রাজনীতির ভাষা ও সংস্কৃতির অবক্ষয়: গালিগালাজ সাহসিকতা নয়, নিম্ন রুচি ও সংস্কৃতির প্রকাশ
মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬ ১২:৪০ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
একটি দেশের রাজনৈতিক মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সেই দেশের রাজনৈতিক কর্মীদের ভাষা, আচরণ এবং সহনশীলতার ওপর। রাজনীতি মানেই মতাদর্শের লড়াই এবং যুক্তির সংঘাত।
কিন্তু যখন এই যুক্তি আর আদর্শের স্থান দখল করে নেয় অশ্রাব্য গালিগালাজ, ঔদ্ধত্য এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ, তখন তা আর 'রাজনীতি' থাকে না; বরং তা হয়ে দাঁড়ায় নিম্নরুচি ও সুস্থ সংস্কৃতির চরম বিপর্যয়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে এই প্রবণতা এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, যা তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ও সামাজিক কাঠামোর জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ।
গালিগালাজ বনাম সাহসিকতার নামে আমাদের সমাজে বর্তমানে এক বিকৃত মানসিকতা জেঁকে বসেছে। প্রকাশ্যে অন্যকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা বা কদর্য ভাষায় আক্রমণ করাকে এক ধরণের 'সাহসিকতা' হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, গালিগালাজ বা কটু কথা কখনোই বীরত্বের পরিচয় হতে পারে না। এটি মূলত: ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ দীনতা এবং উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভাবকে প্রকাশ করে। অন্যকে অশ্রদ্ধা করে কদর্য ভাষায় গালি দেওয়া সাহসিকতা নয়, বরং তা ব্যক্তির নিম্ন রুচি ও কুরুচিপূর্ণ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
জুলাই-পরবর্তী ভাষার বিকৃতি ও তরুণ প্রজন্মের ওপর যে প্রভাব তা উদ্বেগজনক। চব্বিশের জুলাই গণভ্যুত্থান ছিল এদেশের মানুষের জন্য এক নতুন আশার নাম। তরুণ সমাজের আত্মত্যাগ সারা বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এই আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে প্রয়াত এক তরুণের ব্যবহৃত কিছু অশ্রাব্য গালি ব্যাপকভাবে উঠতি তরুণদের প্রাত্যহিক ভাষায় পরিণত হয়েছে। এই ধরণের শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহার তরুণদের রুচিবোধকে ধ্বংস করছে।
এরই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে আরেক তরুণ নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ এবং প্রতিপক্ষকে অযৌক্তিকভাবে ক্রমাগত আক্রমণ করার প্রবণতা এই সাংস্কৃতিক পচনেরই অংশ। একজন উদীয়মান রাজনৈতিক কর্মীর ভাষা হওয়া উচিত অনুপ্রেরণামূলক এবং সহনশীল। কিন্তু এর বিপরীতে তার ক্রমাগত অশ্রাব্য গালিগালাজ এবং ঔদ্ধত্য কেবল তার ব্যক্তিগত নিম্নরুচিই নয়, বরং তার রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বকেও জনসমক্ষে তুলে ধরছে। নিজেকে হাসির পাত্রে পরিনত করেছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র মতো সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রায়শই দেখা যাচ্ছে হুমকি দেওয়া বা 'মব' (উচ্ছৃঙ্খল জনতা) তৈরি করার প্রবণতা। তাদের প্রতিনিয়ত একই ভাষায় গালিগালাজ এবং উসকানিমূলক আচরণের কারণে জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন শূন্যের কোটায় চলে গিয়েছে। স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে জোটগত নির্বাচনে অংশ নেয়ায় রাজনৈতিকভাবে তাদের সম্ভাবনার অপমৃত্যু হয়েছে।
জুলাই পরবর্তী সময় কিছু হলেই 'রাজুতে আয়' ডাক দিয়ে উপস্থিত ছাত্র জনতার সামনে কখনো সেনানিবাস ঘেরাও, আবার কখনো রাষ্ট্রপতিকে সরানোর জন্য বঙ্গভবন অভিমুখে যাত্রা, যমুনা ঘেরাও করার মতো সিদ্ধান্তগুলো কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ছাড়াই তারুন্যের আবেগ তাড়িত হওয়ায় শুভ কিছু বয়ে আনেনি। এ দলের প্রতিটি নেতাকর্মী প্রতিপক্ষকে অশ্রবণযোগ্য শব্দে ক্রমাগত আক্রমণ করে চলেছে। যা কোনোভাবেই বীরত্ব বলা যায় না; একে বলা যায় স্রেফ গায়ের জোর খাটানো। গায়ের জোরে রাজনীতির ভাষা যখন গালিগালাজ হয়ে ওঠে, তখন সেটি আর সুস্থ ধারার রাজনীতি থাকে না। হাদির মতো প্রতিপক্ষকে অশ্রবণযোগ্য ভাষায় আক্রমণ করা তাদের রাজনৈতিক দৈন্যতাকেই বারবার প্রমাণ করে।
রাজনীতি কোনো পেশা নয়, এটি একটি আদর্শিক পথ। এই পথে চলতে গেলে ভাষার ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিপক্ষের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা থাকা আবশ্যক। গালিগালাজ এবং মব কালচারের মাধ্যমে সাময়িকভাবে আলোচনায় আসা সম্ভব, কিন্তু জনগণের হৃদয়ে বা ইতিহাসে স্থান পাওয়া অসম্ভব। বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে এই বিষাক্ত সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সুস্থ ধারা, মার্জিত রুচি এবং যুক্তিনির্ভর রাজনীতিই কেবল পারে একটি সুন্দর বাংলাদেশ উপহার দিতে। রাজনীতির ভাষা যখন শালীনতা হারায়, তখন তা সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। তাই এখনই সময়, গালিগালাজকে সাহসিকতা বলা বন্ধ করে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি পুনর্গঠন করার।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।
১২৫ বার পড়া হয়েছে