ্রাম আর প্রকৃতি জসীম উদ্দীনের কবিতায় অবিনাশী ভালোবাসা বুকে নিয়ে জেগে থাকে। নগর সন্ত্রাসের সম্ভাব্য নিনাদের বিপরীতে জসীম উদ্দীনের কবিতা উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে ভুলে যাওয়া শৈশবের মতো এক করুণ আর্দ্র পল্লীর মুখ মনে করে। জসীম উদ্দীনের পল্লীবাসীরা বন্ধু ও বেদনা সমানভাবে উপভোগ করে, তারা ভালোবেসে ও ভালোবাসায় আকর্ষণ বোধ করে। তাদের জীবনে অস্বাভাবিকতা, কৃত্রিমতা বলতে কিছু নেই। দুঃখ-দারিদ্র্য-ব্যাধির মধ্যেও পল্লীবাসীরা জীবনের যে প্রেম, সে প্রেম মরণজয়ী স্বর্গীয় হয়ে ধরা পড়ে। এলউইন তাই জসীম উদ্দীনের কবিতা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন— "If you measure these people by the quality of their love and if you measure this poem by its power to portray that love, both poem and people must have a high place in our regard."
জসীম উদ্দীনের 'নকশি কাঁথার মাঠ' কাব্যে পল্লীর শ্যামল স্বর্ণশ্রী, তাঁর শ্যামল দুর্বা, তরুছায়া, ঘরকন্যা অপূর্ব মাধুর্য নিয়ে ধরা পড়েছে। এ কাব্যেই সবার আগে আমরা পল্লীর প্রথম সার্থক ও সামগ্রিক রূপ লক্ষ্য করি। আর তাই 'নকশি কাঁথার মাঠ' কাব্যের ইংরেজি অনুবাদ— 'The Field of the Embroidered Quilt'— এর ভূমিকায় বলা হয়েছে:
"The verse of Jasim Uddin varies between the dancing metre of genuine folk poetry, the terse unit of overuse and prosy passage of story telling and description."
জসীম উদ্দীন পল্লীর পরিবেশকে ধ্যানে, চিন্তায় ও প্রকাশে পূর্ণ মর্যাদা দিয়েছিলেন, যা আধুনিক রুচিকেও পরিতৃপ্ত করে। যদিও কলা-কৌশলের তেমন কোনো বাহাদুরি জসীম উদ্দীনের কাব্যে নেই। তবুও হৃদয়ধর্মের মহত্বে জসীম উদ্দীনের কাব্য অনির্বচনীয়। 'নকশি কাঁথার মাঠ'-এর ইংরেজি অনুবাদে মিলফোর্ড জসীম উদ্দীন সম্পর্কে বলেন:
"The mocking accident is not my trade...
It is my delight alone in summary state
To pipe a simple song
For thinking heart."
জসীম উদ্দীনের কবিতার শ্রী, ছাদ ও মর্জি নিরঙ্কুশ পল্লী প্রকৃতির। কাব্যকাহিনী নির্মাণে উপমা ও রূপকের যথোপযুক্ত প্রয়োগে তাঁর কবিতা পল্লীজীবনের স্বরূপ নিয়ে অনির্বচনীয় শিল্পমাধুর্যে দীক্ষিত হয়েছে। কবি লেখেন:
১। বাঁশরি আমার হারায়ে গিয়েছে বালুর চরে
কেমনে ফিরিব গোধন লইয়া গাঁয়ের ঘরে?
২। কোথায় খেলার সাথীরা আমার কোথায় ধেনু
সাঁঝে হিয়ায় রাঙিয়া উঠিছে গোখুর রেণু।
৩। সাঁঝের শিশির দুটি পাও ধরে কাঁদিয়া ঝরে
বাঁশি যে আমার হারায়ে গিয়াছে বালুর চরে।
(বালুচর)
'নকশি কাঁথার মাঠ' জসীম উদ্দীনের কাব্যসম্ভারে এক অমৃত সঞ্চয়ন। এক্ষেত্রে ওয়ার্ডসওয়ার্থ বর্ণিত নীতিসমূহ প্রয়োগ করেছেন তিনি কবিতায়। যদিও ওয়ার্ডসওয়ার্থের মননশীলতা ও শিল্পবোধের সঙ্গে জসীম উদ্দীন তুলনীয় নন। কিন্তু সাধারণ মানুষের মূল্যবোধগুলোকে সাধারণভাবে বিকশিত হতে দিয়েছেন জসীম উদ্দীন তাঁর কবিতায়। এক্ষেত্রে তিনি আতিশয্য কিংবা কৃত্রিমতার আশ্রয় নেননি। কাব্যস্বভাবে এবং কাব্যানুভূতিতে জসীম উদ্দীন একই রকম সৎ ও স্বাভাবিক। অনুভূতির সমান্তরাল উপমা, চিত্রকল্পসমৃদ্ধ উচ্চারণে কবি প্রবল ও অপ্রতিরোধ্য। কবি লেখেন—
