নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ: বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনর্গঠনের পথ কঠিন
বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২:৩৭ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচন—এই ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহে দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে এসব বিষয় বিশ্লেষণ করেছেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এবং দ্য ইকোনমিস্ট-এর সাবেক বাংলাদেশ প্রতিনিধি টম ফেলিক্স জোয়েঙ্ক।
নিবন্ধে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অর্থনৈতিকভাবে হতাশ তরুণদের নেতৃত্বে গণবিক্ষোভের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে। এতে এক দশকের বেশি সময় ধরে সংকুচিত রাজনৈতিক পরিসর ও ভয়ভীতিনির্ভর শাসনের অবসান হলেও গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের যে উচ্চ প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে এসেছে।
লেখকদের মতে, শেখ হাসিনার পতনের পর দেশজুড়ে সহিংসতা, প্রশাসনিক অচলাবস্থা, শিল্প ও আমলাতান্ত্রিক ধর্মঘট এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এতে একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে এসেছে—গণতন্ত্র টিকে থাকতে যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজন, সেগুলো যদি ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণ টেকসই হয় না। বাংলাদেশকে এই বাস্তবতার একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
নিবন্ধে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, নব্বইয়ের দশক থেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও একসময় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার হাতবদল সম্ভব হয়েছিল। তবে ২০১১ সালে এই ব্যবস্থা বাতিলের পর নির্বাচনী অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের অভিযোগ বাড়তে থাকে।
এবারের নির্বাচনে নতুন প্রজন্মের ভোটারদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। মোট ভোটারের প্রায় ৪৩ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। জরিপে দেখা গেছে, তারা দলীয় দ্বন্দ্বের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
নিবন্ধে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করা হয়। নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদ দায়িত্ব নেওয়ার পর শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট ও প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পূর্ণ সমর্থন না থাকায় পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, ভোট কেনার অভিযোগ, নানা অনিয়ম এবং আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার কারণে ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
নিবন্ধে ইসলামপন্থী দলগুলোর উত্থানকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চিত উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে তারা সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে প্রথমবার ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের সমর্থন করতে আগ্রহী—এমন জরিপের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের উদ্যোগ হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের রায় এবং নতুন জাতীয় সনদ নিয়ে গণভোটের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সাংবিধানিক সংশোধন ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সহযোগিতা প্রয়োজন, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে কঠিন বলে মনে করছেন লেখকরা।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। অভ্যুত্থানের পর অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে এবং বৈশ্বিক সুরক্ষাবাদ, সরবরাহ শৃঙ্খলের ভাঙন ও জলবায়ু সংকট নতুন নেতৃত্বের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
নিবন্ধে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের বিষয়টিও উঠে এসেছে। শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়া, সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ এবং ভিসা ও বাণিজ্যসংক্রান্ত জটিলতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাব ফেলছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবশেষে লেখকরা মনে করেন, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা শুধু দেশটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক উত্তরণের একটি শিক্ষা। স্বৈরশাসন উৎখাত করা সম্ভব হলেও, সেই শাসনের ফলে দুর্বল হয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন করাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ।
১২১ বার পড়া হয়েছে