অতীতের নজিরে যৌক্তিক কি না ভারতে টি-২০ বিশ্বকাপ বর্জনের ভাবনা?
মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬ ৮:০২ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
টি- ২০ বিশ্বকাপ সামনে রেখে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে ভারত সফরে পাঠানো হবে কি না- এই প্রশ্ন এখন শুধু ক্রিকেটীয় আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, চলে গেছে কূটনীতি, নিরাপত্তা–নীতি ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট শাসনব্যবস্থার জটিল অঙ্গনে।
বিসিবি ও বাংলাদেশ সরকার একের পর এক নিরাপত্তা–সংকটের প্রমাণ আইসিসির কাছে পাঠিয়েছে, আর আইসিসির স্বয়ং নিরাপত্তা টিমের রিপোর্টেই উঠে এসেছে এমন কিছু পরামর্শ, যা নিজেই অনিরাপত্তার ইঙ্গিত বহন করে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—অতীতের উদাহরণগুলো বিচার করলে, ভারতের মাটিতে না খেলে নিরপেক্ষ ভেন্যু দাবিকে কতটা যৌক্তিক বলা যায়?
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এসেছে, আইসিসির নিরাপত্তা টিম বাংলাদেশকে যে গোপন মূল্যায়ন পাঠিয়েছে, সেখানে অবধারিতভাবে উঠে এসেছে মুস্তাফিজুর রহমানের নাম। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে—মুস্তাফিজকে লক্ষ্য করে সামাজিক মাধ্যমে ঘৃণাত্মক ও হুমকিমূলক কনটেন্ট ছড়ানো হয়েছে, যা তাকে “টার্গেট” বানানোর আশঙ্কা তৈরি করে। এই প্রেক্ষাপটে আইসিসি নিরাপত্তা টিম নাকি পরোক্ষভাবে বলেছে, ঝুঁকি কমাতে তাকে বাদ দিয়ে দল পাঠানোই নিরাপদ বিকল্প হতে পারে।
এই সুপারিশ নিজেই এক জটিল দ্বন্দ্ব তৈরি করে। মুস্তাফিজ কোনো নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ক্রিকেটার নন, তার বিরুদ্ধে কোনো শৃঙ্খলাভঙ্গ, ফিক্সিং বা অন্য কোনো অপরাধমূলক অভিযোগ নেই; তিনি দেশের পূর্ণ বৈধতাসম্পন্ন জাতীয় দলের সদস্য। তাকে বাদ দেওয়ার একমাত্র কারণ যদি রাজনৈতিক ঘৃণা ও টার্গেটেড হুমকি হয়, তবে তা মানে দাঁড়ায়—হোস্ট দেশ ও আইসিসি মিলেও তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না, কিংবা সেই ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
একই রিপোর্টে বাংলাদেশের সমর্থকদের জার্সি ও পতাকা ব্যবহার সীমিত করার পরামর্শ, এবং স্টেডিয়ামে দৃশ্যমান জাতীয় প্রতীক কমিয়ে রাখার গাইডলাইন এসেছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। নিরাপত্তা কূটনীতিতে এটি খুব স্পষ্ট বার্তা—“আপনাদের পরিচয় খোলামেলাভাবে প্রদর্শন করলে ঝুঁকি বাড়বে, তাই পরিচয় আংশিক গোপন রাখুন।”
আবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লাইন— নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও উগ্রতাবাদী উত্থানের কারণে ঝুঁকি “ডাইনামিক্যালি” বাড়তে পারে, অর্থাৎ টুর্নামেন্ট যত এগোবে, হুমকির মাত্রা তত বাড়ার আশঙ্কা থাকবে। এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে ধরলে—
• নির্দিষ্ট খেলোয়াড়কে বাদ দিতে বলা,
• সমর্থকদের জাতীয় পরিচয় সীমিত করতে বলা,
• নির্বাচনের কাছাকাছি ঝুঁকি বাড়ার সতর্কতা—
এসবই বাস্তবে একটি অনিরাপদ পরিবেশের পরোক্ষ স্বীকারোক্তি, যদিও অফিসিয়াল ভাষায় লেখা থাকে “no specific or actionable threat found” ধরনের বাক্য।
এই অবস্থায় বাংলাদেশ সহজেই বলতে পারে—আইসিসি নিজস্ব রিপোর্টেই স্বীকার করছে যে আমাদের খেলোয়াড়–সমর্থক স্বাভাবিক, বৈষম্যহীন ও নিরাপদ পরিবেশে অংশ নিতে পারবে না; তাহলে অংশ না নেওয়া বা নিরপেক্ষ ভেন্যু দাবি করা শুধু আবেগ নয়, একটি যৌক্তিক ও নীতি–সম্মত নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত।
২০০৩ ক্রিকেট বিশ্বকাপ হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়ায়। সে সময় জিম্বাবুয়ের রাজনৈতিক সংকট, মানবাধিকার ইস্যু ও বিরোধী দমনের কারণে দেশটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রবল সমালোচিত ছিল; পাশাপাশি কেনিয়ায় নিরাপত্তা উদ্বেগও তুঙ্গে।
