সর্বশেষ

সাহিত্য

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ: সাহিত্য ও সংস্কৃতি

গাউসুর রহমান
গাউসুর রহমান

শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬ ৭:১৪ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
জীবনকে যদি যন্ত্রণা বলি, তার পার্শ্বচর হচ্ছে সংগ্রাম। আর এই দুইয়ের যোগফল প্রত্যাশা। প্রত্যাশার বৃহত্তর এবং বলিষ্ঠতর প্রতিশ্রুতি হচ্ছে- সাহিত্য, সঙ্গীত। আর তাই এটি পরীক্ষিত সত্য যে, আমাদের সাহিত্য ও সঙ্গীতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব সুদূর প্রসারী।

সামাজিক বস্তুনিষ্ঠতা সাহিত্যের, সঙ্গীতের মৌল উপাদান বলেই এটিই সম্ভব হয়েছে। আকাঙ্ক্ষা পূর্তির জন্য প্রয়াস আর তাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে উদ্দীপক, উত্তেজক প্রেরণা, প্রেরণাদায়ক ভাব-চিন্তা, যুক্তি  ও বুদ্ধি অভিব্যক্তি লাভ করে। ‘It fall thorns of life I bed! Shelly: ode to the west wind’ ইংরেজ কবি শেলির এই উদ্ধৃত্তিই বাঙালি কবি নজরুলের বৈদ্যুতিক অনুভূতির দ্বারে যন্ত্রণার উপলব্ধি, রক্তকণিকার স্পর্শে উজ্জীবিত। আর তাই বিদ্রোহী  নজরুল উপাধির আর একটু গভীরে মুক্তিযুদ্ধের চারণ কবি, যুগযন্ত্রণার পথিকৃৎ।

 শুধু কি নজরুল? ১৯২০ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে ‘'কারার ঐ লৌহ কপাট’ 'শিকল পড়া দল ', 'চল চল চল' প্রভৃতির  সুর ও আবৃত্তি জনগণকে উজ্জীবিত করেছিলো। যা কিনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্ব হিসেবে অনেকে মনে করেন। নজরুলের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন ডি. এল. রায়। তাঁর ‘ধনে-ধান্যে পুষ্পভরা’ কিংবা রবীন্দ্রনাথের 'বাংলার মাটি, বাংলার জল', ‘আমার সোনার  বাংলা’- দেশমাতৃকার মানুষের অনুভূতিতে তুলেছিলো কালবৈশাখীর ঝড়। জীবনানন্দ দাশের চিত্ররূপময় কবিতাগুলো কি আমাদের চেতনার বাইরে? অবশ্যই না। তাঁর কবিতার আঁকা প্রকৃতির অনুপম চিত্রাবলি কি আমাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে না? আর সুকান্ত! সুশান্তের শ্রেণিচেতনাতো মুক্তিযুদ্ধের চিরচঞ্চল আগ্নেয়গিরি, তাঁর ভাঙা চাঁদতো জীবনের সংকেত আকাঙ্ক্ষায় ভারী। যদিও নজরুল, ডি এল রায়, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ বা সুকান্তের কবিতা,  মুক্তিযুদ্ধের সমকালীন নয়। তবুও মুক্তিযুদ্ধে এসব কবিতা, গান আমাদের অনুপ্রানিত করেছে, উজ্জীবিত করেছে। একটি প্রশ্ন আমাদের ব্যস্ত করে তোলে, জাতীয়তাবাদী চেতনাকে সমুন্ন রেখে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে বিজয় সে বিজয়ের অনুপ্রেরণা, 
তার দীপ্ত  পদচারণা আমাদের সাহিত্যে খুব বেশি নেই কেন? কারণ একটাই সাহিত্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই সক্রিয় রাজনৈতি আন্দোলনে যোগ দেননি। যদিও ভাষা আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী উত্তরাধিকার আমাদের, তবুও ৬৬ থেকে ৬৯'-এর দুর্বার গণ আন্দোলনে অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র, রাজনৈতিক অরাজকতা যেভাবে চিত্রিত হয়েছে, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে আমরা ততোটা উদ্বুদ্ধ হইনি। আর এ সত্যটি তো অত্যন্ত স্পষ্ট যে, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস আগেও সমগ্র জাতি এমন একটি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা খুব একটা ভাবতে পারেনি। তবুও মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে আমাদের সাহিত্যে, সঙ্গীতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছিলো। যদিও এ যুগের ধারা খুব ক্ষীণ। ‘অনেক রক্ত দিয়েছি আমরা', 'আমার দেশের মান দেব না’’, 'বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে সেই জনতা’ ইত্যাদি প্রেরণাদায়ক গান আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রচিত। 

