সর্বশেষ

সাহিত্য

কালের করতলে এক ধ্রুবতারা:

হাসান হাফিজুর রহমানের কাব্যে স্বদেশ ও স্বজনের অনন্ত অভিসার

গাউসুর রহমান
গাউসুর রহমান

রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬ ৬:১৬ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
আজ যখন আমরা বাংলা সাহিত্যের পাতায় চোখ বোলাই, তখন মনটা যেন একটু থমকে দাঁড়ায়। এই যে পথ হেঁটে এসেছি আমরা, তার বাঁকে বাঁকে কত উজ্জ্বল মুখ, কত কথার পসরা। তেমনই এক অনন্য পথিকৃৎ, যিনি পঞ্চাশের দশকের ধূসর পটভূমিতে এক ঝলক আলোর রেখা নিয়ে এসেছিলেন—তিনি হাসান হাফিজুর রহমান।

১৯৪৭-এর পর  মুক্তির যে স্বপ্ন দু'চোখ ভরে দেখা হয়েছিল, নতুন এক দেশ গড়ার যে আকুলতা, তা বড় তাড়াতাড়িই যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ঔপনিবেশিক শাসনের শেকল হয়তো ছিঁড়েছিল, কিন্তু তার জায়গায় এলো নতুন এক অদৃশ্য শোষণ, এক নতুন ধরনের জাঁতাকল।

এমনই এক টালমাটাল সময়, যখন চারদিকে শুধু সংশয় আর হতাশার চোরাবালি, তখনই হাসান হাফিজুর রহমানের আবির্ভাব। তিনি কি শুধু কলম ধরেছিলেন? না, তিনি ছিলেন তারও চেয়ে বেশি কিছু। তিনি এসেছিলেন সমাজের হৃদস্পন্দন হয়ে, জাতীয় আকাঙ্ক্ষার এক অকুতোভয় প্রমিথিউস হয়ে, যিনি আগুন চুরি করে এনেছিলেন মানুষের জন্য। তাঁর কবিতার গভীরে ছিল এক অদ্ভুত দ্বৈত সত্তা—যেখানে শিল্পের নিজস্ব এক সুর, এক গীতিময় লাবণ্য, আর সমাজের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার, শোষণহীন এক পৃথিবীর স্বপ্ন, মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। মনে হতো, যেন একজন নিভৃতচারী শিল্পী আর এক বিপ্লবী হাত ধরে হেঁটে চলেছেন একই পথে। তাঁর কাছে কবিতা কেবল শব্দ দিয়ে খেলা ছিল না, ছিল জীবনেরই আরেক নাম। ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ বলে যারা কাব্যচর্চাকে জীবনের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে চেয়েছিলেন, হাসান ছিলেন তাদের ঠিক উল্টো পথে হাঁটা একজন। তাঁর কাছে কবিতা ছিল জীবনেরই প্রতিচ্ছবি, জীবনেরই আর্তি, জীবনেরই স্বপ্ন। এক অদ্ভুত নিপুণতায় তিনি শব্দ, রূপক আর চিত্রকল্পের বুননে ধারণ করেছিলেন এ জাতির অবদমিত আকাঙ্ক্ষাকে। তাঁর কবিতা যেন যুগপৎ আর্তনাদ আর আলোর ইশারা হয়ে উঠেছিল, আর সে কারণেই তিনি সমকালের মহাকাব্যিক রূপকারে পরিণত হয়েছেন।

হাসান হাফিজুর রহমানের জীবনের প্রথম এবং সম্ভবত সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ প্রেক্ষাপটে। ১৯৫২ সাল, সে তো কেবল একটা তারিখ ছিল না, ছিল এক স্ফুলিঙ্গ, যা জ্বলে উঠেছিল এক অবরুদ্ধ জাতির বুকে। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পেলেও, ভাষা নিয়ে নতুন যে আগ্রাসন নেমে এসেছিল, তা বাঙালির আত্মমর্যাদায় আঘাত হেনেছিল বড় কঠিনভাবে। এই আন্দোলন কেবল কিছু রাজনৈতিক দাবিদাওয়া ছিল না, একজন গবেষক যেমনটা বলেন, এ ছিল শোষিত মানুষের এক নিজস্ব সংস্কৃতি আর আত্মপরিচয় নির্মাণের যুগান্তকারী বিস্ফোরণ—এক গণজাগরণ, যা মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছিল।

আর এই ঐতিহাসিক বিস্ফোরণকে সাহিত্যের শাশ্বত দলিল করে তোলার কঠিন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। ১৯৫৩ সালে তাঁর সম্পাদনায় বের হলো ভাষা আন্দোলনের প্রথম সাহিত্যিক স্মারক ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলন। এ কেবল একটি বই ছিল না, ছিল যেন বাঙালির আত্মপরিচয়ের ইশতেহার, প্রতিরোধের প্রথম সনদ। শহীদের রক্তে ভেজা মাটি থেকে উঠে আসা সেই স্বর যেন আজও কানে বাজে। তাঁর নিজের লেখা ‘অমর একুশে’ কবিতাটি ভাবুন, যেখানে এক মায়ের ব্যক্তিগত শোক, সন্তান হারানোর হাহাকার যেন আশ্চর্য শিল্পগুণে রূপান্তরিত হয়েছিল জাতীয় জাগরণে, সামষ্টিক প্রতিবাদে। কবিতার প্রতিটি ছত্রে তিনি বুনে দিয়েছিলেন শহীদের রক্তের ঋণ পরিশোধের এক অলঙ্ঘনীয় অঙ্গীকার। 'আম্মা তারে ভোলেন নি' বা 'আমরা কি ভুলতে পারি'—এই পঙ্‌ক্তিগুলো শুধু কিছু আবেগতাড়িত কথা ছিল না; এ যেন ছিল বাঙালির ভবিষ্যৎ স্বাধিকার সংগ্রামের ভিত্তিপ্রস্তর। ব্যক্তিগত শোককে কীভাবে সামষ্টিক প্রতিরোধের শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায়, হাসান তাঁর কাব্যে সেই জাদুকরী প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেছিলেন। বুকের গভীরে জমাট বাঁধা সেই শোক, সেই বিষাদকে তিনি যেন জননীর মাতৃরূপের মতোই ভালোবাসায় ধারণ করে, তাকেই প্রতিবাদী সত্তায় বদলে দিয়েছিলেন।