এই প্রেক্ষাপটে— ইংল্যান্ড দল জিম্বাবুয়ের হারারেতে নির্ধারিত ম্যাচ খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। নিউজিল্যান্ড দল কেনিয়ার নাইরোবিতে তাদের ম্যাচেও না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
দুই ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও নিজ নিজ সরকার রিপোর্ট দেয়, ঐ ভেন্যুতে খেলা হলে খেলোয়াড়দের জীবনের ঝুঁকি বেড়ে যাবে। আইসিসি ভেন্যু পরিবর্তনের প্রস্তাব নাকচ করে এবং ম্যাচগুলো না হয়েই স্বাগতিক জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়াকে ওয়াকওভার জয় দেয়।
এর ফলে—ইংল্যান্ড সুপার সিক্সে ওঠার দৌড়ে পিছিয়ে যায়। কেনিয়া অতিরিক্ত পয়েন্ট নিয়ে ইতিহাস গড়ে সেমিফাইনালে পৌঁছে যায়।
এখানে মূল বিষয় দু’টি: ১. ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড টুর্নামেন্টই বর্জন করেনি; তারা “নির্দিষ্ট ভেন্যু”তে না গিয়ে ফোরফিট স্বীকার করেছে। ২. আইসিসি এখানেও হোস্টদের পক্ষে থেকে ভেন্যু অপরিবর্তিত রেখেছে, শুধু ফল টেবিলে সমন্বয় করেছে।
বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান এর থেকে এক ধাপ এগিয়ে—এখানে কেবল একটি বা দু’টি শহর নয়, পুরো হোস্ট দেশকেই (ভারত) ঝুঁকির পরিবেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, এবং বিকল্প হিসেবে নিরপেক্ষ ভেন্যু দাবির সম্ভাবনা তুলে ধরা হচ্ছে।
২০২১ সালে নিউজিল্যান্ড দল পাকিস্তানে ম্যাচ শুরু হওয়ার ঠিক আগে হঠাৎ সফর বাতিল করে দেয়, গোয়েন্দা সংস্থার সুনির্দিষ্ট সতর্কবার্তার কথা উল্লেখ করে। নিউজিল্যান্ড সরকার ও বোর্ড জানায়, “বিশেষ ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি” চিহ্নিত হওয়ায় তারা পাকিস্তান সরকার বা আইসিসির আশ্বাস সত্ত্বেও মাঠে নামতে পারছে না।
এই সিদ্ধান্তের পর ইংল্যান্ডও নিজের পুরুষ ও নারী দল পাকিস্তান সফর থেকে সরে দাঁড়ায়, রাজনৈতিকভাবে “প্লেয়ার ওয়েলবিইং ও সিকিউরিটি কনসার্ন” দেখিয়ে। সিরিজগুলো স্থগিত হয়, এবং পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে “হোস্ট হলেও ঘরের মাঠ বিদেশে”—এই বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য হয়।
২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখিয়ে বাংলাদেশ সফর স্থগিত করে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা টিম ঢাকা ও চট্টগ্রাম পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেয়, কিছু নির্দিষ্ট জঙ্গি সংগঠনের হুমকি ও পশ্চিমা নাগরিকদের টার্গেট করার আশঙ্কা আছে। বাংলাদেশ সরকার আশ্বাস দিলেও, অস্ট্রেলিয়া বলেছিল—“acceptable risk level”–এ নামেনি পরিস্থিতি। ফলাফল, সিরিজই হয়নি।
এই সব নজির এক জিনিস পরিষ্কার করে, নিরাপত্তা মূল্যায়ন যেখানেই “বিবাদপূর্ণ” (host বনাম touring nation), সেখানেই সফর বাতিল বা স্থগিতকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আইনে পুরোপুরি বেআইনি বলা হয়নি। আইসিসি সাধারণত ম্যাচ বা সিরিজ পুনরায় নির্ধারণ, নিরপেক্ষ ভেন্যু বা আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি ম্যানেজ করেছে।
বাংলাদেশ এখন ঠিক এই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে—হোস্ট দেশ বলছে “ঝুঁকি নেই”, অথচ ট্যুরিং দেশ নিরাপত্তা গোয়েন্দা তথ্য, বিদ্বেষমূলক বক্তৃতা, টার্গেটেড হুমকি ও নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণ থেকে বলছে “ঝুঁকি গ্রহণযোগ্য মাত্রার ওপরে”।
ভারত–পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট অনেক বছর ধরেই প্রায় অচল। কাশ্মীর, সীমান্ত উত্তেজনা ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে দু’দেশের টানাপোড়েনে ভারত সরকার পাকিস্তানে দল পাঠানোর অনুমতি দেয় না; পাল্টা পাকিস্তানও ভারতের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিবেশের প্রশ্ন তোলে।
