সর্বশেষ

জাতীয়কলকাতার অ্যাপোলো হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে ওবায়দুল কাদের
একই দিনে নির্বাচন ও গণভোটের তফসিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে আশাবাদ সিইসির, পরিবেশ সন্তোষজনক বলে মন্তব্য
মনোনয়নপত্র সংক্রান্ত আপিল দাখিলের নিয়ম ও সময়সূচি প্রকাশ
ভোররাতে ঢাকা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্প
আজ থেকে মনোনয়নপত্র গ্রহণ-বাতিলের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল শুরু
কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত জনজীবন, শীত আরো বাড়বে : আবহাওয়া অফিস
সারাদেশনাটোরে পুকুরপাড় থেকে অজ্ঞাত নারীর মরদেহ উদ্ধার, হত্যার সন্দেহ
রশিদ ছাড়া এলপিজি বিক্রি : মানিকগঞ্জে দুই প্রতিষ্ঠানকে নগদ জরিমানা
বিগত নির্বাচনে ছিল অনিয়ম-কারচুপি: বান্দরবানে নির্বাচন কমিশনারের সতর্কবার্তা
কুমিল্লায় ভোটারদের সচেতনতা বাড়াতে ‘ভোটের গাড়ি’ কর্মসূচি শুরু
উল্লাপাড়ায় বৃদ্ধার সৎকার ঘিরে উত্তেজনা, প্রশাসনের হস্তক্ষেপে দাহ সম্পন্ন
আন্তর্জাতিকশপথ নিচ্ছেন ভেনেজুয়েলার নতুন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ
মাদুরোর দেহরক্ষী হত্যার অভিযোগে ভেনেজুয়েলার তীব্র নিন্দা
খেলামোস্তাফিজ ইস্যুতে বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার স্থগিতের নির্দেশ
ভারতের ম্যাচ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে বিসিবি, ঘনীভূত সংকট
মতামত

খালেদা জিয়ার মৃত্যু একটি যুগের সমাপ্তি

এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া
এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ ২:১১ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
২০২৫ সালটি শেষ হলো বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, জাতীয়তাবাদী শক্তির এক বটবৃক্ষ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকাল ও তাঁকে দল-মত নির্বিশেষে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের চোখে পানিতে চীর বিদায়ের মাধ্যমে।

২৩ নভেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে উদ্বেগ বিরাজ করছিল। ৩০ ডিসেম্বর ভোরে ৭৯ বছর বয়সে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন খালেদা জিয়া। ফেসবুকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিএনপি জানায়, ‘আমাদের প্রিয় জাতীয় নেতা আর আমাদের মাঝে নেই।’

তিনি যখন ইন্তেকাল করেছেন তখন তারই রাজনৈতিক চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ও গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে নির্বাসিত সময় পাড় করছেন। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির প্রায় চার দশকের বেশি সময় ধরে চলা এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। তিনি ছিলেন একজন মেরুকরণ সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্ব। তার আপসহীন মনোভাব, নির্বাচন বর্জন ও দীর্ঘস্থায়ী রাজপথের আন্দোলনে নেতৃত্বদান সব মিলিয়ে তিনি যেমন অকুতোভয় নেত্রী। বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকাল বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি যুগের সমাপ্তি।

