১৩ মাসে উৎপত্তি ৩২টি: বড় ভূমিকম্পনের আশঙ্কা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা
শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৪:৩৪ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
দেশের ভেতরে ও সীমান্তবর্তী এলাকায় গত ১৩ মাসে ৩২টি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটেছে দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলে, যেটি দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক কম ঝুঁকির অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত ছিল। এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, ভূগর্ভে সঞ্চিত শক্তির বহিঃপ্রকাশই এসব ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প। এটি বড় কোনো ভূমিকম্পের ইঙ্গিতও হতে পারে।
গতকাল শুক্রবার দুপুর ১টা ৫২ মিনিটে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলাকে কেন্দ্র করে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কম্পন অনুভূত হয়। তবে উৎপত্তিস্থল হওয়ায় সাতক্ষীরাতেই কম্পন ছিল বেশি তীব্র।
আতঙ্কিত মানুষ ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। আশাশুনি সদরের বাসিন্দা আবদুল আলী জানান, হঠাৎ তাঁর দোতলা বাড়ি দুলে ওঠে, তখন পরিবারের সবাই দ্রুত নিচে নেমে আসেন। সুন্দরবন-সংলগ্ন হরিনগর গ্রামের বাসিন্দা পূর্বপদ মল্লিকও বলেন, দুপুরের দিকে হঠাৎ কম্পনে তাঁর দোতলা বাড়ি কেঁপে ওঠে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় বাংলাদেশকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে—অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ, মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ও কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। উত্তরের লালমনিরহাট থেকে দক্ষিণ–পূর্বের খাগড়াছড়ি পর্যন্ত অঞ্চলকে ধরা হয় অতি ঝুঁকিপূর্ণ। ঢাকাসহ উত্তর মধ্যাঞ্চল মাঝারি ঝুঁকিতে। আর বরিশাল ও খুলনা বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।
তবে বাস্তব চিত্র বদলাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ৩ দশমিক ২ মাত্রার এবং ৩ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর যশোরের মনিরামপুরেও ৩ দশমিক ৫ মাত্রার কম্পন রেকর্ড হয়।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দেশের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের দুটি টেকটোনিক প্লেটের বিপরীতমুখী টানের চাপে দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চল পড়েছে। এতে নতুন ফাটল তৈরি হতে পারে, অথবা পুরোনো কোনো ফাটল সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
ভূতাত্ত্বিকদের মতে, বাংলাদেশ তিনটি সক্রিয় ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থানে। এগুলো হলো—পূর্বাঞ্চলের সাবডাকশন জোন, উত্তরের ডাউকি ফল্ট এবং নেপাল থেকে অরুণাচল পর্যন্ত বিস্তৃত হিমালয়ান ফ্রন্টাল থ্রাস্ট অঞ্চল।
ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আক্তারুল আহসান মনে করেন, সাতক্ষীরার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পটি ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে হওয়া ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পরবর্তী কম্পন (আফটারশক) হতে পারে। তাঁর গবেষণায় কলকাতা থেকে জামালপুর হয়ে ময়মনসিংহ পর্যন্ত প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি নতুন ফাটলরেখার সন্ধান পাওয়া গেছে। সাতক্ষীরা ও নরসিংদী অঞ্চল এই ফাটলরেখার ‘হিঞ্জ লাইন’-এর মধ্যে পড়ে।
অন্যদিকে অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার আশ্বস্ত করে বলেন, ওই এলাকায় বড় কোনো সক্রিয় টেকটোনিক প্লেট সীমানা নেই। ফলে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে, তবে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি তুলনামূলক কম।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত দেশের ভেতরে ও সীমান্ত–সংলগ্ন এলাকায় ৩২টি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। এর মধ্যে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে হয়েছে ১০টি, যেগুলোর বেশিরভাগই ডাউকি চ্যুতির কাছাকাছি এলাকায়।
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াৎ কবীর বলেন, ২০১৬ সালের পর এমন নজির নেই যে মাত্র ১৩ মাসে দেশের অভ্যন্তরে এতগুলো ভূমিকম্প উৎপত্তি হয়েছে। তাঁর মতে, ভূগর্ভে বিপুল শক্তি জমে থাকার ফলেই এসব কম্পন ঘটছে, যা বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত হতে পারে।
তবে অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার এ বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। তাঁর মতে, এখন তথ্য সংগ্রহ ও প্রযুক্তির উন্নতির কারণে আগের তুলনায় বেশি ও নির্ভুলভাবে ভূমিকম্প শনাক্ত করা যাচ্ছে। আগে অনেক ছোট কম্পন নথিভুক্তই হতো না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো খুব ভীতিকর নয়। তবে দেশের ভেতরে ও আশপাশে ভূমিকম্পের সংখ্যা বাড়া বড় কোনো বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কার্যকর প্রস্তুতি জরুরি। অথচ বাস্তবে প্রস্তুতির ঘাটতি রয়ে গেছে।
তাঁদের মতে, এখনই অবকাঠামো শক্তিশালী করা, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে বড় ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতি ভয়াবহ হতে পারে।
১৩০ বার পড়া হয়েছে