সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে নতুন রাজনৈতিক উত্তাপ
রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬ ৩:৫৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান–সংক্রান্ত প্রস্তাব বাস্তবায়নকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ সৃষ্টি হয়েছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন দ্রুত আহ্বানের দাবিতে সরব হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য।
তাদের দাবি, রোববারের মধ্যে অধিবেশন না ডাকা হলে রাজপথে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। অন্যদিকে সরকারি দল বিএনপি বলছে, বিষয়টি সংসদের অধিবেশনে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হতে পারে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা রয়েছে। একই দিনে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য—এই দুই পরিচয়ে শপথ নেওয়ার বিধানও ছিল। তবে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিরোধী দলের সদস্যরা দুটি শপথই নিলেও বিএনপি থেকে নির্বাচিত সদস্যরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। তাদের বক্তব্য, সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথের বিধান নেই; ভবিষ্যতে তা যুক্ত হলে তখন শপথ নেওয়া যাবে।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে। প্রথম দিন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিরোধী দলের সদস্যরা বিক্ষোভ দেখিয়ে ওয়াকআউট করেন। বিরোধী দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রোববার অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনেও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা হতে পারে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করার কথা। সেই সময়সীমা অনুযায়ী রোববারই অধিবেশন ডাকার শেষ দিন। তবে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে এখনো এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা আসেনি।
জানা গেছে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। জুলাই সনদের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে গণভোটের ফল ও জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের কাজ সম্পন্ন করার কথা।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে ইতোমধ্যে হাইকোর্টেও রিট দায়ের হয়েছে। পৃথক দুটি রিটের শুনানি শেষে গত ৩ মার্চ হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রুল জারি করে এবং বিবাদীদের চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ দেয়।
এদিকে শনিবার জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির জরুরি বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ৩০ দিন পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে যদি জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করা হয়, তবে সরকারকে এর দায় নিতে হবে। দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।
তিনি অভিযোগ করেন, একই নির্বাচনের ভিত্তিতে সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন হওয়ার কথা থাকলেও সরকার শুধু সংসদের অধিবেশন ডেকেছে। বিএনপির সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ায় পরিষদ গঠন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে বিএনপির নেতারা বলছেন, জুলাই জাতীয় সনদ রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমতসহ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়নে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে সংবিধানে সংশ্লিষ্ট বিধান যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া সম্ভব নয় বলে তাদের মত।
জুলাই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান–সংক্রান্ত। এর মধ্যে ৩০টি প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য থাকলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, উচ্চকক্ষ গঠন পদ্ধতি এবং সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার মতো বিষয়গুলোতে বিএনপির ভিন্ন অবস্থান রয়েছে।
সব মিলিয়ে জুলাই জাতীয় সনদের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তায় পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
১৩৪ বার পড়া হয়েছে