শাহজালাল (রহ.) মাজারে রাজনৈতিক স্লোগানকে ঘিরে সিলেটে বিতর্ক
বৃহস্পতিবার , ৫ মার্চ, ২০২৬ ২:৪৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
সিলেটে আগত রাজনীতিবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত রীতি রয়েছে—শহরে এলেই তারা প্রথমে হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন।
সরকারদলীয় মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারাও এ রীতি অনুসরণ করে আসছেন বহু বছর ধরে। তবে মাজার প্রাঙ্গণে রাজনৈতিক মিছিল বা স্লোগান দেওয়ার ঘটনা আগে কখনো শোনা যায়নি।
তবে এবার সেই প্রচলনে ব্যতিক্রম ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র কয়েকজন শীর্ষ নেতার উপস্থিতিতে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে স্লোগান ও মিছিলের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সিলেটজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
বুধবার (৪ মার্চ) রাতে এ ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, এনসিপির বিভাগীয় ইফতার মাহফিল উপলক্ষে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম সিলেট সফরে আসেন। নগরের একটি কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত বিভাগীয় ইফতার মাহফিলে তারা অংশগ্রহণ করেন।
ইফতার শেষে তারাবির নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে তারা রাতে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে যান। এ সময় তাদের সঙ্গে থাকা নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা মাজার প্রাঙ্গণে জড়ো হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, একপর্যায়ে নারী ইবাদতখানার ছাদে উঠে সারজিস আলম স্লোগান দেওয়া শুরু করেন।
সেখানে ‘ইনকিলাব ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবর’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’, ‘দালালি না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ’, ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘গোলামি না আজাদি, আজাদি আজাদি’, ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেব রক্ত’ এবং ‘রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়’—সহ বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়। উপস্থিত অন্য নেতাকর্মীরাও এসব স্লোগানে অংশ নেন।
মাজার প্রাঙ্গণে এমন স্লোগান দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সিলেটের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই এটিকে মাজারের আদব ও পরিবেশের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন।
সিলেট জেলা বিএনপির উপ-দপ্তর সম্পাদক মাহবুব আলম তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “সিলেটে একটি বেয়াদব চক্র পরিকল্পিতভাবে অশান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালিয়েছে। টোকাই–কিশোর গ্যাং ও ভাড়াটে উচ্ছৃঙ্খলদের ব্যবহার করে সামাজিক পরিবেশ অস্থিতিশীল করার প্রবণতা এখনই দমন করা জরুরি। দরগাহ মসজিদের পবিত্র প্রাঙ্গণে পরিকল্পিত স্লোগান কোনো শালীন রাজনীতির পরিচয় নয়।”
নাগরিক আন্দোলনের সংগঠক আব্দুল করিম কিম তার ফেসবুক পোস্টে বলেন, “সুলতানুল বাঙাল হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের সময় আজ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল দলীয় স্লোগান দিয়ে মাজার এলাকার আদব নষ্ট করেনি। আজ মাজার জিয়ারতের নামে এনসিপির নেতারা যে আচরণ করেছেন তা সুফি দরগার আদবের খেলাফ।”
তার ওই স্ট্যাটাসে মন্তব্য করে সংস্কৃতিকর্মী শামসুল বাসিত শেরো দাবি করেন, ঘটনাটি মাঝরাতে নয়; তখনো তারাবির নামাজ চলছিল এবং তিনি ১২ রাকাত শেষে বের হওয়ার সময়ও স্লোগান চলছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মো. নাজমুল ফারুক নামের একজন লেখেন, “হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ নয়। অতীতে এমন চর্চা সিলেটে ছিল না।”
অন্যদিকে সানজিদ আহমদ নামের একজন মন্তব্য করেন, “মাজার হলো জিয়ারতের জায়গা। এখানে রাজনৈতিক স্লোগান কেন?”
এ বিষয়ে এনসিপি সিলেট মহানগরের সদস্য সচিব কিবরিয়া সরওয়ার বলেন, “মাজার প্রাঙ্গণে প্রচুর জেন-জি তরুণ জড়ো হয়েছিল। নেতাদের দেখে তারা স্লোগান দিতে শুরু করে। পরে সারজিস আলমও এতে যোগ দেন। এতে মাজারের ভাবগাম্ভীর্যতা নষ্ট হয়নি। বিষয়টি উদ্দেশ্যমূলকভাবে সমালোচনা করা হচ্ছে।”
ঘটনাটি ঘিরে সিলেটের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। অনেকেই পবিত্র ধর্মীয় স্থানে রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
১০৬ বার পড়া হয়েছে