সর্বশেষ

মতামত

তাহলে কি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে জুলাই বিপ্লব?

শিপন হালদার
শিপন হালদার

রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৬ ৭:৪২ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
চব্বিশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়টাতে আমি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের নিউজরুমে দায়িত্ব পালন করেছি সিনিয়র নিউজ এডিটর হিসেবে।

ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঠেকাতে নানামহলের তৎপরতা দেখেছি। গণমাধ্যমের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ দেখেছি। শিরোনামকে ডাউন প্লে হতে দেখেছি। গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি দেখেছি। তখন খারাপ লাগতো। মন খারাপের দিনগুলোতেও বেশিরভাগ গণমাধ্যম ছাত্র-জনতার পক্ষেই ছিল। যদিও গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেন। বাইরে থেকে দেখলে আমিও হয়তো তাদের মতো বলতাম! গুটি কয়েক সাংবাদিকের দায় আমি পুরো সাংবাদিক সমাজকে দেবো না। সত্যি কথা হলো, রাষ্ট্রযন্ত্রের বাইরে গিয়ে, আদেশ অমান্য করে পুরোপুরি পেশাদার সাংবাদিকতা করার উপযুক্ত পরিবেশ কোনদিন বাংলাদেশে হবে বলে আমার মনে হয় না। আমার আড়াই দশকের কর্মজীবনে এমন পরিস্থিতি দেখেছি কয়েকবার। ওয়ান-ইলেভেন, সবগুলো জাতীয় নির্বাচন, একুশে আগস্ট, শাপলা চত্বর, পিলখানা, সবশেষ ছাত্র-জনতার বিপ্লব। পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে অনেকবার হতাশ হয়েছি, ব্যথিত হয়েছি, কষ্ট পেয়েছি।

আপনাদের মনে হয়তো প্রশ্ন জাগছে-এসব কথা কেন লিখছি? আমার মনে হয়, সময়কে পাঠ করে মর্মার্থ অনুধাবন করতে আমরা সাংবাদিকরা বারবার ব্যর্থ হই। কারণ সময়ের ওপর একটা আবরণ থাকে, যেখান থেকে সত্যটা বের হতে সময় লাগে। মাঝখানের সময়টা আমরা ঘটনাপ্রবাহে ভেসে বেড়াই। তবে ঠিকই একদিন আলোর মতো সত্য বের হয়, ঘোর অন্ধকার থেকে। শতচেষ্টা করলেও সত্যকে লুকিয়ে রাখা যায় না। কেননা, সত্য ধ্রুব! জ্যোর্তিময়!

আমার অভিজ্ঞতা হলো, সাংবাদিকরাও সাধারণ মানুষের মতো আবেগপ্রবণ। তারাও খুব সহজে বিভ্রান্ত হয়। বর্তমান নিয়ে এতো বেশি মগ্ন থাকে যে ভবিষ্যত দেখতে পায় না। পেলেও গুরুত্ব পায় না। এ কারণে জুলাই বিপ্লবের পেছনে কারা রয়েছে? কাদের ইন্ধনে ছাত্রদের কর্মসূচির বারংবার পরিবর্তন হচ্ছে। কী উদ্দেশ্য তাদের? তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে কী না? রেজিম চেঞ্জের নামে বাংলাদেশকে কোন পথে নিয়ে যেতে পারে তারা? এক কথায় মাস্টার মাইন্ড কারা? তাদের চাওয়া-পাওয়া কী-এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা তখন খুঁজিনি। ব্যস্ত ছিলাম বর্তমান নিয়ে। ঘটনাপ্রবাহ জনগণের সামনে দ্রুততার সাথে তুলে ধরা নিয়ে।

বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিনের এক দলীয় শাসন, লুটপাট, দুর্নীতি, সীমাহীন অনিয়ম, বিরোধীপক্ষেরোপর দমন-পীড়ন, সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশে বাধা, হামলা-মামলা, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, বিশঙ্খলা ও অরাজকতার বিরুদ্ধে পুঞ্জিভূত ক্ষোভের ফল ছাত্র-জনতার বিপ্লব। সেক্ষেত্রে আন্দোলনের গতিপথ বাতলে দিয়েছে অদৃশ্য মানবেরা। যারা কী না নিজেদের পরাক্রমশালী মনে করে। আমার মনে হয়, কোটাবিরোধী ছাত্রদের আন্দোলন হলেতো আর বিপ্লব হতো না। সরকার হঠানো সম্ভব হতো না। জনগণের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণের কারণেই সফলতা পেয়েছে জুলাই বিপ্লব। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর দলবল। সময় যত যাচ্ছে, নদীচরের বুকে পদচিহৃগুলো বাঘের নাকি হরিণের তা স্পষ্ট হচ্ছে!

এটাও ঠিক, ছাত্র আন্দোলনের সময়টাতে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল। তখনকার সময়ে দলীয়করণ করা পুলিশ বাহিনীর গুলির সামনে বুক চিতিয়ে দিয়ে আন্দোলনকে স্ফুলিঙ্গের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন শহীদ আবু সাঈদ। নতুন প্রজন্মের চেতনায় স্বপ্নের আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিয়েছিলো ছাত্র-জনতা। আমরাও সেদিনগুলোতে স্বপ্ন দেখেছিলাম, নতুন বাংলাদেশের। সঙ্গতকারণে, জুলাই জাতীয় সনদের সফল বাস্তবায়নের জন্য গণভোটের পক্ষে ভোট দিয়েছেন দেশের ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন। শতাংশের হিসেবে ৬০ দশমিক ২৬। একটি সফল জাতীয় নির্বাচন জনগণের ভোটে বিএনপি নিরঙ্কুশভাবে সরকার গঠন করেছে। সরকারি দল হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গঠনের প্রতিশ্রুতি তাদের রয়েছে।

আমার প্রশ্ন হলো, যে জুলাই বিপ্লবকে একাত্তরের সাথে তুলনা করা হলো, যারা জুলাইকে বড় করে দেখলো,, তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল? যারা বাংলাদেশের মানচিত্র, সংবিধান নতুন করে লিখতে চাইলো, তাদের মতলব কী হতে পারে? যারা জাতীয় সঙ্গীত ও পতাকা পাল্টানোর মতো আওয়াজ তুললো, তারা কারা? তারা কোথায়? যেটা বলেছিলাম, সত্য ধ্রুব। সত্য প্রকাশিত হবেই। তাহলে কি সত্য প্রকাশ হতে শুরু করেছে? জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া কী ইচ্ছে করে হাটে হাড়ি ভাঙ্গলেন! তিনি কী বার্তা দিতে চাইছেন রাজনীতিবিদদের? সরকার ও জনগণকে? তাহলে কী জুলাই বিপ্লব জনগণের ক্ষোভকে কুক্ষিগত করে করা হয়েছে? বিদেশিদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ছাত্র সমাজকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে? আমরা ভূ-রাজনীতির বলি হয়েছি? সামনের দিনে কী আবারও গিনিপিগ হবো আমরা?

এবার সরাসরি আসি মূল বক্তব্যে। এতো প্রশ্ন যে কারণে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে, দিনকে দিন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে জুলাই বিপ্লব। জুলাই জাতীয় সনদ। আগামীর বাংলাদেশ। তারুণ্যের স্বপ্ন-ভবিষ্যত। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) বিকালে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত আলোচনা সভায় দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে ২০২৯ সাল পর্যন্ত স্ট্র্যাটেজি সাজিয়েছিলো ‘ডিপ স্টেট’। তিনি বলেন, “তখনকার সরকারের শুরুর দিকে আমাদের বিভিন্ন শক্তিশালী ইনস্টিটিউশন, যাদেরকে আসলে ‘ডিপ স্টেট’ বলা হয়, তাদের কাছ থেকে নানা প্রস্তাব করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, ‘শেখ হাসিনার যে মেয়াদ আছে ২০২৯ সাল পর্যন্ত, সেটি আপনারা শেষ করুন। আমরা আপনাদের সহযোগিতা করবো’।”