চারিদিকে তখন এক উন্মত্ত সময়, যখন প্রতিটি নিঃশ্বাসই যেন স্বাধীনতার নতুন ইশতেহার। হাসান হাফিজুর রহমান সেই সময়টাকে ধরে রেখেছিলেন তাঁর কলমে। মনে পড়ে তাঁর সেই কালজয়ী উচ্চারণ:

“এখন সকল শব্দই
আমার নিশ্বাসের নাম স্বাধীনতা।
আমার বিশ্বাসের নখর এখন
ক্রোধের দারুণ রঙে রাঙানো
দুঃস্বপ্নের কোলবন্দি আমার ভালোবাসা
এখন কেবলই
এক অহরহ চিৎকার, হত্যা করো,
হত্যা করো, হত্যা করো।
হীনতম বিভীষিকার কালো দাগে মোড়া
বাংলার গর্জমান বাতাস
এখন আর কিছু বোঝে না।
এখন সকল শব্দের একটিই মাত্র আওয়াজ
অবিনাশী হুংকার।”

কে যেন বলছিল, প্রতিটি মানুষেরই নাকি একটি ভাষা থাকে, যা সে কেবল নিজের মতো করে বোঝে। কিন্তু সে সময়ে হাসান হাফিজুর রহমানের ভাষা ছিল সবার ভাষা, যা ধ্বনিত হয়েছিল লক্ষ কোটি বাঙালির হৃদয়ে। এই উন্মত্ত সময়ে যখন 'সকল শব্দই' এক 'অবিনাশী হুংকার' হয়ে উঠেছিল, তখনও তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন নতুন ভোরের ইশারা, নতুন এক 'অবাক সূর্যোদয়' যা মানুষের হাতেই জন্ম নেবে। তাঁর চোখে তখন ভেসে উঠছিল—

“কিশোর তোমার দুই
হাতের তালুতে আকুল সূর্যোদয়
রক্ত ভীষণ মুখমণ্ডলে চমকায় বরাভয়।
বুকের অধীর ফিনকির ক্ষুরধার
শহিদের খুন লেগে
কিশোর তোমার দুই হাতে দুই
সূর্য উঠেছে জেগে।
মানুষের হাতে অবাক সূর্যোদয়,
যায় পুড়ে যায় মর্তের অমানিশা
শঙ্কার সংশয়।”

এই কবিতাগুলো শুধু কিছু পঙ্‌ক্তি ছিল না, ছিল যেন একটি জাতির সম্মিলিত স্বপ্ন, ক্রোধ আর আশার প্রতিধ্বনি। তিনি বুঝেছিলেন, ভোরের শিউলি ফুল কুড়িয়ে মালা গাঁথার মতো ব্যক্তিগত সৌন্দর্যচর্চার দিন তখন শেষ। প্রয়োজন সম্মিলিত প্রতিরোধের, হৃদয়ের গভীরে জমাট বাঁধা ব্যথাকে উন্মূল করে এক নতুন পৃথিবী গড়ার। হয়তো তাই, যখন ব্যক্তিগত অভিমান বা দুঃখ কষ্টের কথা আসে, তখন যেন তার সুর পাল্টে যায়:

“অভিমানের শীতল আঁচে
পোড়াতে চাই দুঃখ কষ্ট ভুল
তুমি কেন পুড়ছো বলে
দূরের কষ্টে বিরহ মঞ্জুল
অভিমানকে আঁকড়ে ধরি
যৎসামান্য জড়াজড়ি
ভোরের শিউলি ফুল
কুড়িয়ে মালা গাঁথছো কেন
নিজকে নিজেই করে তুলছো
ব্যথিত উন্মুল”

