জামায়াত আমীরের হুমকিমূলক ভাষণ বনাম নরম সুরের বিএনপি চেয়ারম্যান
রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২:১৯ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনীতিতে উত্তেজনার পারদ যখন ক্রমেই চড়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময় নির্বাচনী জনসভায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–এর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের ধারাবাহিক হুমকিমূলক বক্তব্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিভিন্ন সমাবেশে তিনি “বেয়াদবি করলে আগুনের ফুলকি দেখানো হবে”, “হাত ভেঙে ফেলা হবে”, “ছেড়ে দেওয়া হবে না, সমুচিত জবাব দেওয়া হবে” ধরনের উগ্র শব্দচয়ন ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের প্রতি পাল্টা সহিংসতার বার্তা দিচ্ছেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। এতে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, নির্বাচনকে ঘিরে কিংবা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর সহিংস সংঘাতের মাত্রা বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের অতীত রাজনৈতিক ইতিহাস, ৭১–এর ভূমিকা, বিভিন্ন সময়ে সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং ক্যাডারনির্ভর সাংগঠনিক কাঠামোর প্রেক্ষাপটে আমীরের এ ধরনের হুমকিমূলক ভাষা কেবল তাৎক্ষণিক উসকানি নয়, বরং ভবিষ্যতে সহিংস আচরণ বৈধতা পাওয়ার এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ভূমি তৈরি করছে। একদিকে জনসমাবেশে তিনি “মা–বোনদের গায়ে হাত তুললে আমরা বসে থাকব না” বলে নারীর নিরাপত্তা রক্ষার নৈতিক উচ্চভূমির দাবি তুলছেন, অন্যদিকে মাঠের রাজনীতিতে জামায়াত–সম্পৃক্ত কর্মীদের বিরুদ্ধেই নারী প্রার্থীর মেয়ের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠায় দ্বিচারিতার প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। এতে সাধারণ ভোটারদের একাংশের মধ্যে এই ইসলামপন্থী দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও ‘ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র’ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে।
এর বিপরীতে বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান সাম্প্রতিক নির্বাচনী সমাবেশগুলোতে তুলনামূলক সংযত ভাষা ব্যবহার করছেন বলে পর্যবেক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি তার বক্তৃতায় মূলত নীতি, পরিকল্পনা, গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার কথা তুলে ধরছেন; কর্মী–সমর্থকদের উদ্দেশে ভোটের দিন ভোর থেকে কেন্দ্রে উপস্থিত থাকা, ফজরের নামাজের পর লাইনে দাঁড়ানো এবং ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্র ও ব্যালটবক্স পাহারা দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। তার ভাষণে “ভোট পাহারা” এবং “ষড়যন্ত্র মোকাবিলা”র মতো উত্তেজনামূলক ইঙ্গিত থাকলেও সরাসরি প্রতিপক্ষকে আক্রমণের হুমকি বা শারীরিক সহিংসতার ডাক এখনও শোনা যায়নি, যা আন্তর্জাতিক মহল ও নিরপেক্ষ ভোটারের কাছে তুলনামূলক ইতিবাচক বার্তা বহন করছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
এই দুই ধরনের ভাষার ফারাককে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। এক পক্ষের উন্মুক্ত হুমকিমূলক বক্তৃতা নির্বাচনী মাঠে প্রতিশোধ ও পাল্টা সহিংসতার সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক করতে পারে; অন্য পক্ষ একই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে “ভোট পাহারা”র নামে সংগঠিত প্রতিরোধের ডাক দিচ্ছে, যা আবার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন ধরনের চাপ তৈরি করছে। ইতোমধ্যে দেশের বিগত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে সহিংসতায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে চলতি নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর এই উদ্দীপক ভাষাব্যবহার নিয়ে উদ্বিগ্ন সাধারণ ভোটার ও নাগরিক সমাজ। তাদের আশঙ্কা, দলগুলো মুখে গণতন্ত্র ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের কথা বললেও মাঠের ভাষা ও আচরণ যদি এভাবেই থেকে যায়, তাহলে নির্বাচনী সহিংসতা ঠেকানো কঠিন হবে এবং তার খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
১২৫ বার পড়া হয়েছে