বেতাগীতে জেগে ওঠা ‘ঝোপখালী পাখির চর’: হতে পারে সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র
বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৬:০৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা বরগুনার বেতাগী উপজেলায় বিষখালী নদীর মোহনায় জেগে ওঠা নতুন দ্বীপচর ‘ঝোপখালী পাখির চর’ ইতোমধ্যে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য এবং পর্যটন সম্ভাবনার কারণে চরটি ভবিষ্যতে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
দক্ষিণ উপকূলের বিষখালী নদীর অব্যাহত ভাঙনে যখন জনপদ বিলীন হচ্ছে, ঠিক তখনই নদীর বুক চিরে জেগে উঠেছে এই নতুন চর। সরেজমিনে দেখা গেছে, জোয়ারের সময় চরটি প্রায় পুরোপুরি পানিতে ডুবে যায়। সে সময় নৌকায় ভেসে উপভোগ করা যায় পাখির কলতান, বিস্তীর্ণ সবুজ বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। চরজুড়ে ছোট-বড় বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য। চরের ভেতর দিয়ে একেবেঁকে বয়ে গেছে ৫ থেকে ৭টি ছোট নালা, যেখানে পাওয়া যায় নানা প্রজাতির সুস্বাদু মাছ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ‘ঝোপখালী পাখির চর’ ঘিরে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন তারা। আগামী দশকে বিষখালী নদীর বুকে আরও ভূমি জেগে ওঠার সম্ভাবনাও দেখছেন অনেকে। নতুন এই ভূখণ্ড স্থানীয়দের মাঝে সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে।
ইতোমধ্যে চরটি পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব খন্দকার নাজমুল হুদা শামিম। এছাড়া বরগুনা জেলার একাধিক জেলা প্রশাসকও চরটি ঘুরে দেখেছেন। যুগ্ম সচিব খন্দকার নাজমুল হুদা শামিম ‘ঝোপখালী পাখির চর’কে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এ চর যে কোনো ভ্রমণপিপাসুকে মুগ্ধ করবে। পাখির কলতান, সবুজের সমারোহ এবং ছৈলা গাছের ডালে ডালে পাখির বাসা দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করবে সহজেই। স্থানীয় বাসিন্দা ফোরকান হোসেন ইমারত আশা প্রকাশ করে বলেন, সরকারি নজরদারি ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এটি একটি জনপ্রিয় পর্যটন স্পটে পরিণত হতে পারে।
পরিবেশকর্মী ও পর্যটন উদ্যোক্তা আরিফুর রহমান জানান, নদীমাতৃক বরগুনার দ্বীপ চরগুলোতে শীতকালে অসংখ্য দেশীয় ও অতিথি পাখি আশ্রয় নেয়। ‘ঝোপখালী পাখির চরে’ বালিহাস, বক, মদনটাকসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির পাখির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তিনি বলেন, অতিথি পাখিরা মৌসুমি হলেও একবার এলে পরবর্তী বছরেও তাদের বংশধরেরা ফিরে আসে। তবে সেখানে পাখি শিকারের অভিযোগ রয়েছে বলে তিনি প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। পাশাপাশি পাখির ডিম পাড়ার জন্য বক্স স্থাপনেরও প্রস্তাব দেন।
পরিবেশকর্মী ও সাংবাদিকরা চরে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে একটি পর্যবেক্ষক দল গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের বরগুনা জেলা সমন্বয়কারী হাসানুর রহমান বলেন, তার গ্রামের বাড়ির পাশেই অবস্থিত এ সম্ভাবনাময় স্থানটি এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। এমনকি স্থানীয় অনেক মানুষও এ সম্পর্কে অবগত নন। তিনি উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ কামনা করেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর বেতাগী উপজেলা সভাপতি সাইদুল ইসলাম মন্টু বলেন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে উঠলে এ স্থান থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করতে পারবে।
এ বিষয়ে বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহ. সাদ্দাম হোসেন জানান, যেখানে পাখিরা বসে সেখানে আপাতত কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হবে না, যাতে মানুষের উপস্থিতিতে পরিবেশ নষ্ট না হয়। তবে কিছুটা দূরে দর্শনার্থীদের বসার জন্য বেঞ্চ নির্মাণের কাজ চলছে, যা ঈদের আগেই শেষ হওয়ার আশা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, কেউ পাখি শিকার করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ‘ঝোপখালী পাখির চর’কে পাখিদের নিরাপদ অভয়াশ্রম হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসন আরও উদ্যোগ নেবে।
বরগুনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) অনিমেষ বিশ্বাস জানান, চরটিকে অভয়ারণ্য ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলায় একটি পর্যটন কমিটিও গঠন করা হয়েছে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী পাখির চরকে অভয়াশ্রমে রূপ দেওয়া হবে।
চর লাগোয়া বেতাগী পৌরশহর থেকে ঝোপখালী ও ছোট ছোপখালী পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকায় বিষখালী নদীর ভাঙনরোধে নদী শাসনের কাজ চলমান রয়েছে। ফলে এলাকাটি এখন দৃষ্টিনন্দন বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। নদীর সৌন্দর্য কাছ থেকে উপভোগ করতে প্রতিদিন সেখানে মানুষের ভিড় বাড়ছে।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বেতাগী উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চরের নামকরণ ফলক উন্মোচন ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এরও আগে ২০২১ সালে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা ট্রলারযোগে বিষখালী নদীর ঝোপখালী মোহনায় জেগে ওঠা চরটি প্রথম আবিষ্কার করেন।
বরগুনা-২ (বামনা-পাথরঘাটা-বেতাগী) আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম মণি বলেন, ‘ঝোপখালী পাখির চর’কে অভয়াশ্রম ও আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
১২০ বার পড়া হয়েছে