লোডশেডিং আর আলো-হাওয়ার গল্প
বৃহস্পতিবার , ৫ মার্চ, ২০২৬ ১০:২১ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার সচিবালয়ে নিজের কক্ষের অর্ধেক লাইট ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে দেন তিনি। একই সঙ্গে দিনের বেলা অফিস বা বাড়ি-ঘরের জানালার পর্দা সরিয়ে সূর্যের আলো ব্যবহারের জন্যও সবাইকে পরামর্শ দিয়েছেন সরকার প্রধান।
এটা ঠিক, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত যেভাবে ঘনীভূত হচ্ছে, তাতে জ্বালানি সংকটের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। তারওপর রয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বিল। আর গ্যাস বিল বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতেও লোডশেডিং করা ছাড়া অর্থ সাশ্রয়ের জন্য আর কোন বিকল্প নেই সরকারের সামনে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে সবাইকে। এজন্য দরকার জনসচেতনতা। আর এ কাজটাই নিজহাতে শুরু করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সকাল ৯টা ১০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে নিজের দফতরে আসেন। তিনি অফিসে এসে নিজের কক্ষের ৫০ শতাংশ লাইটের সুইচ অফ করে দেন এবং এসির বিদ্যুৎ প্রবাহ ২৫ দশমিক ১ মাত্রায় নিয়ে আসেন। এই মাত্রা নিলে বিদ্যুৎ খরচ কম হয়। একই সঙ্গে সকল মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
পতিত সরকারের আমলে দীর্ঘ ১৬ বছরের সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতি আর স্বেচ্ছাচারিতার দায় এখন নিতে হচ্ছে বর্তমান সরকারকে। এই দায় থেকে সৃষ্ট পরিস্থিতিকে এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই। সবাইকে এই দায় বহন করতে হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বিল আর গ্যাসের বকেয়া বিল মিলে প্রায় ৬৩ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে সরকারকে। আর অন্যদিকে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে লোডশেডিং সহ্য করতে হবে সাধারণ মানুষকে। ব্যক্তিজীবন ও শিল্প-কলকারখানায় এর বিরূপ প্রভাব পড়বে-এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দেশ এবং জনগণকে কতটা লোডশেডিং এর ভার বা যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে?
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আগেই চলমান বাস্তবতা নিয়ে মুখ খুলেছেন। বুধবার (৪ মার্চ) সাংবাদিকদের তিনি জানান, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা শুধু বাংলাদেশ নয়; পুরো বিশ্বের। যাতে কোনো ডিজাস্টার নয় সে ব্যাপারে সরকার সচেষ্ট আছে। এরপর জনগণকে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। মন্ত্রী আরো জানান, শপিংমলগুলোতে অহেতুক আলোকসজ্জা করা হয়েছে। এগুলোর দরকার নেই। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার বাদ দিয়ে গণপরিবহন ব্যবহার করুন। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রাখার আশ্বাসও দেন তিনি।
এরই ধারাবাহিকতা দেখলাম আমরা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বয়ং বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। নিজে সাশ্রয়ী হচ্ছেন, মানে আপনাকে-আমাকেও সাশ্রয়ী হতে হবে। সামনের দিনের যে সংকট তা সবাই মিলে মোকাবেলা করতে হবে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে আসন্ন সংকটের ব্যাপকতা সহজেই অনুমান করা যায়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাওনা জমেছে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের তেলচালিত কেন্দ্রগুলোর পাওনা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। আদানির পর বকেয়া আদায়ে এখন চাপ দিচ্ছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকেরা। তাঁরা বলছেন, বকেয়া না পেলে জ্বালানি কিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবেন না তাঁরা।
বর্তমান পরিস্থিতির শুরুটা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। তখন দরপত্র ছাড়াই একের পর এক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হয়। একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে বাড়তি কেন্দ্রভাড়া ধরে চুক্তি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। দেড় দশকে পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার ও খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৩ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮ টাকা ৯৫ পয়সা।
পিডিবি বলছে, প্রতি বছর বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়ছে। এবার মার্চে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট হতে পারে। এ সময় গ্যাস থেকে ৫ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এর জন্য দিনে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ লাগবে। এপ্রিলে ৬ হাজার ২৭০ মেগাওয়াট উৎপাদন করতে হলে ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস লাগবে, যা সম্ভব নয়। এ ছাড়া বেসরকারি খাতের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিপুল বকেয়া থাকায় কেন্দ্র চালাতে হিমশিম খাচ্ছে তারা। তার মানে এবারও ১২ হাজার ২০৪ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা অলস বসে থাকবে।
বাস্তবতা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়ায়নি, নতুন সরকারও এখন দাম বাড়াতে চায় না। তাই পিডিবির ঘাটতি পূরণে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা না হলে গ্রীষ্মে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হবে। তবে লোডশেডিং এর যন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্য আমাদের তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করতে হবে। গত বছর গ্রীষ্মের মতো কম তাপমাত্রা থাকলে এবারও স্বস্তি মিলতে পারে। তা না হলে যন্ত্রণাময় দিন অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। তাইতো সচেতনতার কোন বিকল্প নেই। সবাইকে এখন থেকেই বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে। নির্ভরতা বাড়াতে দিনের আলোর ওপর।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।
১৪৯ বার পড়া হয়েছে