আদালতের অভিযানের পরেও সচল অবৈধ ইটভাটা, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
রবিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ৭:১৪ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
মানিকগঞ্জে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না থাকায় ভ্রাম্যমান আদালত দুটি ইটভাটার চিমনি গুড়িয়ে দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেও মাত্র দশ দিনের ব্যবধানে পুনরায় সচল হয়েছে সেই অবৈধ ভাটাগুলো। প্রশাসনের এমন নিরব ভূমিকা নিয়ে জেলার সচেতন মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অভিযানের ধ্বংসস্তূপ থেকেই ভাটা মালিকপক্ষ অজ্ঞাত শক্তির সহায়তায় মাত্র দুই দিনের মধ্যেই নতুন করে চিমনি নির্মাণের কাজ শুরু করে। আর দশ দিনের মাথায় পুরোদমে ইট পোড়ানোর কার্যক্রম চালু করা হয়। নতুন নির্মিত চিমনি দিয়ে প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সগৌরবে উড়ছে বিষাক্ত কালো ধোঁয়া।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া ও সদর উপজেলায় অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন, ২০১৯ এবং বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০)-এর বিভিন্ন ধারা লঙ্ঘনের দায়ে এই অভিযান পরিচালিত হয়।
অভিযানে সদর উপজেলার মেসার্স নূর ব্রিক্স, মেসার্স আহাদ ব্রিক্স-২ এবং মেসার্স হিরো এন্টারপ্রাইজ-এই তিনটি ভাটাকে ছয় লাখ টাকা করে মোট ১৮ লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের সদর দপ্তরের ভ্রাম্যমান আদালতের বিচারক ফয়জুন্নেছা আক্তার। একই সঙ্গে বিগত বছরগুলোতে একাধিকবার অর্থদণ্ডপ্রাপ্ত মেসার্স ফৌজিয়া ব্রিক্স ও মেসার্স হাজী ব্রিক্সের চিমনি গুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং তাদের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।
তবে চিমনি গুড়িয়ে দেওয়ার মাত্র দুই দিনের মধ্যেই ওই দুটি ভাটার মালিকপক্ষ নতুন করে চিমনি নির্মাণ শুরু করে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমান আদালতের রায়কে উপেক্ষা করে দশ দিনের মধ্যেই চিমনি পুনঃস্থাপন শেষে আবারও ইট পোড়ানোর কাজ শুরু হয়। স্থানীয় প্রশাসনের অগোচরে নাকি সবকিছু ‘ম্যানেজ’ করেই অবৈধ ভাটাগুলো চালু রয়েছে-এমন প্রশ্ন তুলেছেন জেলার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। গুড়িয়ে দেওয়া চিমনি পুনরায় স্থাপনের দায়ে মেসার্স ফৌজিয়া ব্রিক্স ও মেসার্স হাজী ব্রিক্সকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশ পাওয়ার সাত কর্মদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ভাটাগুলোকে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
সদর উপজেলার ভগবানপুর গ্রামের বাসিন্দা তারু মিয়া বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ইটভাটার কারণে তারা চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। জমিতে ভালো ফসল হয় না, বাড়ির ফলজ গাছেও ফল ধরে না। ভাটা ভাঙার পর তারা স্বস্তি পেলেও পুনরায় চিমনি নির্মাণে হতাশ হয়েছেন। তার ভাষায়, 'টাকা থাকলে অবৈধও বৈধ হয়ে যায়।'
কামতা ও গোলড়া এলাকার একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, মেসার্স ফৌজিয়া ব্রিক্সের মালিক অত্যন্ত ক্ষমতাধর হওয়ায় ভাটা গুড়িয়ে দেওয়ার পরও প্রকাশ্যে চিমনি পুনঃস্থাপন করেছেন। দিনের বেলায় চিমনি বন্ধ রেখে সন্ধ্যার পর থেকে ইট পোড়ানোর কাজ চালানো হচ্ছে। তারা বলেন, 'এ যেন চোর-পুলিশ খেলা। টাকা আর ক্ষমতা থাকলে সবই বৈধ হয়। এসব কারণে প্রশাসনিক দপ্তরগুলো সাধারণ মানুষের কাছে দুর্নীতির আতুরঘর বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।'
মেসার্স হাজী ব্রিক্স কর্তৃপক্ষ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে রাজি না হওয়ায় তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে মেসার্স ফৌজিয়া ব্রিক্সের ম্যানেজার রেজাউল মিয়া জানান, প্রশাসন চিমনি গুড়িয়ে দিলেও পরে তা পুনরায় স্থাপন করা হয়। কয়েকদিন যে ধোঁয়া দেখা গেছে তা পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হয়েছিল এবং কোম্পানির নির্দেশনায় বর্তমানে চিমনি বন্ধ রাখা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। পরিবেশ অধিদপ্তরের কারণ দর্শানোর নোটিশ পেয়েছেন কিনা-এ প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে ব্যস্ততার অজুহাত দেখান তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অবৈধ ভাটার একাধিক কর্মচারী জানান, হঠাৎ করেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ম্যাজিস্ট্রেট এসে চিমনি গুড়িয়ে দেন। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে প্রস্তুত করা কাঁচা ইট পোড়ানো না গেলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে। তাই যে কোনো মূল্যে লোকসান এড়াতে নতুন করে চিমনি নির্মাণ করে ইট পোড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। আইন কী বলে, তা ভাবার সময় নেই বলেও মন্তব্য করেন তারা।
পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক)-এর আঞ্চলিক সমন্বয়ক বিমল রায় বলেন, ইট তৈরির জন্য কৃষিজমির উর্বর টপসয়েল তুলে নেওয়ায় ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভাটার আশপাশের এলাকায় ফলজ গাছে কালো ধোঁয়ার আস্তরণ পড়ে, যার ফলে নারিকেল, আম ও লিচুর ফলন কমে যায় এবং একসময় গাছ মারা যায়। কয়লা ও কাঠ পোড়ানোর ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। চিমনি থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড ও পার্টিকুলেট ম্যাটার মানুষের শরীরে প্রবেশ করে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও ক্যানসারের মতো রোগ সৃষ্টি করে, যা শিশু ও বয়স্কদের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
মানিকগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল-মামুন জানান, ইট পোড়ানোর মৌসুম হওয়ায় অবৈধ ভাটার বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর সদর ও সাটুরিয়া উপজেলায় অভিযান চালিয়ে তিনটি ভাটাকে মোট ১৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং মেসার্স হাজী ব্রিক্স ও মেসার্স ফৌজিয়া ব্রিক্সের চিমনি গুড়িয়ে দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। পরবর্তীতে ওই দুটি ভাটায় পুনরায় চিমনি নির্মাণের কাজ চলতে দেখা গেলে চলতি মাসের ৭ জানুয়ারি কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব না পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, অবৈধভাবে কোনো ইটভাটা পরিচালনার সুযোগ নেই। সরকারি আদেশ অমান্য করে পুনরায় একই অপরাধ করায় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ভাটাগুলোর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
১৩২ বার পড়া হয়েছে