এ যেন ব্যক্তিগত শোককে সামগ্রিকতার বেদীতে অর্পণ করারই এক শৈল্পিক ইঙ্গিত।

ষাটের দশকের গোড়ায়, ১৯৬৩ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বিমুখ প্রান্তর’ যেন বাংলা কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের সেই উত্তাল আবেগ আর সম্মিলিত স্বপ্নের ঘোর থেকে তিনি যেন দৃষ্টি ফেরালেন সদ্য জেগে ওঠা নগরজীবনের রুক্ষ বাস্তবতার দিকে, মধ্যবিত্তের গভীরে লুকিয়ে থাকা অস্তিত্বের সংকটগুলো উন্মোচন করলেন। ভাবুন তো, সে সময়ে কেমন ছিল ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো শহরগুলো? গ্রাম থেকে উঠে আসা মানুষেরা নতুন এক যন্ত্রসভ্যতার মুখে পড়ে কেমন দিশাহারা হয়েছিল? দার্শনিকেরা যে বিচ্ছিন্নতাবোধ বা শেকড়হীনতার কথা বলেন, সেই অনুভব যেন ‘বিমুখ প্রান্তর’-এর পাতায় পাতায় প্রখরভাবে ধরা পড়েছিল। গ্রামীণ ঐতিহ্যের স্নিগ্ধতা আর যান্ত্রিক সভ্যতার নির্মমতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মধ্যবিত্তের যে দোলাচল, সেই আত্মদ্বন্দ্ব কবি তুলে ধরেছেন অসামান্য দক্ষতায়। এ যেন নিজেরই ভেতরের এক সুর, যা কেবল ব্যক্তিগত থাকে না, হয়ে ওঠে সমষ্টির।

মনে পড়ে যায় তাঁর ভেতরের সেই দহন, সেই ব্যক্তিগত অনুভবের কথা, যা হয়তো সে সময়ে বহু মানুষেরই মনের কোণে উঁকি দিচ্ছিল:

“তাহলে একাই ডুবি
মনে কোনো ইরেজার, ডিটারজেন্ট নাই
মধুকোষে স্মৃতি জমা তিক্ত ও মধুর
কেউ আলতো স্পর্শ দ্যায়
কেউ দ্যায় নিঠুর ছোবল
মধ্যিখানে পড়ে বড্ড বিপদেই আছি।
শান্তি স্বস্তি ন্যূনতম কপালে জোটে না
অনুভূতি সংবেদেরও লাজলজ্জা নাই
তারা সুযোগমত আচ্ছাসে ঠোকরায়
বিপদসঙ্কুল এই গহিনে বিষাদমগ্ন
দিন যায় রাত যায় আসলে কি যায়?
নাকি আরো দীর্ঘতর দুর্বহ বোঝার মত
শক্তিমান ঘুণপোকা কুরে কুরে খায়
ভেবেছি একাই আমি ডুবে মরবো
দ্বন্দ্বে ক্ষরণে দীঘলা প্রেম যমুনায়”

একদিকে যেমন এই আত্মিক দহন, অন্যদিকে তখন এক 'গুপ্ত পরাজয়'-এর সুর যেন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। নতুন রাষ্ট্রের মোহভঙ্গ, আশাহত মানুষের দীর্ঘশ্বাস... বহু আবেগ খরচ করে, বহু স্বপ্ন বুনেও যেন 'ফল কিন্তু মেলেনি কিছুই'। শূন্যতাও যে একরকম প্রাপ্তি, এই আপ্তবাক্য দিয়েও হয়তো তখন মনকে বোঝানো যেত না। পূর্ণতার দেখা মিলবে, রহস্যের গোপন দরজা খুলে যাবে—এইসব ভরসা, এইসব আশা তখন দুঃস্বপ্নেরই নামান্তর মনে হয়েছিল। ভাটিদেশের নদী যেমন ভরাট হয়ে যায়, নাব্য কমে যায়, মানুষের দগ্ধ মনও তেমনি খাঁ খাঁ শূন্যে একা এতিমপ্রতিম হয়ে ওড়ে। মানুষ, যাদের ডানা নেই, থাকলে হয়তো গ্রহান্তরে চলে যেত ঠিক। এই যে অস্ফুট আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নৈরাশাপীড়িত হয়ে মনুষ্যমণ্ডল কেবল ক্ষুদ্রতারই চর্চা করে, এগোনোর কথা বলে সভয়ে পেছোয়—এই বাস্তবতাকে হাসান দেখেছেন গভীর বেদনায়। 'অমৃতপুত্রের এই বালখিল্য পরাজয় কতটা শোভন সিদ্ধ'—এই প্রশ্ন যেন চরাচরে আজও দোল খায়, আর প্রেতায়িত প্রতিধ্বনি ছাড়া কোনো উত্তর মেলে না।

অনেকে হয়তো টি. এস. এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্টল্যান্ড’ কাব্যের সঙ্গে ‘বিমুখ প্রান্তর’-এর তুলনা করতে পারেন, যেখানে ইউরোপীয় আধুনিকতার ক্লান্তি আর নৈরাশ্য ফুটে উঠেছে। কিন্তু হাসান হাফিজুর রহমানের 'বিমুখ প্রান্তর' কোনো অন্ধ অনুকরণ ছিল না; এ ছিল আমাদের নিজস্ব মাটির গল্প। রাজনৈতিক পরাধীনতা, আর্থ-সামাজিক বঞ্চনা থেকে উৎসারিত এক নিজস্ব রুক্ষতার প্রতিচ্ছবি। এখানে হতাশা ছিল ঠিকই, কিন্তু তা পালিয়ে বেড়ানোর মতো কিছু নয়। বরং এ ছিল বাস্তবতাকে নির্মোহভাবে চিনে নেওয়ার এক নির্মম শৈল্পিক প্রয়াস। এই সময়েই হয়তো তাঁর মনে হয়েছিল, পরিচিত মানুষের অভ্যন্তরেও লুকিয়ে আছে অচিন কোনো সত্তা, যা লতাগুল্মের মতো মায়া বাড়ায়, অথচ যাকে কোনোদিনই জানা যায় না।

