নওগাঁয় টুপি বুনন শিল্পে প্রায় অর্ধলাখ নারীর কর্মসংস্থান, রপ্তানিতে সম্ভাবনা
শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬ ৭:২১ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
নওগাঁ জেলায় টুপি বুনন শিল্পকে ঘিরে ক্রমেই বাড়ছে নারীর কর্মসংস্থান। এ শিল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজই করছেন নারী শ্রমিকেরা। বর্তমানে জেলায় প্রায় ৫০ হাজার নারী এই পেশায় যুক্ত রয়েছেন।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্রে জানা গেছে, রপ্তানিযোগ্য টুপি বুনন শিল্পের মাধ্যমে নওগাঁয় প্রায় অর্ধলাখ নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এই শিল্প থেকে প্রতি বছর অন্তত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন স্থানীয় উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা। অবসর সময়ে টুপি তৈরি করে অনেক নারী তাঁদের সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের তৈরি এসব টুপি রপ্তানি হচ্ছে ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।
নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার চান্দাশ, মহাদেবপুর সদর ও উত্তরগ্রাম ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ছাড়াও জেলার মান্দা ও নিয়ামতপুর উপজেলার প্রায় ৫০ হাজার নারী টুপিতে নকশা তৈরির কাজে যুক্ত আছেন। তাঁদের তৈরি নকশা করা টুপি যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে, যার মাধ্যমে দেশে আসছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। সম্ভাবনাময় এ শিল্পকে আরও এগিয়ে নিতে উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং নারী কারিগরদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
উদ্যোক্তারা জানান, নির্দিষ্ট নকশার ওপর নওগাঁর নারীরা নানা রঙের সুতা দিয়ে যে টুপি তৈরি করেন, তা ওমানের জাতীয় টুপি হিসেবে স্বীকৃত। দেশটিতে এই টুপিকে ‘কুপিয়া’ নামে ডাকা হয়। সাধারণত ‘কেন্দুয়া’ নামের এক ধরনের পাঞ্জাবির সঙ্গে এই টুপি পরেন ওমানের পুরুষেরা। নওগাঁর নারীদের হাতে তৈরি এসব টুপির প্রধান বাজার ওমান। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত ও কাতার এবং আফ্রিকার তানজানিয়া ও মরক্কোতেও এসব টুপি রপ্তানি করা হয়। ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, চলতি বছর নওগাঁ থেকেই প্রায় ৮০০ কোটি টাকার টুপি রপ্তানি হবে।
বছরের দুই ঈদে এই টুপির চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। সারা বছর টুপি সেলাইয়ের কিছু কাজ থাকলেও রমজান এবং দুই ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ততা বেড়ে যায় স্থানীয় কারিগর ও ব্যবসায়ীদের। সুঁই-সুতা দিয়ে তৈরি নান্দনিক এসব টুপির বাজারে চাহিদাও ব্যাপক। মূলত গ্রামীণ নারীরাই এই টুপির কারিগর। সংসারের কাজের পাশাপাশি টুপি সেলাইয়ের কাজকে অনেকেই এখন পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন, ফলে অনেক পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থারও উন্নতি হয়েছে।
টুপি কারিগর, ব্যবসায়ী ও মহাদেবপুর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় এক যুগ আগে ফেনী জেলার ব্যবসায়ী তায়েজ উদ্দিন মহাদেবপুর উপজেলার কুঞ্জবন গ্রামের নারীদের টুপিতে নকশা তৈরির কাজে উৎসাহিত করেন। শুরুতে অল্প কয়েকজন নারী আগ্রহ দেখালে তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়ে নকশা তৈরির কাজ শুরু করা হয়। পরে সংসারের কাজের ফাঁকে বাড়তি আয় করতে দেখে আশপাশের গ্রামের নারীরাও এ কাজে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে চাহিদা বাড়তে থাকায় মহাদেবপুর উপজেলার সদর, খাজুর, উত্তরগ্রাম, চান্দাশ, হাতুড় ও রাইগাঁ ইউনিয়ন, মান্দা উপজেলার ভালাইন, গনেশপুর, মান্দা সদর ও পরানপুর ইউনিয়ন এবং নিয়ামতপুর উপজেলার সদর, চন্দননগর, হাজীনগর ও ভাবিচা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে টুপিতে নকশা তৈরির কাজ ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে টুপি তৈরির কাজে প্রায় ১৫০ জন ব্যবসায়ী এবং প্রায় ৫০ হাজার নারী কারিগর যুক্ত আছেন।
ব্যবসায়ী ও কারিগরদের তথ্য অনুযায়ী, এক থান কাপড় থেকে প্রকারভেদে ৯০ থেকে ১০০টি টুপি তৈরি করা যায়। প্রথমে সাইজ করা কাপড়ের ওপর নকশা করা ট্রেসিং পেপার রেখে তেল ও নীল রঙ দিয়ে ছাপ দেওয়া হয়। পরে সেই ছাপ দেওয়া কাপড় বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে নারী কারিগরদের কাছে পৌঁছে দেন মাঠকর্মীরা বা এজেন্টরা। নারী কারিগররা কাপড়ের ওপর দেওয়া ছাপ অনুসারে সুঁই ও বিভিন্ন রঙের সুতা ব্যবহার করে নান্দনিক নকশা ফুটিয়ে তোলেন। কাজ শেষ হলে ব্যবসায়ীরা কারিগরদের মজুরি পরিশোধ করে টুপিগুলো সংগ্রহ করেন। এরপর এসব নকশা করা টুপির কাপড় চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লার রপ্তানিকারকদের কাছে বিক্রি করা হয়।
