দ্রোহী কথাশিল্পী আব্দুর রউফ চৌধুরী তোলপাড় করা এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর, এক ভিন্ন ঘরানা
রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬ ৭:২৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী আব্দুর রউফ চৌধুরী (১৯২৯-১৯৯৬) আধুনিকোত্তর বাংলা সাহিত্যের দ্রোহী কথাসাহিত্যিক। তিনি সনিষ্ঠায় ও মনস্বিতায় অতুলনীয়—তাঁর সাহিত্য চর্চা ও পাঠের মধ্য দিয়ে একজন বাঙালি ক্রমাগত চেতনা ও মননে জাগরিত হয়ে উঠতে পারে।
বস্তুত, তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্য জগতে দ্রোহী কথাসাহিত্যের নির্মিতি ও মর্মাংশে এক শুদ্ধ আধুনিকোত্তরক। যুগাত্মক জটিল চেতনাপ্রবাহী আঙ্গিকে তিনি ছিলেন চূড়াবিহারী এবং বিষয়-বাস্তু-ঘটনাও অতিশয় কালচৈতন্যবাহী ও বিস্ময়সূচক। অথচ অনন্য সাধারণ, স্বতন্ত্র সৃজনশীলতায় ঋদ্ধ এই দ্রোহী কথাশিল্পী কেনো যেনো বাংলাদেশের সাহিত্য আলোচনায় অতিঅল্প উচ্চারিত, ক্ষীণ তোলপাড় তোলা, আর তাঁর অবিনাশী সাহিত্য সম্ভারও কম পঠিত। সম্ভবত এই সময়কালের চতুর্দিকব্যাপী যে অবক্ষয়, তার প্রমাণ এটি।
তাই তাঁর সৃজনশীলতা, শিল্পশৈলী, ও কালচেতনার প্রতি ঐকান্তিকতা ও অভিনিবেশ গড়ে তোলার জন্য এবং ‘প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেবো তোমারই দ্রোহী শব্দাবলি’-এর অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়ে ২০১৮ সালে দেওয়ান আতিকুর রহমানের প্রচ্ছদে ছয়শত আটচল্লিশ পৃষ্ঠার বৃহৎ কলেবরে ‘আব্দুর রউফ চৌধুরী/রচনাসমগ্র’ প্রথম খণ্ড প্রকাশ করেছে ইত্যাদী গ্রন্থ প্রকাশ। এতে পাঠকমাত্রই উজ্জীবিত ও আরো অনুসন্ধিৎসু হয়ে উঠবেন, এমনটাই প্রত্যাশা করেন প্রকাশক। শুধু তাই নয়, সত্যিকার অর্থে পাঠকও পাঠ করার মতো পাবে এক ওজস্বল গ্রন্থ।
গ্রন্থের বিষয়সূচিতে আলোচ্য ‘নতুন দিগন্ত’-এর বিষয় ও শিল্পরূপ এবং কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ ও অগ্রণিত বিস্ময় নিয়ে আলোচনা করেছেন ড. মুকিদ চৌধুরী। এছাড়াও গ্রন্থে আব্দুর রউফ চৌধুরীর ৪৬৪ পাতা অর্থাৎ ২৯ ফর্মার অখণ্ড বৃহৎ উপন্যাস ‘নতুন দিগন্ত’ এবং ‘৭১-এর কবিতা ও কবিতাগুচ্ছও’ স্থান পেয়েছে। পরিশেষে সংযোজন করা হয়েছে আব্দুল মান্নান সৈয়দ-এর নতুন দিগন্ত সমগ্র (ভূমিকা), সালেহা চৌধুরীর নতুন দিগন্তের স্বপ্ন, পার্থসারথি চৌধুরীর উৎস বা শেকড়ের টান, খাদিজা আক্তারের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের যুগপৎ সম্মিলন, বর্ষা আহমেদের রাজনৈতিক ইতিহাস আর জীবনের গল্প ‘নতুন দিগন্ত সমগ্র’।
এই দ্রোহী কথাশিল্পীর ত্রিনয়নে ধরা পড়েছে অনেক অনাবাদী সাহিত্যের জমিন—বলতে গেলে সাহিত্যের সকল শাখায় সমানে কলম চালিয়েছেন। কোনো প্রকার কল্প-কৌটিল্য, অবান্তর কিম্বা অবাস্তব বিষয়ের উপর মেদী সাহিত্য তিনি রচনা করেননি। দূর প্রবাসে বসেও স্বভূমির মানুষ, তার রাজনীতি, অর্থনীতি, অভাব, যন্ত্রণাক্লেশ জীবন, অন্যায়-অনাচার-অস্বচ্ছতা এবং সকল বৈষম্যের বায়বীয় সমস্যার উৎস থেকে টেনে বের করেছেন শব্দশিল্পের অবারিত সুশাসনে। কোনো প্রকার আপোষ না ব্যক্তিজীবনে, না কলমজীবনে করেছেন। সমকালে অনেকটাই আড়ালে থেকে কালচেতনার গভীর দায়িত্ববোধের প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে গেছেন এই অমর কথাশিল্পী, যাঁকে নিয়ে জনপ্রিয় সময়ে বলতে গেলে আলোচনা করতে দেখা যায় না।