“চিরচেনা যে মানুষ তারই অভ্যন্তরে
পাকাপোক্ত বসতি গেড়েছে
অদেখা অচিন কেউ
লতাগুল্ম বাড়িয়েছে মায়া
কোনোদিনই জানি নাই তারে
মনকে সে মওকামত চোখ ঠারে
সন্তর্পণে চাপাকণ্ঠে হুমকিও দেয়
‘গুম’ করবে, বর্তমানে যেমন চলেছে
অচিনা শত্রুর বড্ড বাড় বাড়ছে
নিয়ন্ত্রণে নাগালে সে নাই
ন্যূনতম প্রতিকার কোথা গেলে পাই
হারাই চেতনা দিশা
কবে লুপ্ত অমানিশা
তার কোনো আলামতও এক্ষণে দেখি না
বিপাকে পড়েছি সাঁই
কিছুটা সুলুক দাও যাবো কোন্ ঠাঁই
আভাস ইঙ্গিত কিছু দৃশ্যমান আপাতত নাই
আঁধারে বিপদে পড়ে সূত্র হাতড়াই…”

এ যেন ব্যক্তি ও সমাজের সেই দ্বান্দ্বিকতা, সেই অচেনা শক্তি যা মানুষকে দিশাহারা করে তোলে, যার কোনো প্রতিকার ন্যূনতম নাই।

দার্শনিক দিক থেকে হাসান হাফিজুর রহমান ছিলেন এক গভীর মানবতাবাদী। তাঁর কাছে সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদ কোনো শুষ্ক তত্ত্ব বা নিছক রাজনৈতিক বুলি ছিল না; ছিল শোষিত মানুষের প্রতি এক গভীর ভালোবাসা আর দায়বদ্ধতা। মার্কসীয় দর্শন তাঁর কাছে কেবল শ্রেণীসংগ্রামের সূত্র ছিল না, ছিল মানুষের মুক্তির এক শিল্পিত পথ। সাহিত্যে যে ‘সমালোচনামূলক বাস্তববাদ’ আর শ্রমজীবী মানুষের ‘শ্রেণি-চেতনা’র কথা বলা হয়, হাসানের কাব্যে তার এক নান্দনিক ও মানবিক রূপায়ণ ঘটেছিল। তিনি শোষিত, নিপীড়িত ও প্রান্তিক মানুষের পক্ষে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন, তাদের দুঃখ-কষ্ট আর স্বপ্নগুলোকে যেন নিজেরই করে নিয়েছিলেন।

তাঁর আন্তর্জাতিকতাবাদও ছিল এই মানবিক সাম্যবাদেরই এক স্বাভাবিক সম্প্রসারণ। ভিয়েতনামের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে শুরু করে আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী মুক্তি সংগ্রাম—পৃথিবীর যে প্রান্তেই মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই দেখেছেন, তিনি তাকে নিজের কবিতার বিষয়বস্তু করে তুলেছেন। এর ফলে তাঁর কবিতা কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের গণ্ডিতে আটকে থাকেনি, বরং ভৌগোলিক সীমানার ঊর্ধ্বে উঠে এক বিশ্বজনীন মানবিক সংহতির মহাকাব্যিক রূপ পরিগ্রহ করেছে। কার্ল মার্কসের সেই বিশ্বজোড়া শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যের আহ্বান, "দুনিয়ার মজদুর এক হও", হাসানের কাব্যে কোনো স্লোগান হিসেবে নয়, বরং গভীর মানবিক বেদনাবোধ আর সাম্যবাদী স্বপ্নের এক শৈল্পিক প্রকাশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।

কাব্যরীতি আর শিল্পশৈলীর দিক থেকেও হাসান হাফিজুর রহমান ছিলেন এক আশ্চর্য নীরব বিদ্রোহী। সে সময় যখন ছন্দ বা মাত্রাবৃত্ত-অক্ষরবৃত্তের এক বাঁধা ধরা নিয়ম ছিল, তখন তিনি সেই নিগড় ভেঙে গদ্যছন্দের এক সাবলীল, মেদহীন আর প্রত্যক্ষ প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন। যেন শব্দের ভেতরের স্বাভাবিক ছন্দকে তিনি মুক্তি দিয়েছিলেন। তাঁর শব্দচয়ন ছিল অত্যন্ত সচেতন, মাটির গন্ধমাখা। তাঁর কবিতায় চাঁদ, ফুল বা জ্যোৎস্নার মতো রোমান্টিক অনুষঙ্গের চেয়ে মাটি, ঘাম, রক্ত, ক্ষুধা আর শ্রমজীবী মানুষের জীবন অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তিনি যেন আমাদের চেনা পৃথিবীটাকেই তুলে ধরেছেন নিজস্ব এক চিত্রকল্পে।

চিত্রকল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে তিনি এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মিলন ঘটিয়েছেন, যা পাঠকদের একই সঙ্গে বিস্মিত ও চিন্তাশীল করে তোলে। একদিকে নগরের রুক্ষতা, বুর্জোয়া সভ্যতার পচন আর রাজনৈতিক ডামাডোল; অপরদিকে মা, মাতৃভূমি আর প্রিয়তমার প্রতি এক গভীর স্নিগ্ধ সমর্পণ—এই দুই বিপরীতমুখী চেতনার সহাবস্থান তাঁর কবিতাকে দিয়েছে এক অনন্য বহুমাত্রিকতা। ভাষার এই রুক্ষতা ও কোমলতার দ্বান্দ্বিক প্রয়োগ তাঁর কাব্যিক শৈলীকে সমকালীন অন্যান্য কবিদের থেকে আলাদা করে এক স্বকীয় উচ্চতায় স্থাপন করেছে। তাঁর কবিতায় যেন কঠিন বাস্তবতার পাশে এক মায়াময় স্বপ্নের বীজ লুকিয়ে থাকত।