এই বিশেষ ধরনের টুপিতে সাধারণত চেইন, দেওয়ান, বোতাম, গুটি দানা এবং মাছের কাঁটা সেলাইসহ মোট ছয় ধরনের নকশা করা হয়। প্রতিটি টুপিতে আলাদা আলাদা নকশা থাকে। কারিগরদের মজুরি নির্ভর করে কাজের মান ও গুণের ওপর। প্রতিটি টুপিতে নকশা করার জন্য কারিগররা ১৬ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক পান। ১৬ টাকা মজুরির একটি টুপিতে নকশা করতে একজন কারিগরের প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। সংসারের ফাঁকে একজন কারিগর দিনে পাঁচ থেকে ছয়টি টুপিতে কাজ করতে পারেন। তবে সবচেয়ে সময়সাপেক্ষ কাজ হলো দানা সেলাই। একটি দানা সেলাইয়ের কুপিয়া টুপিতে নকশা করতে একজন কারিগরের ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। এর জন্য তিনি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান। তবে কাজটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম হওয়ায় একজন কারিগরের পক্ষে মাসে দুই বা তিনটির বেশি এমন টুপি তৈরি করা সম্ভব হয় না।
সম্প্রতি মহাদেবপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের খোসালপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, একটি বাড়ির উঠানে বসে অন্যান্য নারীদের সঙ্গে টুপিতে নকশা তোলার কাজ করছেন গৃহবধূ আশা বেগম (৪০)। তিনি জানান, তাঁর বাবার বাড়ি উপজেলার বাগডোব গ্রামে। সেখানে তিনি হাতের ও মেশিনে সেলাইয়ের কাজ শিখেছিলেন। প্রায় ১০ বছর আগে খোসালপুর গ্রামে বিয়ে হয়ে আসার পর দেখেন বাড়ির অন্য নারী সদস্য ও প্রতিবেশীরা টুপিতে নকশা তৈরির কাজ করছেন। বাড়তি আয়ের আশায় তিনিও এ কাজে যুক্ত হন। সংসারের কাজের ফাঁকে টুপিতে নকশা করে তিনি সপ্তাহে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করেন। বর্তমানে খোসালপুর গ্রামে তাঁর মতো আরও ৮০ থেকে ৯০ জন নারী এই কাজের সঙ্গে জড়িত।
কুঞ্জবন ঈদগাহপাড়া গ্রামের গৃহবধূ জুলেখা বেগম জানান, টুপির কাপড়ে ছাপ দেওয়া নকশার ওপর হাতে সেলাই করে নকশা তৈরি করা হয়। কাজের মান অনুযায়ী প্রতিটি টুপিতে নকশা করে তিনি ১৬ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান। তবে তাঁর মতে, যে পরিমাণ পরিশ্রম করতে হয় তার তুলনায় পারিশ্রমিক খুবই কম। দিনে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা কাজ করে তাঁরা ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত আয় করেন। মজুরি কিছুটা বাড়ানো হলে তাঁদের আয় আরও বাড়ত বলে তিনি জানান।
মহাদেবপুর উপজেলার মধুপুর গ্রামের ব্যবসায়ী সুজন হোসেন টুপির বড় ব্যবসায়ীদের একজন। তিনি জানান, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাঁর ভাষায়, কুপিয়া টুপির ব্যবসা দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে। আগে ফেনী ও নোয়াখালী থেকে টুপির কাপড়, সুতা ও নকশা সংগ্রহ করতে হতো। কিন্তু এখন স্থানীয়ভাবেই এসব উপকরণ পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে তাঁর অধীনে ২০ জন এজেন্ট কাজ করছেন এবং প্রতিটি এজেন্টের অধীনে ৫০০ থেকে ১ হাজার নারী কারিগর টুপি সেলাইয়ের কাজ করেন। গিট, দেওয়ান, চেইন ও মাছের কাঁটা নকশার টুপিতে সময় কম লাগে এবং মজুরিও তুলনামূলক কম।
তিনি আরও বলেন, এসব বিশেষ ধরনের টুপি দেশের বাইরে রপ্তানি হয়, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ওমানে এর চাহিদা বেশি। প্রকারভেদে প্রতিটি টুপি বিদেশের বাজারে ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়। ছোট-বড় মিলিয়ে নওগাঁ জেলায় প্রায় ১৫০ জন টুপি ব্যবসায়ী রয়েছেন। চলতি বছরে নওগাঁ থেকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার টুপি রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে।
মহাদেবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুজ্জামান বলেন, মহাদেবপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের নারীরা টুপি সেলাই করে স্বাবলম্বী হওয়ার যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। টুপিতে নকশা তৈরির মাধ্যমে গ্রামীণ নারীরা বাড়তি আয় করছেন, যা একটি দৃষ্টান্ত। তবে এই কাজে যুক্ত নারীরা মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন কি না, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। যদি বৈষম্যের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ন্যায্য মজুরি নির্ধারণে তিনি মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করবেন বলে জানান।
১১১ বার পড়া হয়েছে