মাটির তিলক-রেখাকে আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম প্রাপ্তি বলে গণ্য করব এবং মাটির খুব কাছাকাছি থাকার বাসনায় তৃতীয়বারের মতো বাসা বাঁধব এখানেই। ...। [নাসিমের স্বগতোক্তি, উপন্যাস : নতুন দিগন্ত]
তিনটি খণ্ডে বিভক্ত নতুন দিগন্ত উপন্যাসে অনেক চরিত্রের মধ্যে নায়ক চরিত্র নাসিম তার মূল লক্ষ্য খুঁজে বেড়াচ্ছে। তাকে কেন্দ্র করে যে আখ্যান মঞ্জরিত হয়ে উঠেছে, সেখানে জুলফি আলি ভুট্টোও একটি প্রধান চরিত্র। আপাত প্রতিনায়ক নাসিমই এখানে নায়ক হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ কাহিনীর মধ্যে একটি জাতির জাগরণের পরোক্ষ ইতিহাস মুদ্রিত হয়েছে, আবার তার সঙ্গে আছে ব্যক্তির অন্তর্গত অজস্র টানাপোড়েন। ভুট্টোর ব্যভিচার পরিষ্কার রূপায়িত যেমন, তেমনি দ্বিতীয় খণ্ডের অনেকখানি ব্যয়িত হয়েছে ভুট্টোর দ্বিতীয় স্ত্রী নাহিদার সঙ্গে নাসিমের সম্পর্কের বর্তমান ও অতীত চারণায়। ভুট্টো ও নাসিম, দুজনেরই রাজনৈতিক জীবনকে যে ব্যক্তিজীবন অনেকখানি প্রভাবিত করেছে, তা দেখিয়েছেন লেখক।
প্রধান দুটি চরিত্র নাসিম ও ভুট্টো—এছাড়া আরও অনেক চরিত্রের উপস্থিতি আছে: আন্নী, বেনফরত, নূর মোহাম্মদ, আব্দুল্লা খুরো, ফারুক, পারভেজ, যতীন চক্রবর্তী, মতিন, অন্তার, জমাদারনি, লাল-ফিতেওয়ালিনী, মায়া, নাসিমা, আফরোজা, মখসুদ, নাহিদা, সালেহা, সুরাইয়া, মিস মরিয়ম, নজর মোহাম্মদ খান, আকরাম, খোদেজা, নবাবজাদা, খুরশেদ আহমেদ পাতৌদি, হেদায়েতুল্লা, মালতী, সাজেদা বেগম, গাফফার, খলকু খান, জামসেদ, আসলাম, রোকসানা, আজমান আলি, হায়দার জংগ, সুরতজান, নীলুফা, সারওয়ার, খসরু খান, নিয়ামতুল্লা, আইয়ুব খান, খোদাদাদ খান, ভিকারুননেসা, বিলকিস আহমদ, নাদিম শাহ প্রমুখ। প্রধান-অপ্রধান এই চরিত্রগুলো যেন জীবনতরঙ্গ থেকে উৎক্ষিপ্ত। এছাড়া এই চরিত্রগুলো সমাজের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
চরিত্র নির্মাণে লেখকের প্রধান হাতিয়ার সংলাপ। করাচির মুখ্য পটভূমিতে উপন্যাসটি স্বাভাবিকভাবেই উর্দু সংলাপের দিকে ঝুঁকে। কিন্তু বাংলা ভাষায় রচিত উপন্যাসে এটি অবিকল ব্যবহার সম্ভব নয়। উপন্যাসে বাঙালি নাসিমের প্রবেশের পরে প্রথমেই প্রসঙ্গটি আসে:
লাহোরের অদূরে ওয়াগারের সীমান্তরক্ষী পাকিস্তানি এক সেপাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল নাসিমের। সেপাই নাসিমকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুছি কোন হু?’ জবাবে নাসিম বলল, ‘মে পাকিস্তানি হ্যায়।’
এরপর নাসিম ক্রমে উর্দু ভাষা অনেকখানি আয়ত্ত করে। লেখক সংলাপের প্রয়োজনে উর্দু ব্যবহার করেছেন। প্রথম দুটি খণ্ড নানা জটিলতা ও নাটকীয়তায় ভরপুর।