সমকালীন আধুনিক কবিদের সাথে হাসান হাফিজুর রহমানের তুলনা করলে তাঁর এই স্বকীয়তা আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা কবিতার যে তিরিশি ধারা, যেখানে বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ কিংবা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মতো মহারথীদের দাপট ছিল, সেই ধারার প্রভাববলয় থেকে তিনি নিজেকে খুব সযত্নে মুক্ত করেছিলেন। তিনি যেন নিজের পথ নিজেই তৈরি করে নিয়েছেন।

জীবনানন্দ দাশের কাব্যে যে পরাবাস্তবতা আর মগ্নচৈতন্যের অতলস্পর্শী ডুব আমরা দেখি, হাসান হাফিজুর রহমানের কবিতাতেও সেই মগ্নতা আছে, কিন্তু তা জীবনানন্দের মতো সমাজ-বিচ্ছিন্ন বা ইতিহাস-বিস্মৃত নয়। হাসানের মগ্নচৈতন্য আবর্তিত হয়েছে সমাজ ও মানুষের মুক্তির স্বপ্নকে কেন্দ্র করে। তিনি যখন গভীরে ডুবেছেন, তখনো তাঁর দৃষ্টি ছিল সমাজের দিকে, মানুষের কষ্ট আর সংগ্রামের দিকে। অন্যদিকে, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্যে যে ধ্রুপদী গাম্ভীর্য আর তীক্ষ্ণ যুক্তিবাদ আমরা দেখি, হাসানের কবিতাতেও তার ছায়া রয়েছে। কিন্তু সুধীন্দ্রনাথের নৈরাশ্যবাদ তাঁকে ছুঁতে পারেনি। মার্কসীয় দর্শনের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা ছিল বলেই যুক্তিবাদী হয়েও হাসান ছিলেন প্রগাঢ় আশাবাদী। অন্ধকার রজনীর শেষে এক অনিবার্য নতুন ভোর আসবে—এই ঐতিহাসিক বস্তুবাদী বিশ্বাস তাঁর কাব্যের পরতে পরতে, প্রতিটি শব্দে ছড়িয়ে রয়েছে। এ যেন এক দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, যা মানুষকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়।

প্রেম আর নারীভাবনার ক্ষেত্রেও হাসান হাফিজুর রহমান ছিলেন এক অগ্রগামী ভাবুক। তাঁর কবিতায় প্রেম কেবল নর-নারীর দেহজ বা জৈবিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি নারীকে কেবল ভোগের বস্তু বা ‘অন্য সত্তা’ হিসেবে দেখেননি, যা আমাদের সমাজে এক দীর্ঘদিনের রীতি ছিল। তাঁর কাছে নারী ছিলেন জননী, জায়া এবং সর্বোপরি শ্রেণিসংগ্রাম ও জাতীয় মুক্তির এক অপরিহার্য ‘সহযোদ্ধা’। তাঁর প্রেমের কবিতায় তীব্র অনুরাগের পাশাপাশি মিশে আছে সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, এক নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন। বেঁচে থাকার এক দুর্নিবার অনুপ্রেরণা হিসেবে প্রেম তাঁর কাব্যে উপস্থিত হয়েছে, যেখানে প্রেমিকের হাত আর বিপ্লবীর হাত যেন একাকার হয়ে যায়, একই লক্ষ্যে পথ চলে। প্রেম এখানে শুধু ব্যক্তিগত আবেগ নয়, হয়ে উঠেছে সংগ্রামেরই এক শক্তি, এক আলোর উৎস।

তার কলম থেকে নিঃসৃত এক অন্যরকম প্রেমের কথা মনে পড়ে, যেখানে প্রেম যেন এক প্রজাপতি ডানা মেলে উড়ছে, এক আগুন হয়ে পুড়ছে, আর তার ভস্ম থেকে জন্ম নিচ্ছে নতুন এক সাহসী অঙ্কুর।

“প্রজাপতি ডানা মেলে উড়িতেছে প্রেম
সোপ্রানোর কণ্ঠে মুক্তি ভালোবাসা ফ্রেম
এই আমি না বুঝেই
আষ্টেপৃষ্ঠে তাতে জড়ালেম
প্রেম পোড়ে, অগ্নিই আরাধ্য তার
পুড়ে টুড়ে একাকার
ভস্ম থেকে হয়তো কোনোদিন
জন্ম নেবে সাহসী অঙ্কুর
সে ভরসা আঁকড়ে আজো বেঁচে আছি
ক্ষত চাটছে নীল ডুমো মাছি
অঙ্কুরের উদগম
আছো কী আদৌ কাছাকাছি?
নাকি বহু দূর?”

এই যে প্রেম পুড়ছে, আর তার ভস্ম থেকে নতুন অঙ্কুর জন্ম নেওয়ার ভরসা, এ কেবল ব্যক্তিগত প্রেম নয়, এ যেন এক সামগ্রিক মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রেমের কথাই বলে। এখানে প্রেম আর বিপ্লব এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছে, এক হয়ে স্বপ্ন দেখছে আগামীর।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ হাসান হাফিজুর রহমানের জীবন ও সাহিত্যের জন্য ছিল এক চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষা। সে সময়ে তিনি কেবল কলমের সৈনিকই ছিলেন না, তাঁর কবিতাগুলো ছিল দখলদার বাহিনীর বর্বরতার বিরুদ্ধে এক একটি শানিত অস্ত্র, মুক্তি সংগ্রামের অকাট্য কাব্যিক দলিল। তাঁর কলম গর্জে উঠেছিল মানুষের মুক্তির গান হয়ে।

সে সময়টাতে তিনি যেন বাংলার মাটির দুঃখ, আনন্দ আর প্রতিবাদকে এক নিবিড় মায়ার বাঁধনে গেঁথেছিলেন। শত শতাব্দীর অবগুণ্ঠিত আশা সেদিন যেন তাঁর কলমেই পূর্ণতা পেয়েছিল। ‘তোমার আপন পতাকায়’ শিরোনামে তাঁর একটি অসাধারণ কবিতা যেন সেই উত্তাল সময়েরই প্রতিচ্ছবি। সেখানে তিনি আহ্বান করেছিলেন—

“এবার মোছাব মুখ তোমার আপন পতাকায়।
হাজার বছরের বেদনা থেকে জন্ম নিল
রক্তিম সূর্যের অধিকারী যে শ্যামকান্ত ফুল
নিঃশঙ্ক হাওয়ায় আজ ওড়ে, দুঃখ ভোলানিয়া গান গায়।
মোছাব তোমার মুখ আজ সেই গাঢ় পতাকায়।”

এই মাটি, এই স্বদেশ, কত ক্রূর পদাতিকের পায়ের দাগ সয়েছে যুগে যুগে, কত অশ্বারোহী এসে খুরে খুরে ক্ষতময় করে গেছে এর কোমল পলি। কত লালসার লালামাখা ক্রোধে বন্দুক কামান আকাশ চিরেছে, আর বিদীর্ণ বুক নীল বর্ণ হয়ে গেছে এই বাংলাভূমি। ক্ষোভে আর লজ্জায় মুখ নত হয়ে গিয়েছিল। কবি সেই মুখ মোছাতে চেয়েছিলেন সেই শোকাক্রান্ত, ‘তোমার আপন পতাকায়’।
এই কাজে কাদের আহ্বান করেছিলেন তিনি?

“কে আসে সঙ্গে দেখ দেখ চেয়ে আজ
কারখানার রাজা, লাঙলের নাবিক,
উত্তাল ঢেউয়ের শাসক উদ্যত বৈঠা হাতে মাল্লা দল,
এবং কামার কুমোর তাঁতি। এরাতো সবাই সেই
মেহনতের প্রভু, আনুগত্যে
শানিত রক্তে ঢল হয়ে যায় বয়ে তোমার শিরাময় সারা পথে পথে।
দুহাতে সরায় দ্রুত শহরের জটিল পঙ্কিল,
মধ্যবিত্ত অনড় আবিল। একে একে সকলকে নামায় মিছিলে।
ডাকে আপামর ভাইবোন। একসাথে মিলে নিশ্ছিদ্র
বিশাল শিলাদৃঢ় পাহাড় বানায়।
সেই কোটি হাত এক হাত হয়ে
মোছাবে তোমার মুখ তোমার আপন পতাকায়।”

তাঁর কবিতায় দেখা দিয়েছিল এক অবিস্মরণীয় চিত্র: ‘সমস্ত শূন্যতায় আজ বিশুদ্ধ বাতাস বয়ে যায়/আকাশ চাঁদোয়া জ্বলে রাহুমুক্ত ঘন নীলিমায়।’ অকলুষ বাংলাভূমি যেন রাতারাতি আদিগন্ত তীর্থভূমি হয়ে ওঠে। ‘অন্তহীন মিছিলের দেশ,/সারি সারি মানুষের আকারে হলে মূর্তিময়ী/সমস্ত স্বদেশ আজ রাঙা রাজপথে।’ এই যে দিবাালোক হয়ে ফোটা প্রাঞ্জল বিপ্লব, সাত কোটি মুখের হাসিতে মৃত্যুর রঙিন তীর, শ্রেণীবদ্ধ মানুষের ভিড়ে শত্রুকে শেষ দেখা দেখার যে আকুলতা—এ সবই যেন এক দুঃসাহস চমকিয়ে তুলেছিল সেই ‘বরাভয় হিল্লোলিত তোমার আপন পতাকায়’। তিনি দেখিয়েছিলেন, এই স্বদেশ মিশে আছে কাজল দিঘির পাড়ে, কোকিলের মধুক্ষরা স্বরে, হরিৎস্বপ্নে ফুলে-ওঠা প্রান্তরের উর্বর আদরে, সিংহপ্রাণ গিরিবর্ত্মে এবং বঙ্গোপসাগরের আকুল অস্থিরতার তুমুল গভীরে। দিন-রাত্রি অগ্নিমুখ অশনির অশেষ অধীরে তিনি অনুভব করেছেন এই বাংলাকে।

