রাজশাহী-১ আসনে ত্রিমুখী সমীকরণ, ‘ভোট ব্যাংক’ নিয়েই হিসাব-নিকাশ
বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১১:৩৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
রাজশাহী-১ (তানোর–গোদাগাড়ী) সংসদীয় আসনে নির্বাচন ঘিরে ক্রমেই উত্তাপ বাড়ছে। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে, আর দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক এবার কার দিকে যাবে—সেই প্রশ্নেই ঘুরছে আলোচনার কেন্দ্র।
চায়ের দোকান থেকে শুরু করে গ্রামের হাট-বাজার—সবখানেই চলছে ভোটের হিসাব। বিএনপির এক কর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকা অনেক নেতাকর্মীকে এখন বিএনপির মিছিলে দেখা যাচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, দলের শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের ভোট পেলে জয় সহজ হবে। তবে এতে ত্যাগী কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
ওই কর্মীর অভিযোগ, গত ১৬–১৭ বছরে বিএনপির ওপর চালানো নির্যাতনের রেশ এখনো কাটেনি। এর পাশাপাশি গত দেড় বছরে বিএনপির বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ ভোটারদের একটি অংশ জামায়াতের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তানোর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আখেরুজ্জামান হান্নান দাবি করেন, আওয়ামী লীগের অন্তত ৮০ শতাংশ ভোট বিএনপি পাবে। তাঁর মতে, সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভোটও এবার বিএনপির দিকেই যাবে, ফলে আসনটিতে বিএনপি বড় ব্যবধানে জিতবে।
২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাজশাহী-১ আসনটি ছিল আওয়ামী লীগের দখলে। প্রায় ৭০ হাজার সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভোটার থাকায় এটি দীর্ঘদিন ‘আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক’ হিসেবে পরিচিত। তবে এবারের নির্বাচনে সেই সমীকরণ বদলাতে পারে বলে স্থানীয়দের ধারণা।
এ আসনে চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূল লড়াই বিএনপির মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন ও জামায়াতের অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের মধ্যে। শরীফ উদ্দীন একসময় বিএনপির চেয়ারপারসনের সামরিক উপদেষ্টা ছিলেন। অন্যদিকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান ১৯৮৬ সালে একবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
উল্লেখ্য, ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত এই আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন শরীফ উদ্দীনের বড় ভাই আমিনুল হক। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ওমর ফারুক চৌধুরী পেয়েছিলেন ১ লাখ ৪৩ হাজার ৭৮৬ ভোট, আর বিএনপির এম এনামুল হক পেয়েছিলেন ১ লাখ ২৯ হাজার ৪৫০ ভোট।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যেও ভোটের সমীকরণ বদলের ইঙ্গিত মিলছে। তানোর উপজেলার হিন্দু–বৌদ্ধ–খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাবেক সভাপতি দেবানন্দ বর্মন এবং দশরথ দাস প্রকাশ্যে জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নিয়েছেন।
তবে গ্রামীণ অনেক ভোটার এখনো দ্বিধায়। পাঁঠাকাটা মোড়ের কর্মকার সম্প্রদায়ের এক নারী জানান, ভোট দেওয়ার পর পরাজিত পক্ষের অভিযোগের আশঙ্কায় তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
গোদাগাড়ী উপজেলার এক আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা হয়েছে, যার পেছনে বিএনপি নেতাদের হাত রয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। এই ক্ষোভ থেকেই আওয়ামী লীগের কিছু কর্মী জামায়াতকে ভোট দিতে পারেন বলেও তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে, গোদাগাড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুস সালামের দাবি, আওয়ামী লীগের ভোটাররা কেন্দ্রে গেলে বিএনপিকেই ভোট দেবেন। তাঁর ভাষ্য, ২০০৮ সালে কারচুপির মাধ্যমে বিএনপির ভোট কমানো হয়েছিল, এবার সেই ভোটেই জয় আসবে।
জামায়াতের গোদাগাড়ী উপজেলা আমির নুমাউন আলী বলেন, তাঁদের দল কারও বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করে না। নির্বাচন জিতুক বা হারুক, কারও ক্ষতি করা হবে না—এমন আশ্বাস দিয়ে তিনি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সব মিলিয়ে, রাজশাহী-১ আসনে এবার ভোটের ফল নির্ধারণে আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংকই হয়ে উঠতে পারে চূড়ান্ত ফ্যাক্টর।
২২৪ বার পড়া হয়েছে