সড়ক নির্মাণে বড় অনিয়ম: রাতারাতি পিচ কার্পেটিংয়ের বদলে মাটি দিয়ে ভরাট
বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১:০২ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি সড়ক নির্মাণকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আড়াই মিটার প্রশস্ত সড়কের অনেকাংশ ফাঁকা রেখে পিচ কার্পেটিং করার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা।
বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। পরে ফাঁকা থাকা অংশ রাতারাতি মাটি দিয়ে ভরাট করার ঘটনাও সামনে এসেছে। এছাড়া নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়কের পিচ হাতের টানেই উঠে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার নয়াগোলা থেকে মহাডাঙ্গা হয়ে আলীনগর রেলগেট পর্যন্ত ৫.৩ কিলোমিটার সড়কের পুনর্নির্মাণকাজ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। পিচ কার্পেটিং ও ব্লক নির্মাণসহ এ সড়কের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ২ কোটি ৮৯ লাখ ৪৭ হাজার ৩১১ টাকা।
স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী, পথচারী ও পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, গত সপ্তাহে সড়কের মহাডাঙ্গা থেকে আলীনগর রেলগেট পর্যন্ত অংশে পিচ কার্পেটিং করা হয়। তবে আড়াই মিটার প্রশস্ত সড়কের বিভিন্ন অংশ ফাঁকা রেখেই কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এ সংক্রান্ত ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোনার সৃষ্টি হয়। বিষয়টি নজরে আসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুলের।
পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল সড়ক নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলীর ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং নিয়ম মেনে কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন।
এদিকে, প্রথম ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ঠিকাদার দ্রুত ফাঁকা অংশ ঢাকতে উদ্যোগ নেয়। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) ও শনিবার (৪ এপ্রিল) দুই দিনে ৮ জন শ্রমিক দিয়ে সড়কের পাশ থেকে মাটি কেটে ফাঁকা জায়গাগুলো ভরাট করা হয়। শনিবার সরেজমিনে গিয়েও শ্রমিকদের এই কাজ করতে দেখা যায়।
অন্যদিকে, মহাডাঙ্গা থেকে আলীনগর রেলগেট সড়কের একাধিক স্থানে কাজ শেষ হওয়ার মাত্র দুই দিনের মধ্যেই পিচ উঠে যেতে দেখা গেছে। শনিবার সকালে হাজির মোড় ও মহাডাঙ্গা রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় স্থানীয় তরুণরা হাত ও পায়ের চাপে সড়কের পিচ উঠিয়ে দেখান।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আলিম বলেন, “অনেকে বলছে, রাস্তাটি পুলসিরাতের চেয়েও চিকন হয়ে গেছে। এক পাশে রেললাইন, অন্য পাশে ডোবা-গর্ত। আগের তুলনায় সড়কটি কম প্রশস্ত করা হয়েছে। অনেক জায়গায় ফাঁকা রেখেই কাজ শেষ করা হয়েছে।”
কলেজছাত্র ইয়াসির আরাফাত বলেন, “প্রথমে ফাঁকা রেখেই কাজ শেষ করা হয়েছিল। পরে সমালোচনা শুরু হলে পাশ থেকে মাটি এনে ঢেকে দেওয়া হয়। এলজিইডির কর্মকর্তারা জানার পরও কোনো ব্যবস্থা নেননি। কাজের মান খারাপ দেখে আমরা কাজ বন্ধের দাবি তুললেও তা করতে দেওয়া হয়নি।”
একজন স্থানীয় মুদি দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “পিচ করার এক-দুই দিনের মধ্যেই হাতের চাপে উঠে যাচ্ছে—এটা কীভাবে সম্ভব, তা বোধগম্য নয়। এমপি নিজে ফোন করে কাজ ঠিক করার কথা বললেও তা মানা হয়নি। কোটি টাকার রাস্তা যদি এভাবে নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে এমন কাজের প্রয়োজন কী?”
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও নির্বাহী প্রকৌশলী। ঠিকাদার সেলিম রেজা বলেন, “কাজের মান ঠিক রয়েছে। অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। জনগণ কী বলছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি ঢাকা থেকে এলে সরেজমিনে দেখাতে পারবেন।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী তৌফিকুল ইসলাম বলেন, “সড়কের প্রস্থ আড়াই মিটার হলেও রোলার চালানোর সময় কিছু জায়গায় তা বেড়ে যায়। আমি পরিদর্শনে গিয়ে ঠিকাদারকে ফাঁকা অংশ মেরামতের নির্দেশ দিয়েছিলাম, তারা তা করেছে। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিম্নমানের কাজের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পিচ কার্পেটিংয়ের কাজও ভালো হয়েছে।”
১১৯ বার পড়া হয়েছে