“তুমি আছো আজো, ছিলে চিরকাল।
বিশ্বের সেরা সুন্দরী বলে লুটেছ প্রবাদের খ্যাতি
যদিও রত্নখচা তোমার সৌন্দর্য সেই অবিরত তোমারই হয়েছে কাল।
তোমাকে মুঠোতে ভরে আনন্দের ঝুমঝুমি
বাজাতে এসেছে যারা
সুকালের ভোজসভার ক্ষুধার্ত অতিথি
রক্ত নিয়ে মুখে ধিক্কারে ধিক্কারে পলাতক তারা,
আবহমান বাংলার বর্বরতম দখলদারও দেখ আজ
কুৎসিততম আঁধারে নির্ঘাৎ হবে লীন।
তুমি ছিলে অমলিন, আজো আছ অমলিন।
শত কোটি লাঞ্ছনার তিক্ত দাগ সারা দেহে সয়ে
আজো তুমি মাতা, শুচিশুদ্ধ মাতা সাত কোটি সংশপ্তক
সন্তানের অকাতর তুমি মাতা।
প্রেম অবারিত হবে বিজয়ের ধারাজলে, রৌদ্র, জোছনায়।
শত শতাব্দীর অবগুণ্ঠিত আশা পূর্ণ করে
মোছাব তোমায় মুখ তোমারই আপন পতাকায়।”

কিন্তু যুদ্ধ-উত্তর স্বাধীন বাংলাদেশে যখন রাজনৈতিক অবক্ষয়, দুর্নীতি, দুর্ভিক্ষ আর নতুন এক লুটেরা শ্রেণীর উত্থান ঘটল, তখন তাঁর কলম ধারণ করল স্বপ্নভঙ্গের এক তীব্র বেদনার সুর। স্বাধীন দেশ তো এমনটা হওয়ার কথা ছিল না! কিন্তু হাসান নীরব থাকেননি। তিনি হয়ে উঠেছিলেন সত্যের এক আপোষহীন উপাসক। কোনো শাসকগোষ্ঠীর স্তাবকতায় তিনি নিজেকে বিকিয়ে দেননি; বরং গণমানুষের পক্ষে তাঁর আজীবন অবস্থানকে তিনি আরও সুদৃঢ় করেছেন। তাঁর উত্তর-মুক্তিযুদ্ধ পর্বের কবিতায় তাই ধ্বনিত হয়েছে তীব্র শ্লেষ, রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি ধিক্কার আর হারানো মানবিক মূলবোধের জন্য গভীর শোক। এ যেন সেই 'গুপ্ত পরাজয়'-এর সুর যা আবারও ফিরে এসেছে, যেখানে 'খরচা হলো অনেক আবেগ। ফল কিন্তু মেলেনি কিছুই'। মানুষের দগ্ধ মন আবারও খাঁ খাঁ শূন্যে একা এতিমের মতো উড়ছে। আর সেই অচেনা শত্রু, সেই 'অদেখা অচিন কেউ' যেন আবারও 'লতাগুল্ম বাড়িয়েছে মায়া', যার 'ন্যূনতম প্রতিকার কোথা গেলে পাই', সেই প্রশ্ন আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

এমন এক সময়ে, যখন ক্ষত শুকিয়েও শুকায় না, কারণ আগুন নিভে গেলেও তার দহন কেবল একতরফা।

“ধোঁয়া উড়ছে ছাই উড়ছে
এক সময় নিভেছেও নীলাভা
ক্ষত কিন্তু শুকায়নি
কারণ সে ক্ষুধিত আগুনে
একমাত্র আমিই পুড়েছি
সর্বভুক আগুনের মায়া দয়া নাই
কও শুনি আছে কি তোমার?
মেটালে আক্রোশ
বিনিময়ে তোমার সন্তোষ
কতটা সে পেল
জানতে ইচ্ছে করলেও ঠিক
কারো কিন্তু সদুত্তর নাই।”

এই অমীমাংসিত প্রশ্ন, এই একতরফা পোড়া ক্ষত তাঁর কাব্যকে দিয়ে গেছে এক গভীর বিষাদ আর দৃঢ়তা।

একজন সৃজনশীল কবি হওয়ার পাশাপাশি সম্পাদক ও সংগঠক হিসেবেও তাঁর অবদান বাংলা সাহিত্যে চিরস্মরণীয়। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অ্যাকাডেমিক ও গবেষণামূলক কাজগুলোর একটি হলো তাঁর সম্পাদনায় ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র’ প্রকল্প। ১৬ খণ্ডের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কেবল সম্পাদনা ছিল না; এটি ছিল একটি সদ্য স্বাধীন জাতির ঐতিহাসিক বয়ান, তার শেকড় খুঁজে বের করার এক প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস। ফরাসি দার্শনিকেরা যেমন বলেন, মহাফেজখানা নাকি ক্ষমতার বয়ান তৈরির হাতিয়ার, কিন্তু হাসান হাফিজুর রহমান সেই মহাফেজখানা তৈরি করেছিলেন জনগণের ইতিহাসকে শাশ্বত রূপ দেওয়ার জন্য, তাদের সত্যকে তুলে ধরার জন্য। এর পাশাপাশি অনুবাদ ও সমালোচনা সাহিত্যের মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্যের আধুনিক চিন্তাধারার সাথে বাংলা সাহিত্যের মেলবন্ধন রচনায় তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। হোমার থেকে শুরু করে আধুনিক ইউরোপীয় সাহিত্যের নির্যাস তিনি অত্যন্ত সুচারুভাবে বাঙালি পাঠকের মননে সঞ্চারিত করেছিলেন, যেন দুই সভ্যতার মাঝে এক সেতু নির্মাণ করেছিলেন তিনি।