এই বাস্তবতার মধ্যে আইসিসি ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল কিছু গুরুত্বপূর্ণ মডেল ব্যবহার করেছে, পাকিস্তান হোস্ট থেকে গেলেও ভারত–সম্পৃক্ত ম্যাচগুলো দুবাই/আমিরাতে সরিয়ে নেয়া। কিছু টুর্নামেন্টে “হাইব্রিড ভেন্যু” মডেল—এক অংশ পাকিস্তানে, অন্য অংশ নিরপেক্ষ মাঠে।
এখানে মূল কথা, হোস্টের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করা হয়েছে (নামমাত্র হোস্ট, ব্রডকাস্ট–রাইট ইত্যাদিতে), তবে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক উত্তেজনা মাথায় রেখে উচ্চঝুঁকির ফিক্সচার নিরপেক্ষ স্থানে সরানো হয়েছে।
বাংলাদেশ যদি বলে, “ভারতের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ, নির্বাচনী উত্তেজনা, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সংগঠিত বিদ্বেষ এবং আমাদের খেলোয়াড়–সমর্থকদের টার্গেটেড হুমকি মিলিয়ে পুরো হোস্ট দেশকে উচ্চঝুঁকির জোন হিসেবে দেখতে হচ্ছে; তাই নিরপেক্ষ ভেন্যুতে আমাদের ম্যাচগুলো সরান”— তাহলে তা পাকিস্তান–ভারত প্রসঙ্গের আলোকে একেবারে নতুন বা নজিরবিহীন দাবি হবে না। বরং আইসিসি–র অতীত আচরণের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ এক ধরণের “পলিটিকাল কম্প্রোমাইজ” মডেল।
একটি ভুল–বোঝাবুঝি পরিষ্কার করা জরুরি—২০০৩ বিশ্বকাপের ঘটনায় ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড টুর্নামেন্টই বর্জন করেনি; তারা পুরো বিশ্বকাপ খেলেছে, কেবল একটি করে ভেন্যুতে না গিয়ে ওয়াকওভার স্বীকার করেছে। সেখানে নিরাপত্তা বিতর্ক ছিল, কিন্তু আইসিসি নিরাপত্তা রিপোর্টে “নির্দিষ্ট খেলোয়াড় বাদ দিন, পতাকা লুকিয়ে রাখুন”–ধরনের সরাসরি সামাজিক–মনস্তাত্ত্বিক ঝুঁকি–স্বীকারোক্তি ছিল না।
বাংলাদেশের কেসে—টার্গেটেড হুমকি, পরিচয় গোপন রাখার পরামর্শ, নির্বাচনী রাজনীতির উত্তেজনা— এই তিনটি একসঙ্গে মিলে এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যা শুধুই “সাধারণ সন্ত্রাসী ঝুঁকি” নয়, বরং নির্দিষ্ট দেশ ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতি সংগঠিত বৈরিতা। তাই এটাকে ২০০৩ সালের নির্দিষ্ট ভেন্যু–বহির্ভূত ফোরফিটের সঙ্গে পুরোপুরি মিলিয়ে দেখা যায় না। বরং কাঠামোগতভাবে এটি পাকিস্তানের “ভারতে না যাওয়া, নিরপেক্ষ ভেন্যু চাই” মডেলের অনেক কাছাকাছি।
অতীতের সব নজির—২০০৩ বিশ্বকাপের ভেন্যু বর্জন, পাকিস্তানকে ঘরের মাঠ বিদেশে সরিয়ে নেওয়া, নিউজিল্যান্ড–ইংল্যান্ডের সফর বাতিল, ভারত–পাকিস্তান ম্যাচের নিরপেক্ষ ভেন্যু—সব মিলিয়ে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, নিরাপত্তা ইস্যুতে ট্যুরিং দেশের যুক্তি পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে ক্রিকেট চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কখনো দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল সমাধান দেয়নি।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আইসিসি নিরাপত্তা টিমের নিজের ভাষাতেই মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার পরামর্শ, সমর্থকদের পরিচয় গোপন রাখতে বলা এবং নির্বাচনের সঙ্গে ঝুঁকি বাড়ার সতর্কতা—এই তিনটি উপাদান মিলে না–যাওয়া বা নিরপেক্ষ ভেন্যু দাবিকে কেবল রাজনৈতিক বয়ান নয়, একটি সুসংহত, নথিভিত্তিক ও বিধিসম্মত নিরাপত্তা–যুক্তিতে পরিণত করেছে।
এখন প্রশ্ন শুধু যুক্তির নয়, শক্তিরও—বাংলাদেশ কতটা কূটনৈতিক ও ক্রিকেট–রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে, আর আইসিসি নিজস্ব রাজস্ব–রাজনীতি ও ভারতের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে কতটা সমঝোতার পথ বেছে নেয়। তবে বিশ্লেষণভিত্তিকভাবে বলা যায়, অতীতের উদাহরণ ও বর্তমান তথ্য–উপাত্ত বিচার করলে ভারতের মাটিতে টি–২০ বিশ্বকাপে না খেলে নিরপেক্ষ ভেন্যু দাবিকে “অযৌক্তিক” বলা কঠিন; বরং এটি নিরাপত্তা–নীতি ও আন্তর্জাতিক নজির–উভয় দিক থেকেই যথেষ্টভাবে সমর্থনযোগ্য একটি অবস্থান।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
১১৯ বার পড়া হয়েছে