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে আসিফ আরও বলেছেন, “সরকার যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে চায়, তাহলে আমরা তাদের সহযোগিতা করবো।” অন্যথায় জনগণের কাতারে এসে সঠিক গতিপথ বেছে নিতে হবে। তার মানে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে বিএনপির পরিণতিও আওয়ামী লীগের মতো হতে পারে। ছাত্র-জনতা আবারও রাজপথে নেমে আসবে। আন্দোলন করবে। সরকারের পতন ঘটাবে।

এসব কীসের আলামত! তাহলে কী জুলাই বিপ্লবের আড়ালে ‘ডিপ স্টেট’ কার্যকর রয়েছে? পরিস্থিতি নিজেদের পক্ষে নিতে যা কিছু করতে পারে তারা। আসলে নির্বাচন নিয়ে জামায়াত-এনসিপিসহ অন্যরা সন্তুষ্ট নয়। এটা মোটামুটি পরিষ্কার। সাবেক প্রভাবশালী উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এক সাক্ষাৎকারে মুখ ফসকে যে কথাটি বলেছেন, তাতে বোঝা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের ফলাফলে কারসাজি করেছে। জামায়াতকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, তাঁরা জামায়াতে ইসলামীকে মেইনস্ট্রিম হতে দেননি। তাঁর মতে ‘তারা সংসদে বিরোধী দলে থাকলেও আমরা তাদের মেইনস্ট্রিমে আসতে দিইনি।’ সাবেক উপদেষ্টার বক্তব্যে এটা স্পষ্ট, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কারসাজিমুক্ত ছিল না।

সিনিয়র সাংবাদিক শংকর মৈত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, আসিফ মাহমুদের স্বীকারোক্তি অনু্যায়ী এটা স্পষ্ট এখানে ডিপ স্টেটের খেলাই ছিল ক্ষমতার পট পরিবর্তনের নেপথ্যে। অযথা এরা জুলাই বিপ্লব বলে। মানুষের মুক্তির জন্য যে সংগ্রাম সেই বিপ্লবকে অপমানিত করে জুলাই বিপ্লব বলে। ডিপ স্টেট প্রচুর ডলার বিনিয়োগ করেছিল। তিনি আরো লিখেছেন, ডিপ স্টেট স্থানীয় এজেন্টদের ব্যবহার করে এবং কিনে ফেলে। তাদের এ খেলা নতুন কিছু নয়। রাজনীতিবিদ, আমলা কামলা, জেনারেল, বিচারক, সাংবাদিক থেকে দোকানদার পর্যন্ত তারা কিনে নেয়। যার ডিমান্ড যেমন। ওয়ান ইলেভেনও ডিপ স্টেটের খেলা ছিলো।

সবকিছু দেখে-শুনে-পড়ে মনে হচ্ছে, খেলা এখনো সমানে চলছে অন্তরালে! আপনি ঠিক করুন, কোন পক্ষে যাবেন? বাংলাদেশ ও স্বাধীনতার পক্ষে নাকি বিপক্ষে? তবে বাংলাদেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে জুলাই বিপ্লবকে বিতর্কিত হোক, তারুণ্যের আত্মত্যাগ প্রশ্নবিদ্ধ হোক, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন ধুলুণ্ঠিত হোক-আমি তা চাই না। আমি চাই, নতুন প্রজন্মের স্বপ্নে গড়া গণতান্ত্রিক-স্বনির্ভর বাংলাদেশ। যেখানে মতভেদ ভুলে মাতৃভূমির প্রশ্নে আমরা সবাই একমত থাকবো।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।

১৯০ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন