পাবনার বেড়ায় ‘সবজি খিচুড়ি উৎসব’ পালন, সম্প্রীতি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন
শনিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬ ১০:৪৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
পাবনার বেড়া উপজেলা সদরের দক্ষিনপাড়া গ্রামে প্রতি বছর আয়োজন করা হয় এক ভিন্নধর্মী প্রীতিভোজ ‘সবজি খিচুড়ি উৎসব’।
প্রথম দেখলে মনে হতে পারে এটি কোনো বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠান, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি এক অনন্য সামাজিক উদ্যোগ। এ বছর এই উৎসব এক যুগ পূর্ণ করেছে।
উৎসবে এবার রান্না করা হয় ১২০ মণ বিভিন্ন ধরনের সবজি, ৬ মণ চাউল ও ৩ মণ ডাউল দিয়ে। খিচুড়ি উৎসবে অংশগ্রহণ করে বেড়া পৌর এলাকার দক্ষিণপাড়া, দাসপাড়া, কর্মকারপাড়া, শেখপাড়া, শাহপাড়া ও হাতিগাড়া মহল্লার প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার নারী-পুরুষ। রাত ৮টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত চলা এই প্রীতিভোজে সবাই মিলিত হয়ে খাওয়াদাওয়া করেন।
উৎসবটির আয়োজন করে থাকে ‘দক্ষিণপাড়া যুবসমাজ’। এই আয়োজন ১২ বছর ধরে চলে আসছে। শীতকালীন কোনো একটি দিনকে উৎসবের জন্য নির্বাচিত করা হয়। এ বছর সবাই মিলে ১০ জানুয়ারি দিনটি সবজি খিচুড়ি উৎসব হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
২০১৫ সালে বেড়া পৌর এলাকার দক্ষিণপাড়া মহল্লার ১০ থেকে ১২ জন যুবক এই খিচুড়ি উৎসবের সূচনা করেন। ওই বছর এক হান্ডি খিচুড়ি রান্না করে সীমিতসংখ্যক মহল্লাবাসীর মাঝে বিতরণ করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উৎসবের পরিধি বৃদ্ধি পায়। শুরুতে দক্ষিনপাড়ার যুবকেরা মূলত আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন আশেপাশের কয়েকটি মহল্লার বিভিন্ন বয়স ও ধর্মের মানুষ এতে অংশ নিচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, শুক্রবার সকাল থেকেই ১৫ থেকে ২০টি বাড়িতে নারী-পুরুষ থেকে শিশু সবাই ব্যস্ত থাকে আলু, ফুলকপি, বাধাকপি, পেঁপে, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, সিম, টমেটো, গাজর, মুলা, কাঁচা মরিচ, বেগুন, শালগম, বরবটিসহ বিভিন্ন সবজি কাটার, বাছাই ও ধোয়ার কাজে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মসলা বাটায় নারীরা ব্যস্ত থাকেন। সবজি সংগ্রহ করে দক্ষিণপাড়া মহল্লার সবচেয়ে বড় খালি জায়গায় আনা হয়। সেখানে বসানো হয় ৮টি অস্থায়ী চুলা এবং প্রস্তুত করা হয় প্যান্ডেল। কাটা সবজি সাজিয়ে রাখার জন্য একে একে টেবিল জোড়া দিয়ে বিশাল টেবিল বানানো হয়। বিকেল চারটা থেকে শুরু হয় খিচুড়ি রান্না, যা কয়েক দফায় সম্পন্ন হয়। রাত ৮টা থেকে শুরু হয়ে রাত ১টা পর্যন্ত চলতে থাকে খাওয়াদাওয়া।
আয়োজকদের অন্যতম ফজলুর রহমান জানান, এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হলো সম্প্রীতি ও সহযোগিতার বন্ধন দৃঢ় করা। দক্ষিণপাড়াসহ আশেপাশের মহল্লার মানুষ সারাবছর ধরে এই উৎসবের অপেক্ষা করেন। উৎসবে আত্মীয় স্বজন, মেয়ের জামাইরা বাড়িতে এসে অংশগ্রহণ করেন।
উৎসবটি সর্বজনীন হওয়ায় অর্থসংগ্রহে কোনও সমস্যা হয় না। মহল্লার লোকজন স্বতঃস্ফূর্তভাবে অর্থ দিয়ে সহায়তা করেন। ফলে সবজি ও অন্যান্য উপকরণের অভাব কখনো হয় না, বরং বছরে বছরে তার পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দক্ষিণপাড়া মহল্লার বাসিন্দা ও সহকারী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, 'খিচুড়ি উৎসব এখন আমাদের এলাকার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে। দক্ষিণপাড়ার তরুণেরা মূল ভূমিকা পালন করলেও আশেপাশের মহল্লার মানুষও উৎসবে সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতা করছেন।'
খিচুড়ি উৎসবের মাধ্যমে দক্ষিণপাড়া মহল্লার মানুষ যেমন আনন্দে মেতে ওঠেন, তেমনি এটি মহল্লাটিকে প্রাণবন্ত মিলনমেলায় পরিণত করে।
১৫১ বার পড়া হয়েছে