কুমারখালীতে রেলের জলাশয় ভরাট ও ভবন নির্মাণ বন্ধ করল প্রশাসন
বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:৩১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে বাংলাদেশ রেলওয়ের মালিকানাধীন একটি জলাশয় ভরাট করে ভবন নির্মাণের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
জমির শ্রেণী পরিবর্তন ও নির্মাণসংক্রান্ত কোনো বৈধ কাগজপত্র না থাকায় এই ব্যবস্থা নিয়েছেন।
জানা গেছে, পৌরসভার বাটিকামারা– তেবাড়িয়া রেলগেট এলাকায় কুমারখালী সরকারি কলেজের সামনে অবস্থিত রেলওয়ের জলাশয়টি প্রায় দুই বছর ধরে দখল ও ভরাটের কার্যক্রম চললেও এতদিনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
একাধিক বিশ্বস্থ সূত্র জানান, ২০২৪ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীদের সহায়তায় কুমারখালী সরকারী কলেজের সামনের বিশাল জলাশয়ের পূর্বাংশের প্রায় ২০ শতাংশ জমি ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু করেন বাটিকামারা গ্রামের জাহিদ হোসেন। তিনি তরুণমোড় এলাকার মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা দীন মোহাম্মদ বিশ্বাসের ছেলে।
এদিকে রেলের জলাশয় অবৈধভাবে ভরাট ও পাকা ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কোন প্রকার ব্যবস্থা নিয়েছেন কি-না তা জানতে এই রিপোর্ট তৈরি পর্যন্ত (বিকাল) রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফারজানা আখতার বলেন, রেলের জলাশয় ভরাট ও ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধ রেখে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে সহকারী কমিশনারের (ভুমি) কার্যালয়ে আসতে বলা হয়েছে।
সহকারী কমিশনার (ভুমি) নাভিদ সারোয়ার বলেন, উনি শুধুমাত্র ওই জমি লিজ নেওয়ার কাগজ নিয়ে এসেছিলেন। তার কাছে জমির শ্রেণি পরিবর্তনের বৈধ কোন কাগজপত্র নেই। বিধায় তাকে বলে দেওয়া হয়েছে ওই জমিতে আর কোন প্রকার নির্মাণ কাজ তিনি করতে পারবেন না।
ওই এলাকার বাসিন্দারা জানান, এই জমিত দীর্ঘদিন যাবৎ কলেজের দখলে ছিল। ২০২৪ সালে প্রথমে বালু দিয়ে জলাশয় ভরাট করে টিনের ঘেরা দিয়ে টিনের ঘর নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে সেখানে সুকৌশলে পাকা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। এতে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে ট্রাকভর্তি বালু এনে সরকারি জলাশয় ভরাট করা হলেও রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় ভূসম্পত্তি বিভাগ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। একাধিকবার গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নীরবতায় দখলদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
উল্লেখ্য, কুমারখালী সরকারি কলেজ সূত্রে জানা গেছে, কুমারখালী রেলস্টেশনের পূর্ব প্রান্ত থেকে বাটিকামারা রেলগেট পর্যন্ত রেলওয়ের প্রায় ৩৪ শতাংশ অকৃষি (জলাশয়), ২৯ শতাংশ কৃষি এবং প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুট বাণিজ্যিক জমি রয়েছে। এসব জমি ১৯৯৬ সাল থেকে কুমারখালী সরকারি কলেজের ইজারা ও দখলে রয়েছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রতিবছর নিয়মিতভাবে প্রায় এক লাখ টাকা খাজনা পরিশোধ করে আসছে।
গত রোববার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, জলাশয়ের একটি অংশ বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। ভরাটকৃত জমির চারদিকে টিনের বেড়া দেওয়া হয়েছে। ভেতরে একাধিক টিনের ঘর নির্মাণের পাশাপাশি পাকা ভবনের ফাউন্ডেশনের নির্মান কাজ করছিল কয়েকজন শ্রমিক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক জানান, দুইতলা ভবনের ফাউন্ডেশন দিয়ে নির্মাণকাজ করা হচ্ছে। তবে সরকারি জমি হওয়ায় পাকা ছাদ দেওয়া হবে না।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কুমারখালী সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ বিনয় কুমার সরকার বলেন, রেলস্টেশনের পূর্ব প্রান্ত থেকে বাটিকামারা রেলগেট পর্যন্ত কৃষি ও অকৃষি জমি কলেজের ইজারা ও দখলে ছিল। কিন্তু প্রভাবশালীরা ২০২৪ সাল থেকে জলাশয়ের একটি অংশ দখল করে ভরাট ও স্থাপনা নির্মাণ শুরু করেছে।
কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহা. মামুনুর রশীদ সিদ্দকী বলেন, নিয়ম অনুযায়ী কলেজ প্রতিবছর প্রায় এক লাখ টাকা ইজারা পরিশোধ করছে। জমি উদ্ধারের বিষয়ে সম্প্রতি পাকশীর রেল কর্তৃপক্ষকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। দ্রুত লিখিতভাবে জানানো হবে।
উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, শহর এলাকায় একের পর এক পুকুর, ডোবা ও জলাশয় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এমনকি সরকারি জলাশয়ও ব্যক্তিস্বার্থে দখল করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
অভিযুক্ত জাহিদ হোসেন ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। তবে তিনি দাবি করেন, কোনো অনিয়ম হয়নি এবং নিয়ম মেনেই স্কুলের জন্য ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কোনো বৈধ কাগজপত্র তিনি দেখাতে রাজী হননি।
গত রোববার রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম রেলের জলাশয় ভরাট ও স্থাপনা নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন। খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, এখনো পর্যন্ত রেল কর্তৃপক্ষ কোন প্রকার ব্যবস্থা নেননি।
১৩০ বার পড়া হয়েছে