ময়মনসিংহের রাজ রাজেশ্বরী ওয়াটার ওয়ার্কস বিলুপ্তির পথে, সংরক্ষণের দাবি
বৃহস্পতিবার , ৯ এপ্রিল, ২০২৬ ২:৩০ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী তাঁর স্ত্রীর নামে ১৮৮৯ সালে ময়মনসিংহ নগরীর বর্তমান সোনালী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের সংলগ্ন পৌর মার্কেটের পেছনে স্থাপন করেন রাজ রাজেশ্বরী ওয়াটার ওয়ার্কস।
কালের আবর্তে এটি বিলুপ্তির পথে; শত বছর প্রাচীন এই নিদর্শন সংরক্ষণের দাবী জানিয়েছে পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটি।
ময়মনসিংহ নগরীর বর্তমান সোনালী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের সংলগ্ন পৌর মার্কেটের পেছনে এর অবস্থান। মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী নগরীতে পানীয় জল সরবরাহের জন্য রাজ রাজেশ্বরী ওয়াটার ওয়ার্কস স্থাপন করেন।
যার নির্মাণকাল ১৮৮৯-১৮৯০ সাল। কথিত আছে, মহারাজের স্ত্রী স্বর্গীয় রাজ রাজেশ্বরী দেবী একবার কঠিন পীড়ায় আক্রান্ত হন। পীড়াটি ছিল দুরারোগ্য। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে পানীয় জল খেতে নিষেধ করা হয়। অবশেষে তিনি পানীয় জল পান না করেই মৃত্যুবরণ করেন।
মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী স্ত্রীর প্রতি গভীর ভালোবাসা পোষণ করতেন। স্ত্রীর স্মৃতিকে অমর রাখার লক্ষ্যে তিনি এই জনহিতকর কার্যটি সম্পাদন করেন। এটিই ছিল ময়মনসিংহ শহরে পানীয় জলের প্রথম যান্ত্রিক সরবরাহ কেন্দ্র। ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম তীরে এটি নির্মাণ করা হয়। নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করতে মোট সময় লাগে প্রায় এক বছর। নির্মাণে ব্যয় হয় তখনকার সময়ের প্রায় দেড় লাখ টাকা।
নির্মাণের পর প্রথম তিন বছর রাজা বাহাদুরের তত্ত্বাবধানে এটি পরিচালিত হতো। পরবর্তিতে ১৮৯৩ সালে এই ওয়াটার ওয়ার্কসের দায়িত্ব ময়মনসিংহ পৌরসভার উপর ন্যস্ত করা হয়। দীর্ঘ ৮০ বছর ময়মনসিংহ শহরে পানীয় জলের প্রধান সরবরাহ কেন্দ্র ছিল এই ওয়াটার ওয়ার্কসটি।
ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে পানি তুলে প্রথমে তা বিভিন্ন জলাধারে কয়েক দিন রেখে শোধন করা হতো। তারপর সেই পানি যান্ত্রিক উপায়ে পানির ট্যাংকে তুলে তা বিভিন্ন মহল্লায় সরবরাহ করা হতো। দীর্ঘদিন ধরে ওয়াটার ওয়ার্কসটি একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে এখানে দর্শনার্থীরা ভিড় জমান।
একাত্তরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই ওয়াটার ওয়ার্কসটির প্রয়োজনীয়তা কমে যায়। নগরীতে পানি সরবরাহের দায়িত্ব ন্যস্ত হয় জনস্বাস্থ্য বিভাগের “পঞ্চ জেলা পানি সরবরাহ পরিকল্পনা”-এর অধীনে।
যুগ যুগ ধরে রাজ রাজেশ্বরী ওয়াটার ওয়ার্কস সংস্কারবিহীন চরম অবহেলায় পড়ে থাকায় দিনদিন আগাছা জন্মে এবং ময়লা পড়ে, ফলে পুরাকীর্তির আদল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি। অথচ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে তা সহজেই পুরাকীর্তি নিদর্শন হিসেবে প্রজন্মের সামনে যথাযথভাবে তুলে ধরা যায়।
পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটি, ময়মনসিংহ অঞ্চলের সদস্য সচিব ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “পুরাকীর্তি জাতির ক্রমবিকাশের চাক্ষুষ ইতিহাস। যার মাধ্যমে প্রজন্ম জাতির ক্রমবিকাশের ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে। বাংলাদেশের রয়েছে পুরাকীর্তির ভাণ্ডার। যার একটি উল্লেখ্য ভাণ্ডার রয়েছে ময়মনসিংহ অঞ্চলে। কিন্তু দু:খজনক সত্য হলো, যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে আজ অতি মূল্যবান পুরাকীর্তি সমূহের অবস্থা জীর্ণ। যথাযথ দেখভাল না থাকায় পুরাকীর্তি সমূহ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় চলতে থাকলে দিনদিন পুরাকীর্তির ভাণ্ডার কমে যাবে।”
তিনি শতাব্দী প্রাচীন রাজ রাজেশ্বরী ওয়াটার ওয়ার্কস-টি পুরাকীর্তি নিদর্শন হিসেবে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক সংরক্ষণ করার জোর দাবী জানান।
১২৪ বার পড়া হয়েছে