আনোয়ার পাশা, জহির রায়হানের কাছে আমরা কিছু মুক্তিসংগ্রাম ভিত্তিক সাহিত্যকর্ম পেয়েছিলাম। জহির রায়হান অবশ্য ভাষা আন্দোলন ৫২' এর একুশে ফেব্রুয়ারিকে অবলম্বন করে বেশ কিছু গল্প লিখেছিলেন, যেগুলি মুক্তিযুদ্ধের চিন্তার, স্বাধীনতার চিন্তার সহায়ক ছিলো। কবি সিকান্দার আবু জাফরতো মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত আগে ৬৮, ৬৯,৭০- এই তিন বছর মুক্তিযুদ্ধকে উপপাদ্য করে অনেক কবিতা, গান রচনা করেছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতা ও গানগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ ‘আমাদের সংগ্রাম চলবে, ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই।’ হতমানে অপমানে নয়,’ 'সুখ সম্মানে বাঁচবার অধিকার ঝাড়তে দাস্যের নির্মোক ছাড়তে অগনিত মানুষের প্রাণপণ যুদ্ধ চলবেই চলবেই, আমাদের চলবেই’,’ বাংলা ছাড়ো'- এইসব কবিতা, গান জাতির চৈতন্য শানিত করেছিলো। বিশ্বাসের উজ্জ্বল শরীরে পরানো অহংকারের শব্দমালা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছিলেন সৈয়দ আলী আহসান।১৯৭১-এর এপ্রিল মাসে কোলকাতার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় সৈয়দ আলী আহসানের ‘আমার প্রতিদিনের শব্দ’। এসময় এম আর আক্তার মুকুল 'আনন্দবাজার' এবং 'দেশ' পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বেশ কটি  প্রবন্ধ লেখেন। আইনজীবী গাজীউল হক মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক একটি বই লেখেন। প্রকাশনা সংস্থা মুক্তধারা ‘মুক্তিযুদ্ধ ও
বাঙালী স্বাতন্ত্রের দাবী বিষয়ে একটি সংকলন বের করে। এ সময় ভারতের বম্বের ‘Quest' পত্রিকা বাংলাদেশ সম্পর্কে  একটি বিশেষ সংখ্যা বের করে। ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর ফরাসি দৈনিক 'লা-মদ' পত্রিকা  বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে একটি ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে।

 মুক্তিযুদ্ধের পর  মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে বেশ কিছু গল্প, কবিতা, উপন্যাস, স্মৃতিচারণমূলক রচনা আমাদের দেশে প্রকাশিত হয়। শামসুর রাহমান ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’, ‘স্বাধীনতা তুমি' সহ বেশ কিছু কবিতা লেখেন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। তাঁর 'বিধ্বস্ত নীলিমা, ‘দুঃসময়ের মুখোমুখি’ কাব্যগ্রন্থের  কবিতাগুলো মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগ, রক্ত, আগুন , অশ্রুকে ধারণ করেছে।সৈয়দ শামসুল হক মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বেশ কটি উপন্যাস রচনা করেছেন। তাছাড়া শামস রশীদ এবং ইমদাদুল হক মিলনের বেশ কটি উপন্যাসে  মুক্তিযুদ্ধের ছাপ আছে।' রাইফেল - রোটি -আওরাত' মুক্তিযুদ্ধের ধারার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। তবুও স্বীকর্য যে, এখনো টলস্টয়ের ‘ ওয়ার এন্ড পীস' এর মতো কিংবা ‘ অল কোয়াইট অন দ্যা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’, ইলিয়া এলেন বুর্কের তিন বন্ধুর মতো কোনো উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে লেখা হয়নি । সৈয়দ শামসুল হকের 'পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটক  কিংবা  সেলিনা হোসেনের বস্তিকে নিয়ে লেখা উপন্যাস কিঞ্চিৎ হলেও ‘ওয়ার এন্ড পীসের’’ অভাব পূরণ করেছে। ইউসুফ শরীফও মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কিছু সার্থক  গল্প লিখেছেন। 

