নলতা আহছানিয়া মিশনের উদ্যোগে দেশের বৃহৎ ইফতার মাহফিল
সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৭:০১ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
পবিত্র রমজান মাসজুড়ে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার নলতায় অবস্থিত নলতা কেন্দ্রীয় আহছানিয়া মিশন-এর উদ্যোগে প্রতি বছরের মতো এবারও আয়োজন করা হয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ইফতার মাহফিল।
নলতা ওরছ শরিফ চত্বরে অনুষ্ঠিত এ গণ-ইফতারকে আয়োজকরা বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ইফতার আয়োজন হিসেবে দাবি করছেন।
মঙ্গলবার (১২ মার্চ) সকাল থেকেই শুরু হয় ইফতার প্রস্তুতির কাজ। রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিনে দেখা যায়, ভোর থেকে স্বেচ্ছাসেবকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ তৈরি করছেন সিঙ্গাড়া, কেউ দুধের ফিন্নি, আবার কেউ ছোলা ও ডিম সিদ্ধ করছেন। নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রায় ৬ হাজার মানুষের ইফতার প্রস্তুত সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেন তারা।
ইফতার প্রস্তুত শেষে শুরু হয় সুশৃঙ্খলভাবে বিতরণ কার্যক্রম। প্রতিদিন আড়াইশ থেকে তিনশ স্বেচ্ছাসেবক স্বেচ্ছাশ্রমে ইফতার বিতরণে অংশ নেন। তারা জানান, রোজাদারদের সেবায় যুক্ত হতে পেরে তারা গর্বিত ও আনন্দিত। প্রতিদিন কমবেশি পাঁচ হাজার ইফতারের প্লেটে খাবার পরিবেশন করা হলেও কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় না-যা অনেকের কাছেই বিস্ময়ের বিষয়।
এই মিশনের প্রতিষ্ঠাতা পীর এ কামেল আলহাজ খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ ১৯৩৫ সালের ১৫ মার্চ নলতা গ্রামে এ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর উদ্যোগেই রমজানে ছোট পরিসরে ইফতার আয়োজন শুরু হয়। সময়ের পরিক্রমায় তা বিস্তৃত হয়ে বর্তমানে দেশের অন্যতম বৃহৎ ইফতার মাহফিলে পরিণত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠাতার ভক্তরা জানান, হাজারো মানুষের ইফতার প্রস্তুত ও পরিবেশনে অংশ নিতে পেরে তারা আত্মতৃপ্তি অনুভব করেন এবং আখেরাতে কল্যাণের প্রত্যাশা করেন। এখানে ধনী-গরিবের কোনো ভেদাভেদ নেই। পীরভক্ত ভাইবোনেরা অনুদান দিয়ে এ আয়োজনের অংশীদার হন এবং সওয়াবের আশায় অংশগ্রহণ করেন।
মিশন সূত্রে জানা যায়, করোনা মহামারির আগে একসঙ্গে প্রায় ১০ হাজার রোজাদারকে ইফতার করানো হতো। তবে দুই বছর বন্ধ থাকার পর বর্তমানে প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাত হাজার মানুষের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী এতিমখানা, মসজিদ ও অসহায় মানুষের মাঝেও ইফতার বিতরণ করা হয়।
কর্মরত বাবুর্চিদের কেউ ৩৫ বছর, কেউ ২৫ বছর ধরে এ মিশনের সঙ্গে যুক্ত। তারা জানান, প্রতিদিন ভোর ৬টা থেকে ইফতার তৈরির কাজ শুরু হয় এবং বিকেল ৫টার মধ্যে ডিম, ছোলা, চিড়া, কলা ও ফিন্নিসহ সব প্রস্তুতি শেষ করতে হয়। বড় আয়োজন হলেও সবার মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ।
মিশনের নির্বাহী সদস্য আলহাজ মো. ইউনুছ বলেন, পীর কেবলা জীবিত থাকতেই ছোট পরিসরে ইফতার আয়োজন হতো। তাঁর মৃত্যুর পর একনিষ্ঠ সহচর সাবেক খাদেম মৃত আলহাজ মৌলভী আনছার উদ্দীন এ আয়োজনকে আরও বড় পরিসরে সম্প্রসারণ করেন। বর্তমানে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভক্তরা এখানে অংশ নিতে আসেন।
অনুদান দিয়ে সওয়াবের অংশীদার হওয়ার পাশাপাশি অনেকেই বিশ্বাস করেন, এশিয়া মহাদেশের অন্যতম বৃহৎ ইফতার মাহফিলে ধনী-গরিব সবার সম্মিলিত দোয়ায় আল্লাহ কবুল করবেন। একই কাতারে বসে সবাই সমানভাবে ইফতার গ্রহণ করেন। বিশেষ করে বৃহস্পতিবার ও জুম্মার দিন দূরদূরান্ত থেকে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীরাও এসে ইফতারে অংশ নেন।
মিশনের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম জানান, করোনা পূর্ববর্তী সময়ে এখানে ১০ হাজার মানুষের ইফতারের ব্যবস্থা থাকলেও বর্তমানে প্রতিদিন সাড়ে পাঁচ হাজারের মতো মানুষকে ইফতার করানো হচ্ছে। প্রতিদিনের এ আয়োজনে প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যয় হয় বলে মিশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, এ আয়োজন শুধু ধর্মীয় অনুশীলন নয়, বরং সামাজিক সম্প্রীতিরও অনন্য দৃষ্টান্ত। প্রতিবছর সাতক্ষীরাসহ আশপাশের জেলা থেকে হাজারো মানুষ নলতা শরীফে সমবেত হন। রমজানজুড়ে এ গণ-ইফতার নলতাকে পরিণত করে এক বৃহৎ ধর্মীয় ও সামাজিক মিলনমেলায়।
১২৪ বার পড়া হয়েছে