ভাষার মর্যাদাঃ মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব বনাম সাংস্কৃতিক লড়াই
সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৯:৪৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
ভাষা কেবল ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি জাতির আদর্শ, বিশ্বাস এবং অস্তিত্বের দর্পণ।
কিন্তু সমকালীন পৃথিবীতে ভাষার মর্যাদা ও মূল্যের প্রশ্নটি কেবল ব্যাকরণের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে এক গভীর রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে। এই লড়াইয়ে দেখা যায় এক অদ্ভুত দ্বিচারিতা, যেখানে তথাকথিত সেকুলারিজম ও আধুনিকতার আড়ালে সুকৌশলে একটি নির্দিষ্ট ধর্ম ও সংস্কৃতিকে—বিশেষত ইসলামকে—প্রান্তিক করে রাখার চেষ্টা চলছে।
আজকের বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে লক্ষ্য করা যায় যে, বাংলা ভাষায় আরবি, ফারসি বা ইসলামি ঐতিহ্যের কোনো শব্দ প্রবেশ করলে তাকে 'অশুদ্ধ' বা 'সাম্প্রদায়িক' তকমা দিয়ে বর্জন করার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অথচ ইংরেজি বা অন্য যেকোনো বিদেশি শব্দ অবলীলায় গ্রহণ করাকে দেখা হচ্ছে 'কালচার' বা আভিজাত্য হিসেবে। এই মানসিকতা মূলত এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ইসলামোফোবিয়া। যখন কেউ 'আল্লাহ হাফেজ' বা 'ইনশাআল্লাহ' বলে, তখন তাকে সেকেলে মনে করা হয়, কিন্তু 'হ্যালো' বা 'গুড বাই' বলাকে দেখা হয় স্মার্টনেসের মাপকাঠি হিসেবে। এটি ভাষার মর্যাদা রক্ষা নয়, বরং সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতি স্বীকার।
আমরা প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে 'হ্যালো' বলে দিন শুরু করি। আমাদের পকেটে থাকে 'মোবাইল', হাতে থাকে 'সেলফি' তোলার নেশা আর সারাদিন কাটে 'ফেসবুক'-এর দেয়ালে। মজার ব্যাপার হলো, এই শব্দগুলোর বাংলা করার প্রয়োজনীয়তাও আমরা অনুভব করি না। 'মোবাইল'-এর বদলে 'মুঠোফোন' কিংবা 'ফেসবুক'-এর বদলে 'মুখবই', 'সেলফি' এর বদলে 'নিজস্বী' শুনলে আমাদের কানে লাগে।
এই যে, বিদেশি শব্দের অহর্নিশ ব্যবহার কী ঐতিহ্যের প্রতি অনীহা—নাকি, এটাই প্রমাণ করে যে আমরা ভাষাগতভাবে কতটা পরাধীন?
