১৩ বছরেও হয়নি ত্বকী হত্যার বিচার: থমকে আছে চার্জশিট
শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০২৬ ৭:০৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
ত্বকী শব্দের অর্থ ‘আলো’। এ লেভেল পরীক্ষায়, বিশ্বে প্রথম স্থান এবং রসায়নে দেশের সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে, বিশ্বমঞ্চে নিজের মেধার দ্যুতি ছড়িয়েছিল যে কিশোর, তার জীবনের আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল মাত্র ১৭ বছর বয়সেই।
২০১৩ সালের ৬ মার্চ নিখোঁজ হওয়ার দুদিন পর শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে পাওয়া গিয়েছিল পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর নিথর দেহ। আজ সেই হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ১৩ বছর পূর্ণ হলো।
কিন্তু ট্র্যাজেডি এখানেই শেষ নয়। ১৩ বছরে ১০১টি ধার্য তারিখ অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত আদালতে জমা পড়েনি আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের চার্জশিট। বিগত সরকারের পতনের পর তদন্তে নতুন গতি আসার আভাস মিললেও অদৃশ্য এক সুতোর টানে যেন থমকে আছে বিচার প্রক্রিয়া।
থমকে যাওয়া সেই ‘খসড়া চার্জশিট’
হত্যাকাণ্ডের এক বছর পর, ২০১৪ সালের ৫ মার্চ র্যাবের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছিল, আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ১১ জন মিলে ত্বকীকে হত্যা করেছে। টর্চার সেলে নিয়ে পৈশাচিক নির্যাতনের পর গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করা হয়। এমনকি একটি খসড়া চার্জশিটও গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। কিন্তু তৎকালীন র্যাব কর্মকর্তা জিয়াউল হাসানের হস্তক্ষেপ এবং প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের রাজনৈতিক চাপে সেই চার্জশিট আর আলোর মুখ দেখেনি।
ক্ষমতায় থাকাকালীন ওসমান পরিবার প্রভাব খাটিয়ে বিচার আটকে রেখেছিল। আমাদের প্রশ্ন—এখনো কি তারা বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে টাকা খরচ করছে? নেপথ্যে কারা কলকাঠি নাড়ছে তা পরিষ্কার হওয়া দরকার। রফিউর রাব্বি, নিহত ত্বকীর পিতা ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
বিচারের দাবিতে এক দশকের লড়াই
ত্বকী হত্যার বিচারের দাবিতে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতি মাসের ৮ তারিখ নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায় মোমবাতি প্রজ্বলন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই হত্যার বিচার দাবি করেছেন বিশিষ্টজনেরা। তবুও ১০১ বার সময় নিয়েও চার্জশিট জমা না দেওয়াকে বিচার ব্যবস্থার জন্য ‘লজ্জাজনক’ বলে মনে করছে নাগরিক সমাজ।
আইনজীবী জিয়াউল ইসলাম কাজল বলেন, "আদালত বারবার তদন্তকারী সংস্থার কাছে জানতে চেয়েছে কেন চার্জশিট দেওয়া হচ্ছে না। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি সাধারণ মানুষের বিচার বিভাগের ওপর আস্থা কমিয়ে দেয়।"
পটপরিবর্তন ও বর্তমান অবস্থা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর এই মামলার তদন্তে নতুন মোড় আসে। নতুন করে ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে কাজল হাওলাদার নামের একজন আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দিয়েছেন। তবে পুরো বিষয়টি নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি।
বর্তমান তদন্তকারী সংস্থা র্যাব-১১ এর সিইও লে. কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে এখনই ক্যামেরার সামনে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পর্দার অন্তরালে থাকা ‘মাস্টারমাইন্ড’দের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা,আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী' সংগঠনের সভাপতি নূর উদ্দিন আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা আশা করেছিলাম অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দ্রুত চার্জশিট হবে। কিন্তু এখনো সেই দীর্ঘসূত্রিতা কাটেনি।"
এক নজরে ত্বকী হত্যা মামলা:
নিখোঁজ: ৬ মার্চ ২০১৩
মরদেহ উদ্ধার: ৮ মার্চ ২০১৩
চার্জশিটের সময় নেওয়া হয়েছে: ১০১ বার
প্রধান অভিযুক্ত: আজমেরী ওসমান ও সহযোগীরা (র্যাবের খসড়া চার্জশিট অনুযায়ী)
আলোর পথযাত্রী ত্বকীর আত্মা শান্তি পাবে তখনই, যখন প্রকৃত খুনিরা কাঠগড়ায় দাঁড়াবে। নতুন সরকারের আমলে সেই কাঙ্ক্ষিত বিচার শুরু হবে—এমনটাই প্রত্যাশা নারায়ণগঞ্জবাসীর।
১৩০ বার পড়া হয়েছে