জীবনের সায়াহ্নে এসে হাসান হাফিজুর রহমানের কাব্যিক ও দার্শনিক চেতনায় এক গভীর রূপান্তর লক্ষ্য করা যায়। যৌবনের সেই উদ্দাম শ্রেণিসংগ্রামের স্লোগান আর নগরজীবনের কোলাহল থেকে তিনি ক্রমশ সরে আসেন এক প্রশান্ত মরমীবাদ ও মৃত্যুচেতনার দিকে। মানুষের অস্তিত্ব যে ক্ষণস্থায়ী, মহাকালের বিশাল পটভূমিতে তা কত তুচ্ছ, অথচ কত অর্থবহ—এই গভীর সত্যটা যেন তাঁর শেষ দিকের কবিতায় আরও প্রবল হয়ে ওঠে। জীবনের শেষবেলায় তিনি যেন হয়ে ওঠেন অত্যন্ত মিতবাক; শব্দের আতিশয্য আর অহেতুক অলঙ্কার বর্জন করে তাঁর কবিতা ধারণ করে এক ধ্রুপদী, ধীরস্থির গাম্ভীর্য। এই পর্যায়ে এসে তিনি যেন কেবল সমাজের সাথে নয়, কথা বলতে শুরু করেন অনন্ত শূন্যতা আর শাশ্বত সত্তার সাথে। জীবনের নশ্বরতা আর মহাকালের অসীমতার মাঝে এক দার্শনিক সেতুবন্ধন রচনা করে তিনি বাংলা কবিতাকে দান করেন এক নতুন আধ্যাত্মিক মাত্রা। এ যেন একাকী ডুব সাঁতার, যেখানে তিনি সন্ধান করেন অস্তিত্বের গভীরতম রহস্যের। তাঁর সেই যাত্রা যেন কোনো উত্তর খোঁজা নয়, বরং প্রশ্নগুলোকে আরও নিবিড়ভাবে অনুভব করার এক সাধনা।

এই পর্বেও যেন এক অদ্ভুত 'অমীমাংসা' থেকে যায়, যা কেবল এক ব্যক্তির নয়, যেন মহাবিশ্বেরই এক প্রশ্ন।

“ধোঁয়া উড়ছে ছাই উড়ছে
এক সময় নিভেছেও নীলাভা
ক্ষত কিন্তু শুকায়নি
কারণ সে ক্ষুধিত আগুনে
একমাত্র আমিই পুড়েছি
সর্বভুক আগুনের মায়া দয়া নাই
কও শুনি আছে কি তোমার?
মেটালে আক্রোশ
বিনিময়ে তোমার সন্তোষ
কতটা সে পেল
জানতে ইচ্ছে করলেও ঠিক
কারো কিন্তু সদুত্তর নাই।”

এই প্রশ্নগুলো হয়তো শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং এক মহাজাগতিক জিজ্ঞাসা হয়ে তাঁর শেষবেলার কবিতায় অনুরণিত হয়েছে, যেখানে পোড়া ক্ষত বা সন্তোষের হিসাব মেলা ভার।

হাসান হাফিজুর রহমানের সমগ্র জীবন ও সাহিত্যকর্ম কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সাহিত্যিক দলিল নয়, বরং তা বাঙালির লড়াই, সংগ্রাম আর আত্মপরিচয় নির্মাণের এক জীবন্ত মহাকাব্য। শিল্পের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ছিল সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতারই এক গভীর পরিপূরক সত্তা। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের হৃদয়ে যে আগুন জ্বলে, যে স্বপ্ন দানা বাঁধে, তা-ই কবিতার প্রাণ। আধুনিক বাংলা কবিতার ধারায় তাঁর স্থান কেবল একজন উত্তরসূরি হিসেবে নয়, বরং একজন অকুতোভয় পথপ্রদর্শক হিসেবে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

২০২৬ সালের এই দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়ে দাঁড়িয়েও তাঁর প্রাসঙ্গিকতা একটুও ম্লান হয়নি। কারণ, ধুলোবালি, ঘাম আর মানুষের নিত্যকার যন্ত্রণা থেকে সোনা ফলানোর যে জাদুকরী নান্দনিক শক্তি তাঁর কলমে ছিল, তা বাংলা সাহিত্যের আকাশে আজও এক শাশ্বত ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলছে। শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সত্য প্রকাশের অদম্য সাহস আর শিল্পের মোড়কে মহাকাব্যিক প্রজ্ঞার যে উন্মোচন তিনি ঘটিয়েছেন, তা তাঁকে কালের সীমানা অতিক্রম করে এক কালজয়ী আসনে চিরস্থায়ীভাবে অধিষ্ঠিত করেছে। স্বদেশ, সময় আর সমূহের এক অবিচ্ছেদ্য সমীকরণ রচনা করে হাসান হাফিজুর রহমান তাই কেবল ইতিহাসের অংশই হননি, তিনি নিজেই পরিণত হয়েছেন এক অনিবার্য ইতিহাসে। তাঁর কবিতার পাতায় পাতায় যে জীবনের স্পন্দন, সংগ্রামের তেজ আর ভালোবাসার আর্তি আমরা খুঁজে পাই, তা কি কেবল গতকালের গল্প? নাকি আজও সে আমাদের পথ চলার পাথেয় হয়ে প্রতি মুহূর্তে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলেছে? এই প্রশ্নটা পাঠকের মনে হয়তো রয়েই যায়, যেমন রয়ে যায় এক অমলিন স্মৃতির ছায়া।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।

১৫২ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন