গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগের দুর্গে বিএনপির ঐতিহাসিক জয়
শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১২:০৫ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
দীর্ঘদিনের ‘আওয়ামী দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এক নজিরবিহীন ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে।
অতীতের নির্বাচনগুলোতে যেখানে বিএনপি প্রার্থীরা সচরাচর জামানত হারাতেন, সেখানেই এবার জেলার তিনটি সংসদীয় আসনেই বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন বিএনপির প্রার্থীরা। মৌলবাদ ঠেকানো, মিথ্যা মামলা থেকে মুক্তি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভিড়ে কৌশলগত কারণে ভোটাররা বিএনপিকে বেছে নিয়েছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এর আগে কেবল ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-০১ আসন থেকে একবার বিএনপির এফ.ই. শরফুজ্জামান জাহাঙ্গীর বিজয়ী হয়েছিলেন। তবে এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনটি আসনেই ধানের শীষের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন।
ভোটের সার্বিক পরিসংখ্যান জেলা রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গোপালগঞ্জ জেলায় মোট ভোটার ১০ লাখ ৯২ হাজার ৬১৮ জন। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৪ লাখ ৮৮ হাজার ১৬ জন। বৈধ ভোটের সংখ্যা ৪ লাখ ৭৩ হাজার ৬৪টি এবং বাতিল হয়েছে ১৪ হাজার ৯৫২টি ভোট। জেলায় মোট ভোট পড়ার হার ৪৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। নির্বাচনের দিন সকালের দিকে কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম থাকলেও দুপুরের পর তা বৃদ্ধি পায়।
আসনভিত্তিক নির্বাচনের ফলাফল
গোপালগঞ্জ-০১: এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৫১০ জন (পুরুষ ২,০২,৮২১ ও নারী ১,৯৬,৬৮৯)। মোট ১৩৮টি কেন্দ্রের ফলাফলে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সেলিমুজ্জামান মোল্যা ৭১ হাজার ৫৭৯ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. কাবির মিয়া পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৪৬৪ ভোট। এ আসনে ভোট পড়ার হার ৪৯.৬৭ শতাংশ। বৈধ ভোট ১ লাখ ৯১ হাজার ৯৭৯টি এবং বাতিল হয়েছে ৬ হাজার ৪৬৮টি ভোট।
গোপালগঞ্জ-০২: এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৩২৪ জন। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ডা. কে এম বাবর ৪০ হাজার ৪৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এইচ খান মঞ্জু পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৩৯ ভোট। এছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের শুয়াইব ইবরাহীম ২৮ হাজার ৬০৪ ভোট, স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুজ্জামান ভূঁইয়া ২৭ হাজার ৮৯১ ভোট এবং গণফোরামের বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ মফিজ মাত্র ২১৫ ভোট পেয়েছেন। এ আসনে ভোট পড়েছে ৩৯.৮৩ শতাংশ।
গোপালগঞ্জ-০৩: এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৮৪ জন। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এস এম জিলানী ৬০ হাজার ৯৯১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক পেয়েছেন ৩৪ হাজার ৩৩৯ ভোট। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আঃ আজিজ ২৫ হাজার ১৫৩ ভোট এবং গণফোরামের দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস মাত্র ২৬৯ ভোট পেয়েছেন। এ আসনে প্রদত্ত ভোটের হার ৪৪.২০ শতাংশ।
গণভোটে ‘না’ ভোটের জয়জয়কার সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে গোপালগঞ্জের ভোটাররা ‘না’ ভোটের পক্ষে রায় দিয়েছেন। জেলায় মোট ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৫১৬টি, অন্যদিকে ‘না’ ভোট পড়েছে ৩ লাখ ২৮ হাজার ৯৫৬টি।
গোপালগঞ্জ-০১: ‘না’ ভোট ১ লাখ ২৮ হাজার ২৯৮টি, ‘হ্যাঁ’ ভোট ৫৪ হাজার ৭১৬টি।
গোপালগঞ্জ-০২: ‘না’ ভোট ১ লাখ ৭ হাজার ২৯০টি, ‘হ্যাঁ’ ভোট ৩৪ হাজার ৩০২টি।
গোপালগঞ্জ-০৩: ‘না’ ভোট ৯২ হাজার ৯৭৮টি, ‘হ্যাঁ’ ভোট ৩৪ হাজার।
ভোটারদের মতে, গণভোটের পরিবর্তনের যেসব কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, তার সাথে বাস্তবতার মিল না পাওয়ায় তারা ‘না’ ভোটের পক্ষে রায় দিয়েছেন।
কেন এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন? সাধারণ ভোটার ও বিশ্লেষকদের মতে, এই ঐতিহাসিক জয়ের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে: ১. মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষা: গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মভূমি। ভোটাররা মনে করেছেন, জামায়াত ও তাদের জোট শরিকদের মতো মৌলবাদী শক্তিকে ঠেকাতে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অক্ষুণ্ন রাখতে বিএনপিকে ভোট দেওয়া প্রয়োজন। ২. নিরাপত্তা ও হয়রানি রোধ: ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তন এবং ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই এনসিপির সমাবেশের প্রেক্ষাপটে ভোটাররা কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের নির্দোষ নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলা ও হয়রানি থেকে মুক্ত করবে। ৩. সংখ্যালঘুদের আস্থা: সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং নারী ভোটাররা মনে করেছেন, ইসলামী দলগুলো ক্ষমতায় গেলে তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে। তাই তারা বিএনপিকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ৪. স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ব্যর্থতা: একাধিক বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকলেও তারা ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পারেননি, যার সুবিধা পেয়েছেন বিএনপি প্রার্থীরা।
সুশীল সমাজের প্রতিক্রিয়া সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর গোপালগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি রবীন্দ্র নাথ অধিকারী বলেন, “জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য ইসলামী শক্তিকে ঠেকাতে গোপালগঞ্জের ভোটাররা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দল হিসেবে বিএনপিকে বেছে নিয়েছেন। এছাড়া হামলা ও মিথ্যা মামলা থেকে রেহাই পেতে এবং পরিবার নিয়ে নিরাপদে থাকার আশায় আওয়ামী ভোটাররাও বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন। নারী ভোটাররাও তাদের অধিকার সুরক্ষার কথা চিন্তা করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”
সরকারি ঘোষণা জেলা রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করেন। তিনি জানান, জেলার তিনটি আসনেই নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
১১৮ বার পড়া হয়েছে