বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–এর জন্য টেকসই কৌশল
মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১০:৫৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল। দলটি এখন ক্ষমতাসীন হলেও তাদের সামনে আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া দুর্নীতির মহামারী, চলমান রাজনৈতিক সংকট, সরকারি দায়িত্ব ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জসহ নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। আমার উত্থাপিত পরামর্শগুলো একটি শক্তিশালী, সুসংগঠিত ও টেকসই রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলেরই কিছু ব্যক্তিত্ব থাকেন, যারা দলের মূল চিন্তার কারখানা, আদর্শের ধারক এবং সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। তারা হলেন দলের 'অ্যাসেট' বা সম্পদ। এই ব্যক্তিরা সাধারণত ত্যাগী, আদর্শবাদী এবং দলের ভিত মজবুত রাখার কারিগর হন।
যদি এই মূল্যবান ব্যক্তিদের সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদ (যেমন মন্ত্রী, উপদেষ্টা) দেওয়া হয়, তাহলে তারা প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা, নীতি নির্ধারণ, তৃণমূল সংগঠন মজবুত করা—এসব কাজে তাদের অমূল্য গাইডেন্স থেকে দল বঞ্চিত হয়। দল তখন নেতৃত্বশূন্য ও দিশেহারা হয়ে পড়ে।
ক্ষমতার কেন্দ্রে গেলে এবং প্রশাসনের জটিলতায় পড়লে একজন আদর্শবাদী ব্যক্তিও দুর্নীতির প্রলোভনে পতিত হতে পারেন। এমনকি তিনি যদি দুর্নীতি না-ও করেন, তবু তার ওপর আশঙ্কা থেকে যায় এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাকে নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে, যা দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। তাই দলের মূল সম্পদদের দলের ভিত মজবুত রাখার কাজেই লাগানো উচিত। তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপকৃত হবে, যা একটি টেকসই রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়তে সাহায্য করবে।
পুলিশ বাহিনী রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তাদের কাজ হল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন পুলিশ রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে জিম্মি হয়ে 'গুন্ডা' বা দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়, তখন পরিণতি ভয়াবহ হয়।
২০২৪ সালের ঘটনাবহুল অধ্যায়গুলো ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত, যেখানে পুলিশের রাজনীতিকরণ ও বিতর্কিত ভূমিকার ফলে সরকারের পতন ত্বরান্বিত হয়েছে। যখন পুলিশ জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন জনরোষের মুখে সেই বাহিনী টিকতে পারে না।
বিএনপিকে ক্ষমতায় এলে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে পুলিশ বাহিনী সম্পূর্ণ পেশাদার, নিরপেক্ষ এবং জনগণের বন্ধু হিসেবে কাজ করে। পুলিশকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুগত না বানিয়ে, আইনের অনুগত বানাতে হবে। তাদের প্রশিক্ষণ, সুযোগ-সুবিধা ও মানসিকতা এমন হতে হবে যাতে তারা দলীয় কোন্দলের ঊর্ধ্বে উঠে সব নাগরিকের সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। ২০২৪ সালের শিক্ষা থেকে বিএনপিকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
একটি দেশ পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে যোগ্য, অভিজ্ঞ ও সৎ উপদেষ্টার একটি দল থাকা জরুরি।
অনেক সময় নেতারা নিজের ঘনিষ্ঠ, আত্মীয়-স্বজন বা অনুগত কিন্তু অযোগ্য মানুষদের নিজের কাছাকাছি রাখতে পছন্দ করেন, যা 'ক্রোনিজম' নামে পরিচিত। এর ফলে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় দক্ষতার অভাব দেখা দেয় এবং দেশ ভুল সিদ্ধান্তের শিকার হয়।
প্রধানমন্ত্রী বা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের উচিত হবে নিজের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ, প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া। অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, আইন, শিক্ষা—প্রত্যেকটি বিষয়ে যারা প্রকৃত পাণ্ডিত্য রাখেন, তাদের পরামর্শ গ্রহণ করা হলে সরকারের সিদ্ধান্ত হবে অধিকতর ফলপ্রসূ ও দূরদর্শী। এটি একটি সুশাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত।
রাজনৈতিক দল এবং সরকার—এই দুইয়ের মধ্যে একটি পরিষ্কার বিভাজন রেখা থাকা প্রয়োজন। সরকার একটি সীমিত সময়ের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনিক ইউনিট, আর রাজনৈতিক দল একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান যা আদর্শ ও জনমতের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে।
উদাহরণস্বরূপ ওয়ামী লীগের অতীত ইতিহাস টেনে ধরলেই আমরা স্পষ্ট দেখতে পাবো যে, যখন একটি দল নিজেকে সরকারের মধ্যে সম্পূর্ণ বিলীন করে দেয়, তখন দলের নিজস্ব সত্তা ও গঠনতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। সরকারের পতন হলে দলটিরও অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। দলের মধ্যে কোনো স্বাধীন চিন্তা বা গঠনমূলক সমালোচনার জায়গা থাকে না। সবকিছু হয়ে ওঠে ক্ষমতাকেন্দ্রিক।
বিএনপিকে এই ফাঁদ এড়িয়ে চলতে হবে। সরকার গঠন করলেও দলকে তার নিজস্ব সত্তা নিয়ে সক্রিয় রাখতে হবে। দলের একটি স্বতন্ত্র নীতি-নির্ধারণী ফোরাম থাকবে, যা সরকারের কাজকর্ম খতিয়ে দেখবে এবং প্রয়োজনে গঠনমূলক সমালোচনা করবে। সরকারের মেয়াদ শেষে দল যেন আবারও শক্তিশালী হয়ে জনগণের মাঝে ফিরে যেতে পারে, সেই প্রস্তুতি সব সময় থাকতে হবে।
রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিটি কথা, বিশেষ করে গণমাধ্যমের সামনে দেওয়া বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভুল শব্দ, একটি অসতর্ক মন্তব্য দেশের ভাবমূর্তি, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
আপনাদের কি মনে আছে? সাংবাদিক প্রভাস আমিনের প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনার দাম্ভিক ও বিতর্কিত মন্তব্যের কারনে কি মহা প্রলয় ঘটেছিলো? যা জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল এবং তার সরকারের পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করেছিল। এটি একটি স্পষ্ট উদাহরণ যে কীভাবে একজন নেতার অসতর্ক বাক্যবাণ পুরো দল ও সরকারের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিএনপিকে একটি পরিষ্কার বার্তা দেওয়ার কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। দলের সব নেতাকে ইচ্ছামতো কথা বলার অনুমতি না দিয়ে, একজন বা দুইজন মনোনীত ও দায়িত্বশীল মুখপাত্রকে দলের পক্ষে কথা বলার দায়িত্ব দেওয়া উচিত। বাকি নেতাদের গণমাধ্যমের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় অধিক সতর্ক, সংযত, সংক্ষিপ্ত ও ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। সোশ্যাল মিডিয়াতেও তাদের বক্তব্য যেন দলীয় শৃঙ্খলা ও দেশের স্বার্থের পরিপন্থি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
এই পরামর্শগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে বিএনপি শুধু একটি কার্যকরী রাজনৈতিক দল হিসেবেই টিকে থাকবে না, বরং দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে একটি সুশাসন ও উন্নয়নের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হবে।
লেখক: গবেষক ও বিশ্লেষক, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক।
২২৭ বার পড়া হয়েছে