উত্তর, এককথায় কি হবে? নিশ্চয় 'না" হওয়া বাঞ্ছনীয়।
ভাষার প্রকৃত মূল্য আসলে কোথায়? একটি ভাষার প্রকৃত মর্যাদা তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন তার ব্যবহারকারী গোষ্ঠী নিজের শিকড়কে ধারণ করে আধুনিক হতে শেখে। ইংরেজি 'হ্যালো' যদি আধুনিকতার প্রতীক হতে পারে, তবে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় অভিবাদন কেন পিছিয়ে পড়ার চিহ্ন হবে? ভাষার রাজনীতি আসলে একটি ক্ষমতার লড়াই। যখন কোনো গোষ্ঠী আপনার ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন তারা মূলত আপনার চিন্তাধারাকেই বন্দি করে ফেলে।
ভাষার প্রকৃত মর্যাদা তার উদারতায় নিহিত, যেখানে নিজস্ব শিকড়কে আঁকড়ে ধরেও বিশ্বায়নের যুগে অন্য ভাষা ও প্রযুক্তিগত শব্দ গ্রহণ করা ভাষাকে আরও সংহত করে। সকল ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে প্রযুক্তির কারণে সৃষ্ট অভিন্ন ময়দানে যোগাযোগের প্রয়োজনে বিদেশি শব্দ ব্যবহার করা দোষের নয়, বরং তা ঐক্যবদ্ধ করে।
আমরা অনেক সময় অনুভব করি না। কারণ, প্রযুক্তিগত কারণে সারাপৃথিবী এখন অভিন্ন এক ময়দানে এসে হাজির হয়েছে। নিমিষে সবাই সবার সাথে যোগাযোগ করছে, ফলে প্রয়োজনের তাগিদে অন্য ভাষার শব্দ গ্রহণ করাও আজ অনিবার্য হয়ে গেছে।
তবে মনে রাখা প্রয়োজন, ভাষা কখনো বিভক্তি তৈরি করে না, বরং মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। এক ভাষা অন্য ভাষার সাথে মিশে সংহত ও জোরালো হয়। তাই কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যগত আদর্শের বেড়াজালে আটকে না থেকে, প্রয়োজনে যেকোনো ভাষার যেকোনো শব্দ গ্রহণ বা বর্জনের মানসিকতা থাকা উচিত। সকল ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান থাকা জরুরি, কারণ প্রতিটি ভাষাই কোনো না কোনো জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় বহন করে।
ভাষা হলো মিলনের সেতু, রাজনীতির হাতিয়ার নয়---
ভাষার প্রকৃত মর্যাদা তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়; যখন তাকে কোনো সংকীর্ণ রাজনৈতিক এজেন্ডার ঊর্ধ্বে রাখা হয়।
দুর্ভাগ্যবশত, আজ ভাষাকে করা হয়েছে 'রাজনীতির হাতিয়ার'। মজার ব্যাপার হলো, 'হাতিয়ার' শব্দটি নিজেই একটি বিদেশি (ফারসি) শব্দ, অথচ এটি আমাদের ভাব প্রকাশে এখন অপরিহার্য। একইভাবে, আমরা যখন 'কেদারা' বলি তখন তাতে যে আটপৌরে ভাব ফুটে ওঠে, 'চেয়ার' বললে যেন তাতে ক্ষমতার এক অদ্ভুত আভিজাত্য মিশে থাকে। এই মনস্তাত্ত্বিক বৈষম্যই প্রমাণ করে যে, আমরা এখনো ভাষাগত আভিজাত্যের মোহে বন্দি।
সুতরাং, ভাষাতীত অবজ্ঞা আর সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব থেকে নিজেদের মুক্ত করে একটি শুদ্ধ জাতিতে রূপান্তরিত হতে হবে। ভাষাকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা গোষ্ঠীকে কোণঠাসা করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করে, একে পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা --- মাতৃভাষার মমত্ব আর বিশ্বজনীন উদারতার মিশেলে আমরা যেন কেবল শব্দ নয়, বরং সত্য ও সুন্দরের চর্চায় বুঁদ হয়ে থাকতে পারি। কারণ ভাষা বিভাজন শেখায় না, ভাষা শেখায় হমদয়ের সাথে হৃদয়ের হৃদ্ধতা ।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি 'পরিশিষ্ট শুদ্ধ জাতিতে' রূপান্তরিত হওয়া, যেখানে মাতৃভাষার মিষ্টি শব্দেন্দ্রিয়ে বুঁদ থেকে যেমন নিজের শিকড়কে আঁকড়ে ধরব, তেমনি বিশ্বজনীন উদারতায় অন্য ভাষার প্রতিও সম্মান রাখব। ভাষাকে রাজনীতির অলঙ্কার ও অবলম্বন না বানিয়ে বরং একে পারস্পরিক মিলনের সারবত্তা সেতু বানিয়ে অন্তর পরিচ্ছন্ন করাই হবে কালিক কর্তব্য ।
লেখক : কবি ও নাট্যকার।
১৮৫ বার পড়া হয়েছে