ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’: ফিলিস্তিনি স্বার্থ নয়, ইসরায়েলি নিরাপত্তার নতুন ছক?
মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬ ৫:১৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
গাজায় ট্রাম্পের ঘোষিত ‘বোর্ড অব পিস’ কার্যকরভাবে ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ রক্ষা করবে, নাকি ইসরায়েল ও পশ্চিমা শক্তির নিরাপত্তা–অর্থনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের নতুন প্ল্যাটফর্ম হবে—এ প্রশ্ন এখনই তীব্রভাবে উঠতে শুরু করেছে।
বর্তমান কাঠামো, নেতৃত্ব ও অর্থায়নের শর্ত বিশ্লেষণ করলে বোর্ডটি মূলত শক্তিধর দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি ভূরাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা কমিটি হিসেবে দাঁড়িয়ে যেতে পারে, যেখানে ফিলিস্তিনি জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক ইচ্ছা ও অধিকার তুলনামূলকভাবে প্রান্তিক থেকে যাবে।
প্রথমত, এই বোর্ডের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থাকছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে এবং এর নির্বাহী নেতৃত্বে রয়েছেন মূলত মার্কিন ও পশ্চিমা রাজনৈতিক–অর্থনৈতিক অভিজাতরা। মার্কো রুবিও, টনি ব্লেয়ার, জ্যারেড কুশনার, বড় বিনিয়োগ ও আর্থিক খাতের ব্যক্তিত্বদের প্রাধান্য বোর্ডের সিদ্ধান্তকে স্বাভাবিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ স্বার্থের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এই কাঠামোতে কোনো নির্বাচিত ফিলিস্তিনি প্রতিনিধি বা গাজার রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে কেন্দ্রীয় জায়গা দেওয়া হয়নি; বরং ফিলিস্তিনি পক্ষকে টেকনোক্র্যাটিক, প্রশাসনিক স্তরে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা স্পষ্ট।
দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা ব্যবস্থার নকশায় ইসরায়েলি স্বার্থের প্রভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। গাজায় মোতায়েনের জন্য যে আন্তর্জাতিক ‘স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স’ গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তার কমান্ডার হবেন সাবেক মার্কিন জেনারেল; একই সঙ্গে গাজার প্রশাসনিক কমিটির সদস্য বাছাই পর্যন্ত ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের ‘ভেটিং’ ক্ষমতার কথা উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। অর্থাৎ, কারা গাজায় প্রশাসনে থাকবে, তারা কতটা আপোষহীনভাবে দখলবিরোধী অবস্থান নিতে পারবে, সেটাও বাস্তবে ইসরায়েলি নিরাপত্তা মানদণ্ড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। এতে ফিলিস্তিনি রাজনীতির স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক বিকাশের ওপর চাপ বাড়বে, আর গাজা কার্যত এক ধরনের উচ্চপর্যায়ের তত্ত্বাবধানে থাকা নিরাপত্তা–এনক্লেভে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
তৃতীয়ত, বোর্ডে স্থায়ী সদস্যপদ পেতে ১ বিলিয়ন ডলার অবদান রাখার শর্ত গাজা পুনর্গঠনকে এক ধরনের ‘পে-টু-প্লে’ ক্লাবে রূপ দিচ্ছে। যে দেশগুলো এই বিপুল অঙ্কের অর্থ দিতে পারবে, তারাই বোর্ডে স্থায়ী আসন, ভোটাধিকার ও সিদ্ধান্তের ওপর বেশি প্রভাব পাবে। এতে গাজার জনগণের প্রকৃত প্রয়োজনের চেয়ে বিনিয়োগের নিরাপত্তা, কনসেশন, অবকাঠামো–কন্ট্রাক্ট এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে দরকষাকষি বেশি প্রাধান্য পেতে পারে। দুর্বল অর্থনীতির দেশ বা ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিন–পন্থি কিন্তু আর্থিকভাবে সীমিত রাষ্ট্রগুলো এখানে প্রান্তিক থেকে যাবে—অথচ তাদের কণ্ঠস্বর ফিলিস্তিনি স্বার্থের কাছাকাছি থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
চতুর্থত, ‘বোর্ড অব পিস’ কাঠামোটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে আংশিকভাবে বাইপাস করে গাজা–ইস্যুতে একটি বিকল্প শক্তিধর প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এতে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্ররা প্রক্রিয়াগত ভেটো ও আন্তর্জাতিক আইন–ভিত্তিক আলোচনার বাইরে একটি ‘কাস্টমাইজড’ শান্তি মডেল দাঁড় করাতে পারবে; অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিদের জাতিসংঘ স্বীকৃত অধিকারের প্রশ্ন (দখলদারির অবসান, স্বরাষ্ট্র নির্ধারণের অধিকার, প্রত্যাবাসন) প্রান্তিক হয়ে যেতে পারে। গাজা কেন্দ্রীক এই ব্যবস্থাপনা কেবল নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও পুনর্গঠনের টেকনিক্যাল প্রজেক্টে আটকে থাকলে রাজনৈতিক ন্যায়বিচার প্রশ্নটি দুর্বল হয়ে পড়বে।
সূত্রগুলো বলছে, বোর্ড অব পিসের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক হবে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে, এই জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে। দাভোসের সাইডলাইনে আয়োজিত ওই বৈঠকেই বোর্ডের কাঠামো, এখতিয়ার ও সদস্যদেশগুলোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।
ইতোমধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া, বেলারুশ, থাইল্যান্ড, ইসরায়েল, কানাডা, তুরস্ক, মিসর, জর্ডান, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা ও হাঙ্গেরিসহ প্রায় ৬০টি দেশকে বোর্ডে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পাঠিয়েছে। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ভারত, ব্রাজিলসহ আরও কয়েকটি দেশকেও অংশগ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হলেও সবাই এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।
এই সব কারণে বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ বলছেন, বর্তমান নকশা অনুযায়ী বোর্ড অব পিস থেকে কিছু নির্দিষ্ট বাস্তব কাজ—যেমন ধ্বংসস্তূপ সরানো, অবকাঠামো পুনর্গঠন, সীমিত নিরাপত্তা স্থিতিশীলতা—এগোলেও, এটি ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক ন্যায়বিচার বা সার্বভৌম অধিকারের দিক থেকে খুব বেশি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা এখনই স্পষ্ট নয়। বরং পুরো কাঠামোটাই ইসরায়েলি নিরাপত্তা, পশ্চিমা বিনিয়োগ ও মার্কিন কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর এক নতুন হাতিয়ার হয়ে ওঠার ঝুঁকি বহন করছে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক
১১২ বার পড়া হয়েছে