১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গের দিনাজপুরে (বর্তমানে বাংলাদেশে দিনাজপুর জেলা) বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদারের ঘরে জন্মগ্রহন করেন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পরিবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। খালেদা জিয়ার শৈশব কেটেছে দিনাজপুরে। সেখানে তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। স্বামীর জীবদ্দশায় খালেদা জিয়া রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আগমন কোন উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে হয়নি, বরং পরিস্থিতি ও সময় তাকে বাধ্য করেছে রাজনীতিতেতে আসতে।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তাঁর স্বামী তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরন করেন। জিয়ার মৃত্যু দেশকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেয়। বছরের পর বছর ক্যু আর পাল্টা ক্যুর পর দেশে যে স্থিতিশীলতা জিয়াউর রহমান ফিরিয়ে এনেছিলেন, তাঁর অবর্তমানে তা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠাতা হারানো বিএনপি তখন চরম অস্তিত্ব সংকটে। ঠিক সেই সময়ই দলের অভ্যন্তরীণ বিভেদ মেটাতে এবং জিয়ার আদর্শ ধরে রাখতে খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আসতে হয়েছে। দলের নেতাকর্মীদের চাপে ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন। একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়েও তিনি যেভাবে গৃহকোণ ছেড়ে রাজপথে নেমে আসেন, তা ছিল বাংলাদেশের জন্য এক নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা। ১৯৮৪ সালে তিনি দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন এবং আমৃত্যু সেই পদে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা ছিল আশির দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। ৯ বছরের সেই দীর্ঘ সংগ্রামে তিনি রাজপথে সক্রিয় থেকেছেন, বারবার কারাবরণ ও গৃহবন্দী হয়েছেন, কিন্তু তৎকালীন সামরিক শাসকের কোনো প্রলোভন বা রক্তচক্ষু তাঁকে আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে তিনি যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা তাঁকে ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তাঁর অনমনীয় নেতৃত্বের মুখে স্বৈরশাসক পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং দেশে গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ ঘটে। যার অধিকাংশ কৃতিত্ব ছিল বেগম খালেদা জিয়ার।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম একটি সময়, একটি দর্শন, একটি আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি হচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়অ। আপোষহীনতা, দৃঢ়তা ও নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে যিনি কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছেন তিনি। আন্দোলন, সংগ্রাম, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের এক অগ্নি মশাল নিভে গেল সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি'র চেয়ারপারসন হিসেবে প্রায় তিন দশক ধরে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, তার দৃঢ়তা, আপসহীনতা ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে অবিচল অবস্থান ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অধ্যায়ের অবসান হলো, যা দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। খালেদা জিয়ার প্রয়াণ শুধু একজন নেত্রীর চলে যাওয়া নয়, বরং আপসহীন সংগ্রামের একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি, যা দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তার ইন্তেকাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি 'উজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি' হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে, যা দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

খালেদা জিয়ার ইন্তেকাল বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের সমাপ্তি। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, যিনি জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় রাজনীতির ধারাকে প্রতিনিধিত্ব করতেন এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান তাকে আজীবন স্মরণীয় করে রাখবে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, তিনবারের সরকারপ্রধান, এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল সংগ্রামে ভরা, দ্বন্দ্বে জর্জরিত, কিন্তু একই সঙ্গে ইতিহাস গড়া এক অধ্যায়। তাঁর অনুপস্থিতি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, সমগ্র জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসে এক শূন্যতা তৈরি করেছে। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক প্রভাবশালী অধ্যায়। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি শুধু একটি দলের নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি সময়, একটি সংগ্রাম এবং একটি মতাদর্শের প্রতীক।

একসময়ের লাজুক গৃহবধূ সময়ের প্রয়োজনে হয়ে উঠেছিলেন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের আপোষহীন নেত্রী। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দলের হাল ধরা, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া, ১/১১-এর ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করা এবং বিগত ১৬ বছরের আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনামলে অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করা- বেগম খালেদা জিয়ার জীবন এক ত্যাগের মহাকাব্য। ২০০৭ এর ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি হলে রাজনীতিতে নেমে আসে কালো ছায়া। সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে ওঠে। সে সময় বেগম খালেদা জিয়াকে দেশ ত্যাগের জন্য প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হয়। বলা হয়েছিল, তিনি যদি সৌদি আরবে চলে যান তবে তার ছেলেদের মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু বিমানবন্দরে সব প্রস্তুত থাকার পরেও তিনি দেশ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। সে সময় এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়েটার্স লিখেছিল, “Yes, the scenario has changed and she will not go.” এই আপোষহীনতাই তাঁকে দেশবাসী ও আর্ন্তজাতিক মহলের কাছে কিংবদন্তিতে পরিনত করেছে।

বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর অন্যতম প্রধান ধারক। তিনি বিশ্বাস করতেন যে বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি এদেশের মানুষের হাতেই থাকতে হবে। তাঁর পররাষ্ট্রনীতি ছিল সুসংহত ও মর্যাদাপূর্ণ। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে তিনি ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান দৃঢ় করেছিলেন। জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তাঁর কঠোর অবস্থান তাঁকে দেশপ্রেমিক জনগণের কাছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছিল। গত আওয়ামী ফ্যাসীবাদী শাসনের দেড় দশকে বেগম খালেদা জিয়াকে যে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তা বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল। দুর্নীতির কথিত অভিযোগে তাঁকে ২০১৮ সালে কারারুদ্ধ করা হয়। বয়স ও ভগ্নস্বাস্থ্য সত্ত্বেও তিনি যেভাবে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন, তা তাঁর সংগ্রামী জীবনেরই অংশ। কনিষ্ট পুত্র কোকোর ইন্তেকালের বেদনা এবং বিদেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েও তিনি নিজ দেশের মাটি ছেড়ে যাননি। তাঁর এই নিভৃত বেদনা ও স্থৈর্য তাঁকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে আরও উচ্চ আসনে বসিয়েছে। তাঁর সংগ্রামী জীবন ও সংগ্রাম কেবল একটি দলের ইতিহাস নয়, বরং তা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের উত্থান-পতনের এক জীবন্ত দলিল। ক্ষমতার গদি নয়, বরং জনগণের ভালোবাসা ও অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি। তাঁর প্রয়াণের পরও তাঁর অটল আদর্শ, আপসহীন চেতনা এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন আগামী প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের জন্য চিরকাল প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

২০২৪ এর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার উত্তাল বিপ্লবে যখন দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরাচারী ফ্যাসীবাদী আওয়ামী সরকারের পতন ঘটে এবং শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান প্রতিবেশী ভারতে, তখন বেগম খালেদা জিয়া এভারকেয়ার হাসপাতালের বিছানায় চিকিৎসাধীন। হাসিনার পতনের পরদিনই, ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের আদেশে তাকে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে তার দীর্ঘ ৬ বছরের কারাবাস ও কার্যত গৃহবন্দিত্বের। যে নেত্রীকে তিলে তিলে শেষ করার জন্য ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ থেকে ‘সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি’ বানানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিল আওয়ামী সরকার, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তিনি মুক্ত হন বীরের বেশে, আর তার নির্যাতনকারী লুকিয়ে তার সমর্থক ও দলীয় নেতা-০কর্মীদের ফেলে রেখে দেশ ছাড়া হয়। শেখ হাসিনার পলায়ন এবং আওয়ামী লীগের পতনের খবর শুনে তিনি মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন শুধুমাত্র। কোনো বিজয়োল্লাস বা প্রতিপক্ষকে দমনের মানসিকতা দেখা যায়নি তার আচরনে। বরং বিজয়ের পর তিনি দেখিয়েছিলেন এক অসাধারণ রাষ্ট্রনায়কোচিত উদারতা। বেগম জিয়া ছাত্রজনতার বিপ্লবে মুক্তির পর ৭ আগস্ট নয়াপল্টনে বিএনপির ঐতিহাসিক সমাবেশে হাসপাতাল থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন এবং তিনি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। দীর্ঘদিনের নির্যাতন ও অবিচারের শিকার হয়েও তিনি বলেছিলেন, “ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়, আসুন ভালোবাসা আর শান্তির সমাজ গড়ে তুলি। এই বিজয় আমাদের নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে।" তার ঐ বক্তব্য প্রমাণ করেছিল যে, বেগম জিয়া কেবল ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করেননি, বরং তিনি ছিলেন প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে থাকা এক মহৎপ্রাণ নেত্রী।

বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘গত কয়েক দশকে রাজনীতি থেকে অনেকেই লাভবান হয়েছেন। কিন্তু খালেদা জিয়াকে বিশাল মূল্য দিতে হয়েছে, বিশেষ করে ২০০৬ সালের পর থেকে।’ এর মাধ্যমে তিনি খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবারের ওপর আসা কারাবরণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও নিরবচ্ছিন্ন চাপের প্রতি ইঙ্গিত করেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে খালেদা জিয়ার অনড় অবস্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভুল হোক বা ঠিক, তিনি একবার যা বলতেন, সেখান থেকে সচরাচর পিছু হটতেন না। সমসাময়িক অন্য রাজনীতিকদের মধ্যে এ দৃঢ়তা দেখা যায় না।’ একটি রক্ষণশীল সমাজে যেখানে নারীর নেতৃত্ব নিয়ে একসময় সংশয় ছিল; সেখানে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়াটাও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বড় অংশ হয়ে থাকবে।'

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া একটি অনিবার্য নাম একটি যুগ, একটি ধারাবাহিক সংগ্রাম এবং এক দীর্ঘ প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে আছে ও থাকবে। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, দীর্ঘদিনের বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপসহীন এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তার জীবন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের কাহিনি নয়; বরং এটি বাংলাদেশের অসমাপ্ত গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার এক প্রামান্য দলিল। তার ইন্তেকালে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটালেও, কিছু প্রশ্ন রেখে গেছেন-গণতন্ত্রের বাস্তবতা, বিরোধী রাজনীতির পরিসর, রাষ্ট্রক্ষমতার সীমা-সেগুলো আজও অমীমাংসিত।

রাজনীতির কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও দেশে অবস্থান করে লড়াই চালিয়ে যাওয়া তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। জনগনের চোখে এটি দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধের প্রকাশ; সমালোচকেরা একে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও দেখেছেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত তার ব্যক্তিগত জীবনের ত্যাগ ও রাজনৈতিক সংকল্পকে অস্বীকার করা সম্ভব নয় কারো পক্ষে। বেগম খালেদা জিয়ার জীবন দেখায়, বাংলাদেশে গণতন্ত্র কখনোই সরলরৈখিক ছিল না। এটি অর্জনের পরও বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। নির্বাচন হয়েছে, সরকার বদলেছে, কিন্তু শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও টেকসই রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভাব গণতন্ত্রকে ভঙ্গুর করে রেখেছে। বেগম খালেদা জিয়ার জীবন আমাদের শেখায়, গণতন্ত্র কেবল ক্ষমতা অর্জনের উপায় নয়; এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া, যা সততা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার দাবি করে।

বেগম খালেদা জিয়া কেবল অতীতের একটি নাম নন; একটি অসমাপ্ত সংগ্রাম। তার জীবনের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা উভয়ই বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বুঝতে সাহায্য করে। এই উপলব্ধিই তার প্রতি প্রকৃত শ্রুদ্ধা: তাকে স্মরণ করা মানে তার রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হওয়া এবং একটি অধিকতর ন্যায়সংগত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র গড়ার অঙ্গীকার করা। রাজনৈতিক আদর্শে মতবিরোধ থাকলেও বেগম খালেদা জিয়ার আপোষহীনতা, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তার অবদানের প্রশ্নে এদেশের সকল শ্রেনী-পেশার মানুষ প্রায় একমত। তার মৃত্যুতে দল-মত নির্বিশেষে শোক, সমবেদনা ও শ্রদ্ধা নিবেদনে সেটা প্রতীয়মান হয়ে ওঠে। কীর্তিমানের মৃত্যু নেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়াও ইতিহাসের পাতায় কীর্তিমান হয়ে থাকবেন প্রাসঙ্গিক।

লেখক : রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট 

১৫৩ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন