ধামরাইয়ে বাদশা মিয়ার বক্স পদ্ধতিতে সফল মধু আহরণ
বৃহস্পতিবার , ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ১১:২৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
শীতের আগমনীতে ধামরাইয়ের মাঠগুলো সরিষার হলুদ ফুলে ছেয়ে যায়। সরিষার আবাদ ও ফুলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শুরু হয় মৌ চাষ ও মধু আহরণের ব্যস্ততা।
উপজেলার কুল্লা ইউনিয়নের রূপনগর এলাকায় মৌচাষি বাদশা মিয়া এ সময় 'বক্স পদ্ধতি' ব্যবহার করে সরিষার ফুল থেকে খাঁটি মধু সংগ্রহ করে থাকেন।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বাদশা মিয়া প্রতিবারই শীতকালে ধামরাইয়ে এসে মৌ মাছি ব্যবহার করে মধু আহরণ করেন। তিনি মধু বিক্রি করে একজন সফল মৌচাষি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ধামরাই উপজেলার বিভিন্ন জায়গায়ও মৌচাষিরা বক্স পদ্ধতি অবলম্বন করে সরিষার ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে থাকেন।
রূপনগর এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মেইন রাস্তার পাশে দুই বিঘা জমিতে দুই মাসের জন্য লিজ নিয়ে বাদশা মিয়া ১৫০টি মৌ বক্স স্থাপন করেছেন। শীতকালে সরিষার ফুল থেকে মৌমাছি মধু সংগ্রহ করে বক্সের ভিতরে মৌচাক তৈরি করে। ২ থেকে ৩ দিন বা কখনো এক সপ্তাহ পর এসব বক্স থেকে খাঁটি মধু আহরণ করা হয়। প্রতি সপ্তাহে একটি বক্স থেকে প্রায় ২–৩ কেজি মধু পাওয়া যায়।
বাদশা মিয়া রাজবাড়ীর পাংশা থানা থেকে ধামরাইয়ে আসেন। তিনি জানান, প্রতি বছর শীতে সরিষার সময় এই এলাকায় এসে বক্স পদ্ধতিতে মধু চাষ করেন। তার সঙ্গে কাজ করছেন স্থানীয় মৌচাষি মামুন ও সোবহান। তারা চুক্তিভিত্তিতে মধু আহরণে কাজ করেন।
মৌচাষিরা জানিয়েছেন, এপিস সেরানা জাতের মৌমাছি, যারখুদে মৌমাছি হিসেবে পরিচিত, বাণিজ্যিকভাবে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। মধু সংগ্রহের জন্য সরিষা ক্ষেতের আশপাশে নিরাপদ জায়গায় কাঠের তৈরি বক্সগুলো দেড় থেকে দুই ফুট দূরে স্থাপন করা হয়। প্রতিটি বক্সে চার-পাঁচটি মোম সম্বলিত ফ্রেম থাকে এবং একটি রাণী মৌমাছি থাকেন। প্রতিদিন রাণী মৌমাছি ২–৩ হাজার ডিম দেন। ১৩ দিন পর ডিম থেকে বাচ্চা বের হয়। এরপর ২৬ দিন ধরে মৌমাছি সরিষার ফুল থেকে রেণু ও মধু সংগ্রহ করে। সাধারণ মৌমাছি ৩৯ দিন বয়সে মারা যায়। তবে বক্স পদ্ধতিতে সংগ্রহকৃত মধু পুরোপুরি খাঁটি, এতে চিনি বা অন্য কোনো উপাদান মেশানো হয় না।
স্থানীয়রা রূপনগর এলাকায় আসার পর মধু ক্রয় করেন। শরিফুল ইসলাম দম্পতি বলেন, 'এখানকার মধু খাঁটি, যদিও দাম এবার একটু বেশি।' মাওলানা আনিসুর রহমান বলেন, 'গত বছর ৫০০ টাকা দিয়ে ক্রয় করেছিলাম, এবার দাম ৭০০ টাকা হলেও ভালো মধু পাওয়া যায়।'
মৌচাষি মামুন বলেন, 'সরিষার আবাদ শেষ হলে আমরা চলে যাব। প্রতি সপ্তাহে একবার করে বাক্স থেকে ২–৩ কেজি মধু সংগ্রহ করি।' বাদশা মিয়া আরও জানান, 'আমরা বছরে ছয় মাস মধু সংগ্রহ করি, বাকি ছয় মাস কৃত্রিমভাবে মৌমাছি পালন করি। ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সরিষা ক্ষেত থেকে মধু সংগ্রহের উপযুক্ত সময়। উৎপাদিত মধু স্থানীয় ক্রেতা, দেশজুড়ে পরিচিত ব্র্যান্ড ফ্রেশ, একমি এবং বিভিন্ন অনলাইন শপে বিক্রি হয়। প্রতি কেজি মধুর দাম ৬০০–৭০০ টাকা।'
বাদশা মিয়া বলেন, 'রূপনগর এলাকার পরিবেশ ও চাষযোগ্য জমি মধু উৎপাদনের জন্য অনেক সম্ভাবনাময়। সরকারিভাবে সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। এতে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানও তৈরি হবে।'
ধামরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আরিফুর রহমান জানান, ধামরাই কৃষির জন্য বৈচিত্র্যময় ও সম্ভাবনাময় অঞ্চল। সরিষার নতুন জাতের ফলন ৯০–১০০ দিনের মধ্যে আসে। গত বছর ধামরাইয়ে ৭২০০ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছিল, এবছর তা ৭৫০০ হেক্টরে পৌঁছেছে। সরিষার ফুল থেকে মধু আহরণ করে অনেক মৌচাষি স্বাবলম্বী হয়েছেন। গত বছর প্রায় ৫০ টন মধু আহরণ হয়েছিল। তিনি বেকার যুবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, 'বক্স পদ্ধতি ব্যবহার করে মৌমাছি দিয়ে মধু চাষ করতে পারেন।'
১৭২ বার পড়া হয়েছে