মুক্তিযুদ্ধের সময় সময় লেখা ‘ সোনা সোনা লোকে বলে সোনা’/  সোনা নয় তাতো খাঁটি? বলো যতো সোনা তাঁর চেয়ে খাঁটি আমার বাংলাদেশের মাটিরে  / আমার জন্মভূমির মাটি’, ‘ধন্য মানি জীবনটারে জন্মেছি এই দেশে’’,  ‘সালাম সালাম হাজার সালাম',’ পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেব্দংক লাল', ‘তীর হারা ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবরে', 'মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি', আমার এদেশ সব সব মানুষের’, ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা’  ইত্যাদি গান এবং এম আর আক্তার মুকুলের 'চরমপত্র’ আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধে অসম্ভব প্রেরণা জুগিয়েছে। এগুলোর আবেদন এখনো কম নয়। অন্যদিকে ‘প্রথম বাংলাদেশ  আমার শেষ বাংলাদেশ' গানটি মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ  ফল।  শামসুর রহমানের ‘মুক্তিযুদ্ধের কবিতা’’ কাব্যগ্রন্থটি  মুক্তিযুদ্ধের কবিতা নিয়ে রচিত  নির্মলেন্দু গুনের ‘মুক্তিযুদ্ধের কবিতাসমগ্র' গ্রন্থটি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কাব্যগ্রন্থ। বিভিন্ন কবির কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে চন্দন চৌধুরীর সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধের  কবিতা’’ শাহীন রেজা  সম্পাদিত ফজল শাহানুদ্দিনের ‘মুক্তিযুদ্ধের কবিতা’,  ড. আবুল হাসানাত সম্পাদিত 'মুক্তিযুদ্ধের কবিতা’, মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান  সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধের কবিতা’, জাফরুল আহসান ও জাকির আবু জাফর সম্পাদিত 'মুক্তিযুদ্ধের কবিতা' ইত্যাদি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কাব্যগ্রন্থ। এছাড়া রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কবিতায়ও ও মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ  এসেছে। কবি লেখেনঃ আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই/ আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি, ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে /এ দেশকি ভুলে গেছে সেই  দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়? বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসে। মাটিতে লেগে আছে রক্তের দাগ।’

মোহাম্মদ রফিক লেখেন:

“ অন্য জন্মে  আমিও কী
পড়ে ছিল চেরাগের মোড়ে  
ঝোপঝাড়ে, রাস্তায় বা ঢালে, 
পাশ কেটে চলে গেছি, তাই  
বা অনুহ্য প্রশ্ন যুগান্তরে ;
জাঁকে করে বলি বলা যায়;
বাতাসে বারুদ হাঁসফাঁস।’ 

