ছোট্ট মৌ : দুষ্টুমির রাজ্যে এক মায়াবী মেয়ে
শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬ ১:৩৯ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাড়ির সবার আদরের ছোট্ট মেয়েটার নাম তানজিলা হাবিব মৌ। কিন্তু নাম জিজ্ঞেস করলে সে গর্ব করে বলে—“মৌ চৌহান।”
কেউ তাকে শেখায়নি। তবু সে নিজেই পরিবারের সবার নামের সঙ্গে “চৌহান” যোগ করে দিয়েছে। যেন নিজের ছোট্ট পৃথিবীতে সে-ই পরিবারের নামের রক্ষক।
বাড়ির সবার চেয়ে ছোট বলে আদরও পায় সবচেয়ে বেশি।
কিন্তু বয়সে ছোট হলেও দুষ্টুমিতে সে যেন সবার বড়। ঘরের ভেতর তার পায়ের শব্দ থামে না—কখনো দৌড়, কখনো লাফ, কখনো ভাইবোনদের সঙ্গে ঝগড়া, আবার মুহূর্তেই হাসি।
মৌকে সামলাতে গিয়ে তার দাদী আর আম্মু প্রায়ই হাল ছেড়ে দেন।
“এই মেয়েকে থামাবে কে?”—তারা মাঝেমধ্যে হেসে এসব কথা বলেন।
মৌয়ের আরেকটা মজার স্বভাব আছে। স্বাভাবিক খাবার—ডাল, ভাত, মাছ, মাংস—এসবের প্রতি তার আগ্রহ প্রায় নেই বললেই চলে। তবে গরুর দুধ সে বেশ আগ্রহ নিয়ে খায়। আর কার্টুন দেখার কথা উঠলে তো কথাই নেই। স্মার্টফোন কিংবা স্মার্ট টিভিতে কার্টুন দেখার নেশা তার ভীষণ।
তবে মৌ শুধু দুষ্টু নয়, বেশ বুদ্ধিমানও।
বড় ভাই মুহিত যখন কলেজে যাওয়ার জন্য বের হয়, তখন মৌ তাকে বলবে—
“ভাইয়া, আমার জন্যে কিছু নিয়ে আসিস।”
বড় বোন মিতু স্কুলে যাওয়ার সময়ও একই কথা—
“আমার জন্যে কিছু আনতে ভুলবি না। আমি তোদের ছোট বোন হই না!”
আবার একটু পরেই সে বড়দের মতো উপদেশ দিতে শুরু করে—
“ভালো করে পড়াশোনা করিস, মানুষের মতো মানুষ হোস, চাকরি-বাকরি করিস… আর আমার জন্যে কিছু নিয়ে আসিস!”
পাড়ায় বেড়াতে যাওয়াই মৌয়ের সবচেয়ে বড় আনন্দ। বিশেষ করে তার ছোট দাদী (দাদীর ছোট বোন) আর সেজো দাদুর বাড়ি (দাদীর সেজো ভাই) তার খুব প্রিয়। প্রতিবেশীদের বাড়িতেও সে অবলীলায় ঢুকে পড়ে, যেন সব বাড়িই তার নিজের।
তবে মানুষের চেয়েও বেশি ভালোবাসা তার পশুপাখির প্রতি।
হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, কাঠবিড়ালি, শালিক, ঘুঘু, টিয়া, দোয়েল, টুনটুনি—সবাই যেন তার বন্ধু। বাড়িতে হরেক রকমের ফলের গাছ এবং বাগানে নানা জাতের পাখিদের আনাগোনা থেকেই তার এই ভালোবাসা তৈরি হয়েছে।
ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই সে প্রথম কাজ হিসেবে পাখিদের খাবার দিতে চায়।
আর তার সামনে যদি কোনো প্রাণী জবাই করতে যাওয়া হয়—তাহলে বিপদ!
মৌ ছুটে গিয়ে সেই প্রাণীটাকে জড়িয়ে ধরে বলবে—
“আমার বন্ধুকে তোমরা কাটবে কেন?”
তার ছোট্ট চোখে তখন কান্না, আর মুখে প্রতিবাদের জেদ ভেসে ওঠে।
বাড়ির সবাই তার কাছে খুব প্রিয়। সে একে একে সবার নাম করে বলবে—
“আমার দাদী ভালো, বাবা ভালো, আম্মু ভালো, কাকু ভালো, কাকীমুনি ভালো, মুহিত ভাইয়া ভালো, মিতু আপু ভালো, জেভিয়ার ভাইয়াও ভালো।”
মজার ব্যাপার হলো—বাড়ির কারো শাসন সে খুব একটা মানে না। কিন্তু একজনের কথা সে মন দিয়ে শোনে—সেটা তার বাবা।
বাবা বাজারে গেলে মৌ বারবার ফোন করে। ফোন ধরলেই তার মিষ্টি কণ্ঠে বলে—
“বাবা, তুমি কোথায়?
আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি, বাবা।
তোমাকে খুব মিস করছি…
আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারছি না, বাবা। তুমি তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলে এসো, বাবা।”
তারপর একটু থেমে আবার নতুন আবদার—
“আচ্ছা বাবা, আসার সময় আমার জন্যে একটা পরী ড্রেস, একটা ডানা আর কয়েকটা চকলেট নিয়ে আসবে। তাড়াতাড়ি আসো, বাবা…
আল্লাহ হাফেজ, বাবা।”
এই ছোট্ট মেয়েটার দুষ্টুমি, ভালোবাসা আর সরলতায় ভরে আছে পুরো একটা বাড়ি।
মৌ যেন শুধু পরিবারের ছোট সদস্য নয়—সে পুরো বাড়ির হাসি, আনন্দ আর মায়ার আরেক নাম।
মাঝে মাঝে মনে হয়, ছোট্ট মৌ—দুষ্টুমির রাজ্যে এক মায়াবী নাম।
১৩৮ বার পড়া হয়েছে