পুরো উপন্যাসের মূল সুর দেশ ও জাতির সাধারণ সমাজকে ঘিরে, বিশেষ করে যুবশক্তিকে বিভ্রান্ত ও বিপদাপন্ন পথ থেকে উদ্ধার করতে হবে—তাদের রক্ষা করতে হলে অসুন্দর ও অসত্যের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিতভাবে বিপ্লবের পথে এগিয়ে নিতে হবে। তাদের শিক্ষা দিতে হবে আত্মদান, সাহসিকতা ও ভয়শূন্য মৃত্যু। মূলত পরাধীন ব্রিটিশ ভারতের অগ্নিযুগের বিপ্লবীগাথা ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আশ্রয় করে ঔপন্যাসিক সমাজ পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন। তবে উপন্যাস শুধু কাহিনীর সংকলন নয়; কাহিনীর ফ্রেম উপচে পড়াতেই তার অন্তিম সাফল্য। নতুন দিগন্ত উপন্যাসেও সেই সন্ধান আছে। বিশেষত নাসিমের সমগ্র চিন্তা ও প্রতিজ্ঞা নানা অনুচ্ছেদে প্রতিভাত হয়েছে। উপমা-উৎপ্রেক্ষার প্রয়োগ লেখকের দেশজতা ও ইতিহাসচেতনাকে উদ্ভাসিত করে, এবং বর্ণনার মধ্যে এরকম কথা ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে লেখকের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
‘নতুন দিগন্ত সমগ্র’-এর ভূমিকায় আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখেছেন: কে এই আব্দুর রউফ চৌধূরী? ২০০৩ সালে ‘পাঠক সমাবেশ’-এর বিজু সাহেব আমাকে পরদেশে পরবাসী বইয়ের প্রেসকপি দিলেন, তখনই এই প্রশ্ন জেগে উঠেছিল। সিলেটের অন্যান্য লেখকদের সঙ্গে পরিচয় থাকলেও আব্দুর রউফ চৌধূরীর নাম অশ্রুত ছিল। পরদেশে পরবাসী-এর ভিতরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে আমি এক অজানা অভিজ্ঞতার সঙ্গী হয়ে চলেছিলাম। বোঝা গেল—এঁর সঙ্গে সিলেটের অন্য কোনো লেখকের সাযুজ্য নেই। আব্দুর রউফ চৌধূরী এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর, এক ভিন্ন ঘরানা। নতুন দিগন্ত উপন্যাসটি তার প্রভাবিত জীবনের বহিঃপ্রকাশ।
পার্থ সারথি চৌধুরী মন্তব্য করেন: বিপ্লবীরা সম্ভবত ভূগোলে সীমাবদ্ধ নয়। ভারত-পাকিস্তান-বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এই উপন্যাসে বিস্তৃত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বাভাসও উহ্য থাকে না। শেখ মুজিবুর রহমান, আইয়ুব খান, গান্ধী, ইন্দিরাসহ অসংখ্য ঐতিহাসিক চরিত্রের সঙ্গে কিছু কল্পচরিত্রের সমাবেশে লেখক ইতিহাসের সূক্ষ্মতা তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে ভুট্টোর অন্ধকার জীবন কাহিনির মূল বিষয় হয়ে ওঠে। লেখক বিশ্বের বিভিন্ন মানুষের চরিত্র, উৎস ও শেকড়ের টানও দেন।
এ উপন্যাসে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রতিক্রিয়া হলো—“পরিকল্পিতভাবে পাকিস্তানি প্রেতাত্মরা এখনো চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পাকিস্তানি আদর্শের ধারকরা এখনো ক্ষমতায়। এজন্যই এই উপন্যাসটি আরও বেশি অবশ্যপাঠ্য। বাঙালির আত্মগৌরব, যা উপন্যাসের একটি স্পন্দমান বিষয়, এবং যা এখন হৃত, অপহৃত, তার পুনরুত্থান যারা চান, এই বইটি তাদের জন্য একটি বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।” [‘নতুন দিগন্ত সমগ্র’, ২০০৫]