শামসুর রহমান লেখেনঃ 
“তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা / তোমাকে পাওয়ার জন্যে/আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়? আর কতবার দেখতে হবে খান্ডবদাহ? তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা’, জসীম উদ্দীন কবির নিবেদন কবিতায় লেখেনঃ 'চোখের সামনে দোলনায় দেশের নিষ্ঠুর শাসনদাতা/ প্লাবনের চেয়ে-মারিভয় শতগুণ ভয়াবহ /নরঘাতীদের লেলিয়ে দিতেছে ইয়াহিয়া অহরহ/ আজিও যাহারা বাঁচিয়া রয়েছি , আজি-এ আশ্বাসে/ মানধর্মী ভাইয়েরা আসিয়া দাঁড়াবে কখনও প
পাশে’’,   সুফিয়া কামাল লেখেনঃ ন'মাস কেটেছে এ দেশের মাটি তাজা  তাজা খুনে সিক্ত হয়ে/ উর্বর হয়ে এসেছে লয়ে/মৌসুমী ফুল ধানের গন্ধ মিঠা সোনা রোদ বাংলাদেশে  /যাহারা আমার সেই আবেশে /ঘুমিয়ে পড়েছে আহা! ক্লান্তিতে। ' আল মাহমুদ তাঁর ‘বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে সাক্ষাৎকার’ কবিতায় লেখেন:  'নিরর্থক হাসি ছাড়া ১৯৭১ সালে বাঙালি কবিদের/ আর কি করার ছিল!/ ১৯৭১ সাল / আমি পালিয়ে এসেছি আমার দেশ থেকে /আমার স্ত্রী কোথায় আমি জানিনা /আমার বন্ধুরা / আছে কি নেই বেতারে সেই উদ্বেগ উচ্চারিত হচ্ছে/ বুদ্ধদেব, আপনার মুখ দর্শনের জন্য আমি এক বিদেশি / কুটনীতিকর / অনাহত বেহায়ার মতো ঢুকে গিয়েছিলাম।' আলাউদ্দিন আজাদ লেখেনও: ঝোপঝাড় মাঠবন প্রান্তরের। শরীরে জড়ানো সবুজ কাঁথায় /লেখো পুষ্পের বর্ণলিপিতে লেখো/লেখো আমি গড়ে তুলি গণতন্ত্র /’ আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ লেখেনঃ ‘যে সাহসী সে যুদ্ধে গেছে। যারা যুদ্ধে যায় তারা ফিরে আসেনা/’ আবুল হাসান লেখেনঃ ‘তবে নি আমার ভাই আজ /ঐ স্বাধীন পতাকা?/ তবে কি আমার বোন , তিমিরের বেদীতে উৎসব?’ নির্মলেন্দু গুণ লেখেনঃ ‘বারহাট্টায় নেমেই রফিজের স্টলে চা খেয়েছি । অথচ কী আশ্চর্য। পুনর্বার চিনি দিতে এসেও/ রফিজ আমাকে চিনল না /দীর্ঘ পাঁচ বছর পর পরিবর্তনহীন হয়ে গ্রামে ফিরছি।’ হুমায়ূন আজাদ লেখেনঃ 'বাংলার মাটির মতো ব্লাডব্যাংক আর নেই/এক বিন্দু লাল রক্ত/ দর্শবিন্দু হয়ে আয় সেই ব্যাংকে রাখার সঙ্গেই।' আহসান হাবীব, লেখেনঃ ‘শব্দের মালায় আমি তোমাকে গাঁথতে চাই-স্বাধীনতা/ তুমি/ ঘরে-নইরে তোমাকে গাঁথতে চাই স্বাধীনতা। তুমি / ঘরে-বাইরে,তোমাকে গাথতে চাই -স্বাধীনতা /ঘরে- বাইরে এমন উলঝ নুন নৃত্যে মেতে আছো, কি আশ্চর্য/আমার কলম /বুকের মধ্যে /তুমি/মনোহর শব্দমালা (স্বাধীনতা)।’ 

হেলাল হাফিজের “নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়” কবিতা  মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রেরণা যুগিয়েছে। । তাঁর কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে -’এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় /এখন যৌবন যার  মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।' আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তাঁর ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্যে প্রার্থনা’ কবিতায় লেখেনঃ ‘যুবকের বুকে ভালোবাসার মত আগ্নেয়াস্ত্র/ এক টুকরো খামারের জন্য/মেয়েরা শেফালির ঝুড়িতে আগুন চেপে ঘুরে বেড়ায়/ অথচ ওরা মা হতে পারত/ এবং আমার চিৎকার মাটির নূন্যতম শূন্যতায়/ যে সাহসী যুদ্ধে গেছে / যারা যুদ্ধে যায় তারা ফিরে আসে না/’ হেলাল হাফিজ লেখেন- 'কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে/আমি আর লিখব না বেদনার অঙ্কুরিত কষ্টের কবিতা’ (‘একটি পতাকা মেলে') মহাদেব সাহা লেখেন: 'আমি যখন মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি  তেরোশত নদী । গেয়ে ওঠে আমার সোনার বাংলা,/ (‘আমি যখন মুক্তিযুদ্দের কথা বলি’) আসাদ চৌধুরী লেখেনঃ তোমরা গেলে বাতাস  যেমন যায়/ গভীর নদী যেমন বাঁকা/ স্রোতটিকে লুকায় / যেমন পাখির ডানার ঝলক গগনে মিলায়।" (‘শহীদদের প্রতি’) কবি আরও লেখেনঃ ‘তোমাদের যা বলার ছিল /বলেছে কি বাংলাদেশ।’ (‘শহীদদের প্রতি’’) মুক্তিযুদ্ধের পর দেশে যখন দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শানিত হয়ে রফিক আজাদ লেখেনঃ ‘দৃশ্য থেকে দ্রষ্টা অবধি ধারাবাহিকতা খেয়ে ফেলে /পৃশ্য থেকে এটা অবটি ধারাবাহিকতা, খেরে ফেলে/অবশেষে খাবো: গাছপালা নদী-নালা/ গ্রাম-গঞ্জ, ফুটপাথ, নর্দমার জলের প্রপাত, / চলাচলকারী পথচারী, নিতম্ব-প্রধান নারী, /উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রীও মন্ত্রীর গাড়ী/ আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ।/ ভাত দে হারামজাদা, তা না হলে মানচিত্র খাবো।’’ (‘ভাত দে হারামজাদা’’)
হাসান হাফিজুর রহমান লেখেনঃ ‘আমার হৃদপিণ্ড  আমি আড়ালে লুকিয়ে রাখি, তার ধূকপূক আওয়াজ পারত পক্ষে শুনতে দিইনা/ঘাতক পড়েছে রক্ষকের শিরস্ত্রণে যা কিছু দামী/গুলির মুখে তাক করা/ একালটা’র সবটাই বুঝি' (‘সেতার কাজ করে যাক’)।

মুক্তিযুদ্ধ মধ্যবিত্তের জীবনে ছায়া ফেললেও মধ্যবিত্তরা যুদ্ধপরবর্তীকালে আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।  মুক্তিযুদ্ধ মধ্যবিত্তের চেতনার গুণগত পরিবর্তন করতে পারেনি। মূল্যবোধের উঠা-নামা ছাড়া মধ্যবিত্তের আর কী-ই বা দেখা গেছে। ‘রাইফেল-রোটি-আওরত’’ এর সুদীপ্ত শাহীন কিংবা ‘যাত্রার’ রায়হান  সে সাক্ষীই বহন করে। আনোয়ার পাশা পরিস্থিতি যাচাই করেছিলেন সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আর শওকত আলী যাচাই করেছিলেন তারও কিছুকাল পরে। সেজন্যে এক সময়ের রাজনৈতিক কর্মী রায়হান পরবর্তীকালে অধ্যাপক নেতৃত্বের আমন্ত্রণ পেয়েও  মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেননি। যদিও তিনি এজন্যে গ্লানি বোধ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর মধ্যবিত্তের চরিত্রের একটুও হের ফের হয়নি। তিনি তাঁর স্ত্রী পুত্রের নিরাপত্তার কথা ভেবেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ  করেননি। বলাবাহুল্য এখানে মধ্যবিত্তের  নিঃসঙ্গ চেহারাটি ফুটে উঠছে। মধ্যবিত্ত তখন সুযোগ পেলে গ্রামে গেছে, নয়তো শহরে আতঙ্কিত জীবন-যাপন করেছে, ক্রমাগত সংকটের কেন্দ্র থেকে পালিয়েছে। রশীদ হায়দারের 'খাঁচা', আমজাদ হোসেনের 'অবেলার সময়' তারই স্মৃতিবাহী। মাহমুদুল হকের ‘জীবন আমার বোন' সম্পর্কে একই কথা প্রযোজ্য। সুকান্ত চট্টোপাধ্যায় এর ‘জীবন-তরু’ অবশ্য এর উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।। ‘জীবন-তরু’'র শ্যামল বাবা-মাকে না জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যায়। কিন্তু আর ফেরে না। সেলিনা হোসেন অবশ্য অন্যরকম কিছু দিতে চেয়েছেন তাঁর কথাসাহিত্যে। কিন্তু তাঁর 'হাঙ্গর নদী গ্রেনেড' মধ্যবিত্ত জীবনের নয়। মোদ্দা কথা, মধ্যবিত্ত মুখোশকেই মুখ বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলেছে এখানে। সৈয়দ শামসুল হকের 'নিষিদ্ধ লোবান'-এর বিলকিস শেষ পর্যন্ত তার সামাজিক সংস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তার প্রতিশোধস্পৃহার প্রবলতা ও  পদ্ধতি-দুই-ই তার মৌলিক সামাজিক সংস্থান থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য করে। ব্যক্তির সেই অতিমাত্রিক ব্যক্তিক ভাবটি কোনো কাজেই আসে না। ‘নীল দংশন’ উপন্যাসে সৈয়দ হক নজরুল ইসলামের ব্যক্তি সত্তাটিকে বিস্তৃতি দিতে গিয়ে তার নিজের কাছেই অচেনা করে তুলেছেন । শ্রেণিচরিত্রকে তুলে ধরতে লেখক এখানে সক্ষমতা পরিচয় দেননি।আগের ‘রাইফেল রোটি আওরত’ আর পরবর্তীকালে ‘খাঁচা’, ‘বেলার অসময়’’, ‘জীবন আমার বোন’, ‘জীবন তরু’ ‘হাঙ্গর নদীর গ্রেনেড’ ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘নীল দংশন’, সবগুলোই পিছনে ফিরে দেখা। 


লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।

১৫৪ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন