ঢাকা টু দার উস সালাম: নারী স্বৈরশাসনের এক 'ডাবল এক্সপোজার'
রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫ ৬:৪৮ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের শাসনকালে ধারাবাহিকভাবে বিতর্কিত নির্বাচন, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ওপর মামলা, গ্রেফতার ও গুমের অভিযোগ, এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বেপরোয়া ব্যবহারকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে তাঁর শাসনকে কর্তৃত্ববাদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ও অন্যান্য আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের রায় এই অভিযোগগুলোকেই আরও রাজনৈতিক ও আইনি ওজন দিয়েছে।
একই সময়ে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে তানজানিয়ার প্রেসিডেন্ট সামিয়া সুলুহু হাসান ২০২৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রায় সর্বসম্মত জয় ছিনিয়ে নেয়ার পর পরই দেশজুড়ে বিরোধী বিক্ষোভের বিরুদ্ধে নির্বিচার গুলি, গণগ্রেফতার ও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মতো পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও গণমাধ্যমের তদন্তে নির্বাচনের আগে ও পরে শত শত থেকে কয়েক হাজার পর্যন্ত বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, লাশ গুম ও গণকবরের অভিযোগ সামনে আসায় তাঁকেও “উদীয়মান নারী স্বৈরশাসক” হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন অনেক পর্যবেক্ষক।
শেখ হাসিনার শাসনে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ সীমিত ছিল, বিপুলসংখ্যক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় এবং ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠে। তাতে নির্বাচন মূলত ক্ষমতার বৈধতার আনুষ্ঠানিক অভিনয় হিসেবে কাজ করেছে—এমনই মন্তব্য রয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে, যেখানে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার উল্লেখ আছে। সামিয়া সুলুহুর ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, প্রধান বিরোধী নেতা টুন্ডু লিসুর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় আটক অবস্থা, আরেক প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রার্থিতা বাতিল, এবং বাস্তবে একতরফা নির্বাচনী প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে তাঁর পুনর্নির্বাচন নিশ্চিত করা হয়েছে।
দমন-পীড়নের ধরনে মিল স্পষ্ট। শেখ হাসিনার সময় বাংলাদেশে গুম, ক্রসফায়ার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বিরোধী রাজনীতিকে ভীত রাখতে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ, আর ইন্টারনেট ও মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে নানা আইন প্রয়োগের ফলে সমালোচনামূলক কণ্ঠকে কোণঠাসা করা হয়েছে। তানজানিয়ায় সামিয়া সুলুহুর অধীনে নির্বাচনের পরপরই দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক প্রেসের ওপর চাপ দিয়ে বাস্তব চিত্র আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে—এমন অভিযোগ করছে বৈশ্বিক ডিজিটাল রাইটস প্ল্যাটফর্ম ও অধিকারকর্মীরা।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, দুই নেত্রীই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির ভাষ্যকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন; একদিকে উন্নয়ন, অন্যদিকে ভিন্নমত দমন—এই দ্বিমুখী কৌশল “ডেভেলপমেন্টাল অটোক্রেসি” নামে পরিচিত নতুন স্বৈরশাসনের ধারায় তাঁদের অবস্থান মজবুত করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প, প্রবৃদ্ধির উচ্চ হার ও দারিদ্র্য হ্রাসের সাফল্য তুলে ধরে আন্তর্জাতিক সমর্থন নেওয়া হয়েছে; তানজানিয়ায় গ্যাস, অবকাঠামো ও বিনিয়োগবান্ধব ইমেজ ব্যবহার করে একই ধরনের বৈধতা সৃষ্টির চেষ্টা দেখা যায়।
তবে পার্থক্যও কম নয়। শেখ হাসিনা বহু নির্বাচনী চক্র ধরে রাষ্ট্রের প্রায় সব সাংবিধানিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণে আনার সুযোগ পেয়েছিলেন, যা তাঁকে দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরতন্ত্র গড়ার কাঠামো দিয়েছে। সামিয়া সুলুহু তুলনামূলকভাবে স্বল্প সময়ে খুব দ্রুত ও রক্তাক্ত দমননীতির দিকে ঝুঁকেছেন; তাঁর বিরুদ্ধে এখনো পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে তদন্তের দাবিতে ডসিয়ার ও পিটিশন জমা পড়ার স্তরেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ, আইনি প্রক্রিয়া কত দূর যাবে তা অনিশ্চিত।
তার পরও, ঢাকার শেখ হাসিনা থেকে দার এস সালামের সামিয়া সুলুহু পর্যন্ত—দুই নারী শাসকের দুই মহাদেশে একই ধরনের স্বৈরশাসক রূপরেখা দেখা যাওয়ায় অনেকে একে “নারী অটোক্র্যাটদের গ্লোবাল প্লেবুক” বলে অভিহিত করছেন, যার কেন্দ্রে আছে একতরফা নির্বাচন, নিরাপত্তা বাহিনীর বেপরোয়া ব্যবহার এবং তথ্যপ্রবাহের ওপর লৌহমুষ্টি।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
১১৪ বার পড়া হয়েছে