এমনি করিয়া দিনে দিনে যেতে দুইটি তরুণ হিয়া
উহারা নিল বরণ করিয়া বিনি-সুতি মালা দিয়া।
এর প্রাণ হতে ওর প্রাণে গিয়ে লাগল কিসের ঢেউ
বিভোল কুমার, বিভোল কুমারী, তারা বুঝিল না কেউ।
(‘নকশি কাঁথার মাঠ’)
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীবনধারার আশ্চর্য সুন্দর আলেখ্য নির্মাণে জসীম উদ্দীন একই সঙ্গে ক্রিয়াশীল। জীবনাচারের বাস্তব চিত্র এখানে চিত্র রূপময় হয়ে উঠেছে। পল্লীর অন্তরের ঐশ্বর্যকে কবি অনুবাদ করেছেন তাঁর অনুভূতি দিয়ে। মানব-মানবীর জীবনের স্নেহ-প্রেমের যে মৃত্যুঞ্জয় রূপ কবি প্রত্যক্ষ করেছেন; এক কথায় তা অভিনব—
“গাছের পাতারা সেই বেদনায় বুনো পথে যেত ঝরে,
ফাল্গুনী হাওয়া কাঁদিয়া উঠিত শূন্য মাঠখানি ভরে।
পথ দিয়া যেতে গেঁয়ো পথিকেরা মুছিয়া যাইত চোখ,
চরণে তাদের কাঁদিয়া উঠিত গাছের পাতার শোক।
আথালে দুইটি জোয়াল বলদ সারা মাঠপানে চাহি
হাম্বা রবেতে বুক ফাটাইত নয়নের জল নাহি।”
(‘কবর’, ‘রাখালী’)
শোকের কারুণ্য যে পরিপার্শ্বের ছায়া ফেলেছিল, তা জসীম উদ্দীনের আপন জীবনের দুঃসহ অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝতে চেয়েছিলেন। 'Absolute sincerity of emotion and expression' নির্মাণ করতে গিয়ে প্রকাশভঙ্গিটি হয়েছিল Dramatic Monologue-এ মুখর। জীবন বাস্তবতার রূপকে জসীম উদ্দীন সুন্দর মানবীয় কামনায় ও না পাওয়ার বেদনায় যেভাবে শব্দবন্দী করেছিলেন, তাতে তার হৃদয় ধর্মের পরিচয় নিহিত হয়েছে। জীবন সত্যরূপে জীবনের যোগফল তিনি আপন অভিজ্ঞতা ও ভাবনার রূপায়ণ ঘটিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে তার সন্ধানী হৃদয়বোধ বিশ্বাসী আলো ফেলেছিল কবিতায়। জীবনের আঁধার প্রদেশগুলো আলোকিত করে জসীম উদ্দীন যে জীবন মহিমা উপলব্ধি করেছিলেন তা তার কবিতায় ভাবানুষঙ্গে ও ভাষানুষঙ্গে একত্রিত হয়েছে।
লোকগীতি গাথার মোহকর প্রভাব জসীম উদ্দীনের আপন আত্মার উৎসারণের পথ খুলে দিয়েছিল বলেই বাংলার হাজার গ্রাম জীবনের যোগে লোকজ চেতনাকে সরস রেখেও আধুনিক কাব্য পরিক্রমায় নতুন জিজ্ঞাসায় হাজির হয়েছে। ফলে গ্রামীণ জীবন হয়েছে চলমান, সতত প্রবাহমান। জসীম উদ্দীনের কবিতায় শৈশবের স্বপ্নময় দিনগুলো কবির স্মৃতিপটে মায়াময় পরশ বুলিয়ে যায় সারাক্ষণ।
গাথা সাহিত্যের আদর্শে তার কাহিনীকাব্য রচিত হলেও তাতে উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য আরোপ করে আধুনিক রুচির লালন করেছেন জসীম উদ্দীন। যে রুচি সমাজ চেতনায় ঋদ্ধ। শুধু তাই নয় ভাষা, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, অলঙ্কার ব্যবহারে আধুনিক শিল্পরুচির প্রয়োগ দেখিয়েছেন—
‘গাছের পাতারা সেই বেদনার বুনোপথে যেতো ঝরে
ফাল্গুনী হাওয়া কাঁদিয়া উঠিত মাঠখানি ভরে।’
সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায় যথার্থই বলেছেন—
“পল্লী নিজেই এসে ধরা দিয়েছে তার কাছে; কোন তত্ত্ব কোন আদর্শ বা কোন দার্শনিক সত্যের মুখোশ এঁটে নয়, অকৃত্রিম জীবনের প্রতিরূপ হিসেবেই।”
জসীম উদ্দীনের সবকটি কাব্যেই যেমন ‘রাখালী’, ‘বালুচর’, ‘নকশি কাঁথার মাঠ’, ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’— পল্লী কবি মানসের প্রতিফলন ঘটেছে। এসব কাব্যে পল্লী প্রকৃতির পটভূমিতে পল্লীর মানুষের জীবনচিত্র, জীবনকাহিনী রচনা করেছেন কবি।
আদ্যন্ত গ্রাম বাংলার জীবন সংস্কৃতি কবিতায় ঠাঁই দিয়েছেন। কবি জীবনের প্রথমেই এ কারণেই জসীম উদ্দীনের কবিতা দীনেশচন্দ্র সেনকে কাঁদিয়েছে। তার ‘কবর’ কবিতা পড়ে তিনি কেঁদেছিলেন। দূরাগত রাখালীর বংশীধ্বনির মতো জসীম উদ্দীনের কবিতা শুধু দীনেশ সেনকেই নয় অনেককেই কাঁদিয়েছিল। অনেকে মনে করেন গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতি যেভাবে জসীম উদ্দীনের কবিতাকে গতিশীল করেছে, সে কারণেই গ্রামের মানুষের সহজ সরল অনুভূতি আর সে অনুভূতির ফসল হিসেবে যে প্রেম ভালোবাসার সুখ-দুঃখ বেদনায় বিজড়িত জীবন— এ জীবনের ভেতর-বাহির চিত্রিত হয়েছে জসীম উদ্দীনের কবিতায়। এক্ষেত্রে কবি চিত্রশিল্পীর দৃষ্টি ও যোগ্যতা নিয়ে কলম ধরেছিলেন। ফলে গ্রামের মানুষকে নিয়ে লেখা সেই কবিতা হয়ে উঠেছে ছবির কবিতা।
১। গাছের পাতারা সেই বেদনার বুনো পথে যেতো ঝরে
ফাল্গুনী হাওয়া কাঁদিয়া উঠিত শূন্য মাঠখানি ভরে।
(রাখালী)
২। “দশকান্দা জমির রূপার, তিনটা গরু হলে
ধানের বেড়ী ঠেকে তাহার বড় ঘরের চালে।”
৩। কাঁচা ধানের পাতার মত কচি মুখের মায়া
লাল মোরগের পাখার মত উড়ে তাহার শাড়ি
শুকনো চেলা কাঠের মত শুকনো মাঠ ঢেলা।
(নকশি কাঁথার মাঠ)
যদিও পল্লী প্রকৃতি আর পল্লীর মানুষের জীবনপ্রবাহ নিয়ে জসীম উদ্দীন তার কবিতার ডালি সাজিয়েছিলেন, তবুও সমাজ-বাস্তবতা জসীম উদ্দীনের কবিতায় উঠে এসেছে বাস্তবতা নিয়েই। নাগরিক জীবনের নানা ভাবনা প্রকাশেও তিনি তৎপর ছিলেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর ‘বালুচর’, ‘রূপবতী’, ‘মাটির কান্না’, ‘হলুদ বরণী’, 'জলের লেখন' ইত্যাদি কাব্যে। সাহিত্যের আটপৌরে শরীরে তিনি নাগরিক বৈদগ্ধের ছাপও রেখেছিলেন। জসীম উদ্দীনের কবিতার ভাষা ভাবেরই অনুগামী হয়েছে। লোকজ জীবনের অনুষঙ্গজাত শব্দমালা যেন ঝমঝম করে ঝরে পড়ে তার কবিতায়।
ফেলে ভনভন মশাদলে ফুল ফুটে ঝরে বনে
ফোটায় ফোটায় পাতা চোররা জল করিছে তাহার সনে।
জসীম উদ্দীনের মার্জিত রুচি ও প্রয়োগ নৈপুণ্যের গুণে আঞ্চলিক শব্দমালাও গ্রাম্যতা মুক্ত হয়ে শিল্পরুচির পরিচয় রেখেছে। আঞ্চলিক শব্দ তার আধুনিক মন ও মননের মোড়কে অনন্য মহিমা পেয়েছে। আঞ্চলিক শব্দই নয় গ্রাম্য বাকভঙ্গিকেও তিনি কবিতায় ব্যবহার করেছেন আশ্চর্য নিপুণতায়।
১। ‘ঢাকাই শাড়ি কিনে দিছে হাসঁলি দিছে নাকি
এত করে এখন কেন সাদি রাখিস বাকি?’
২। ‘গেরাম ভরি নাচে তার গাঙ শালিকের পায়
সামনে দাঁড়ায়ে মুনির মুন্সি, বয়স তাহার আশীর কাছে।’
(সোজন বাদিয়ার ঘাট)
জসীম উদ্দীনের কাব্যের উপকরণ পল্লীকেন্দ্রিক কিন্তু প্রকরণ আধুনিক। ভাষায়, ছন্দে, অলঙ্কারে তার প্রমাণ প্রচুর। ভাষা ব্যবহারে তিনি যতদূর সম্ভব কথ্যরীতির প্রয়োগ দেখিয়েছেন। কোথাও কোথাও সাধু ভাষা ব্যবহার করলেও তাতে স্বতঃস্ফূর্ত আমেজ বিনষ্ট হয়নি। ভাষা ক্ষেত্রে এই পরিমার্জন নিঃসন্দেহে যুগসচেতন আধুনিক দৃষ্টির পরিচায়ক।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।
১২৫ বার পড়া হয়েছে