রেলের জলাশয় ভরাটের পর চলছে ভবন নির্মাণ কাজ, নিরব কর্তৃপক্ষ
সোমবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে রেলের জলাশয় দখল বন্ধে গেল দুই বছরেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কর্তৃপক্ষ। ফলে প্রথমে বালু দিয়ে ভরাট করে টিনের ঘর নির্মাণের পর এখন পাকা স্থাপনা তৈরির কাজও শুরু করেছে দখলদার।
চারিদিকে টিন দিয়ে ঘিরে ভিতরে তড়িঘড়ি পাকা ভবন নির্মাণ করে এভাবে দখলদারিত্বের কাজ চলছে পৌরসভার বাটিকামারা-তেবাড়িয়া রেলগেট এলাকায়। অথচ কয়েক বছর ধরে ভরাট ও ঘর নির্মাণের বিষয়টি রেল কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা।
বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশ হয়েছে। তবুও টনক নড়েনি পাকশী রেলওয়ের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তাদের। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয়রা বলছেন, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া প্রকাশ্যে গাড়িভর্তি বালু এনে সরকারি জলাশয়টি ভরাট করা হয়েছে। টিনের ঘর নির্মাণের পর পাকা ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। তবে রেলের সংশ্লিষ্ট দপ্তর নিরব রয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
কুমারখালী সরকারি কলেজ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুমারখালী রেলস্টেশনের পূর্বপ্রান্ত থেকে বাটিকামারা রেলগেট পর্যন্ত এক এক ৩৪ শতাংশ অকৃষি (জলাশয়), ২৯ শতাংশ কৃষি এবং ৩১ হাজার বর্গফুট বাণিজ্যিক রেলের জায়গা রয়েছে। যা ১৯৯৬ সাল থেকে কুমারখালী সরকারি কলেজের ইজারায় ও দখলে ছিল। কলেজ কর্তৃপক্ষ বর্তমানে প্রতিবছরে প্রায় এক লাখ টাকা খাজনা পরিশোধ করেছেন। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় ২০২৪ সালে কলেজের সামনে অবস্থিত জলাশয়ের পূর্ব দিকে প্রায় ২০ শতাংশ জমি ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু করে বাটিকামারা গ্রামের জাহিদ হোসেন। তিনি তরুনমোড় এলাকার মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা দীন মুহম্মদ বিশ্বাসের ছেলে।
বিষয়টি স্থানীয়রা রেল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিল এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক সংবাদও প্রকাশিত হয়। তবুও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। ফলে বর্তমানে নির্বিঘ্নে পাকা ভবন নির্মাণের কাজ চলছে।
রোববার (১৮ জানুয়ারি) দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, কুমারখালী সরকারি কলেজ ও রেলপথের মাঝে বড় আকারের জলাশয় রয়েছে। জলাশয়ের পূর্বপাশে ভরাট করা হয়েছে। ভরাটকৃত জায়গার চারিদিকে টিনের বেড়া দেওয়া। ভিতরে কয়েকটি টিনের ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। কয়েকজন শ্রমিক পাকা ভবন নির্মাণের কাজ করছেন।
এ সময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক বলেন, দুইতলা ফাউন্ডেশন দিয়ে ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। কিন্তু সরকারি জমি হওয়ায় পাকা ছাদ হবে না। কাঠের ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে জাহিদুলের সঙ্গে কথা বলুন।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কুমারখালী সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ বিনয় কুমার সরকার বলেন, রেলস্টেশনের পূর্বপ্রান্ত থেকে বাটিকামারা রেলগেট পর্যন্ত কৃষি ও অকৃষি পুরো জমি কলেজের নামে লিজ নেওয়া ও দখলে ছিল। কিন্তু প্রভাবশালীরা ২০২৪ সাল থেকে জলাশয়ের একটি অংশ দখল করে প্রথমে ভরাট করে। এখন পাকা ভবন নির্মাণের কাজ চলছে।
কুমারখালী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহা. মামুনুর রশীদ সিদ্দকী বলেন, নিয়ম অনুযায়ী বর্তমানে প্রতিবছরে প্রায় এক লাখ টাকা ইজারা পরিশোধ করছে কলেজ। আগের সরকারের সময় প্রভাবশালীরা জবর দখল করেছে কিছু জমি। তা উদ্ধারের জন্য গেল সপ্তাহে পাকশীর রেল কর্তৃপক্ষকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। খুব দ্রুতই লিখিতভাবে জানানো হবে।
স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সদস্য বলেন, একে একে পুকুর, ডোবা ও জলাশয় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে সরকারি জলাশয়ও ব্যক্তিস্বার্থে ভরাট করা হচ্ছে। বিষয়টি দুঃখজনক। বিষয়টি একাধিকবার রেল কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। তবুও কর্তৃপক্ষের ঘুম ভাঙেনি।
অবিলম্বে পাকা ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে স্থানীয়রা বলছেন, রেলওয়ের মূল্যবান জলাশয়টি অবৈধভাবে ভরাট ও স্থাপনাদি নির্মাণের সঙ্গে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ থাকতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত জাহিদ হোসেন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। অন্যদের মতো তিনিও নিয়ম মেনে রেলের জলাশয় ভরাটের পর স্কুলের জন্য পাকা ঘর নির্মাণ করছেন। কিন্তু তিনি কোনো কাগজপত্রাদি দেখাতে রাজি হননি।
রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম ফোনে বলেন, রেলের জলাশয় ভরাট ও স্থাপনাদি নির্মাণের সুযোগ নেই। খোঁজখবর নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুই বছরেও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, সম্প্রতি তিনি যোগদান করেছেন। কেউ অভিযোগ করেনি।
১১৯ বার পড়া হয়েছে