বিশাল পৃষ্ঠাবহরে তিন খণ্ডের বৃহৎ উপন্যাস ‘নতুন দিগন্ত সমগ্র’-এর সঙ্গে তিনফর্মায় ‘৭১-এর কবিতা’ ও ‘কবিতা গুচ্ছ’ও ঠাঁই পেয়েছে। তাঁর কবিতায় ব্যাপৃত মুক্তিযুদ্ধ। ভারতবর্ষ বিভাজনের পরবর্তী সময় প্রবাহে বাংলাদেশের সচেতন কবি-সাহিত্যিকরা দ্বিধান্বিত হলেও তিনি ছিলেন পাকিস্তানবাদী জীবনভাবনা ও মূল্যবোধের বিপরীতে; পাকিস্তানবিরোধী ছিলেন তিনি সর্বক্ষেত্রে। তাঁর বিশাল সৃষ্টিজগতে (গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা ও অন্যান্য সাহিত্যাঙ্গনে) দেখা যায়, পাকিস্তানের প্রতি বিক্ষোভের অভিব্যক্তি। ষোলআনা তাঁর জীবন ও ভাবনাজুড়ে ছিল বাঙালি মূল্যবোধ। তাঁর কবিতায় সবচেয়ে বড় বিষয়, তিনি দেশকে, দেশের আত্মাকে ভালোবেসেছেন। এসব কবিতায় আছে বারুদের গন্ধ, ঘামের গন্ধ, রক্তের গন্ধ আর মুক্তির গন্ধ।
বাংলায় জানু পেতে বসেছে পাক-শয়তান, এবার
অস্ত্রাঘাতে ধ্বংস করে দিতে চায় নিখিল-অখিল বঙ্গ
স্বচ্ছ যৌবনধারী বাঙালি কী শূন্য হাতে নিশ্চুপে
আঙুল চুষবে, সেই ক্ষয়স্বপ্নে থাক তোরা বিভোর
[‘থাক তোরা বিভোর’]
কাব্য ভাবনা ও শিল্পনির্মাণে পরিণত রউফচেতনা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শিহরিত ও স্পন্দিত হয়ে ওঠে:
নূতন মানচিত্রের মাটির উপর চিত হয়ে
সে শুয়ে আছে, গ্রীষ্ম দুপুরের উন্মুক্ত
শ্যামপ্রান্তরে—কেউ নেই তার পাশে, শুধু
বিদেশি শকুনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার উপর...
[‘মানচিত্র’]
দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরীর কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ এভাবেই প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর চেতনারই পল্লবিত শব্দরূপ, রক্তাক্ত শব্দবহ্নিমালা। ইতিহাসের যে অনিবার্য গতিপ্রবাহ ঐক্যবদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের সফলতার ইঙ্গিত বহন করে, দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী তাঁর কবিতায় সেই মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার সমান্তরাল গৌরবময় ভূমিকা নির্মাণ করেছেন।
পাকিস্তানি শকুন দেখে
আমি ছটফট করি হে মুক্তিযুদ্ধ
আমার গলা শুকিয়ে চিতার কাঠ...
[‘শকুন’]
আবার, যুদ্ধদিনেও প্রেমের ছড়ি হাতঘুরোয় মুক্তির আনন্দে—সেই নন্দের কাছে কবি বলেন:
তবে প্রেম কী হে কমরেড
সুপ্রিয় কমরেড, প্রেমগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে
মুক্তির রণক্ষেত্রে, মুক্তির শবলাশে...
[‘সুপ্রিয় কমরেড’]
কবির মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং দেশের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা তাকে বারবার ফিরিয়ে আনে সমাজ, মানুষ আর তাদের দগ্ধ যুগ-যন্ত্রণাকে—তাই দ্রোহী শব্দে প্রকাশ করেন তিনি মুক্তির কবিতা।
অজর্ন বন্যায় শত্রুর নৌযান উলটে যায়, সঙ্গে সঙ্গে
উত্তেলিত শত্রু-পতাকা পূবালী পবনে হয় বিধ্বস্ত
সবুজ-নরম-তীব্র কুশিয়ারার তীরে শ্রমিক-কৃষক
হয় বাস্তববাদী, আকাশ-মাটির সঙ্গে কথা কয়
চুপিচুপি, পথিমধ্যে মিতালী পাতে জলের সঙ্গে...
[‘বাংলাদেশ’]
কিংবা
অলিতে-গলিতে, গ্রামে-গঞ্জে-হাটে
অফিসে আদালতে, কলে-খালে-ঘাটে
মুক্তিযুদ্ধ চলবেই চলবে
[মুক্তিযুদ্ধ চলবেই]
‘৭১-এর কবিতা’র কাব্যচিত্রে দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরীর দ্রোহী ভাবটি ফুটে উঠেছে তীব্রভাবে। দেশপ্রেম আর স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি বিশ্বস্ততাই তাঁকে দ্রোহী করে তুলেছে। অপরদিকে, ‘কবিতাগুচ্ছ’-এর মুখ্য উপাদান হয়ে ওঠে রাজনীতি ও প্রেম।
প্রেমিকের নাকে মদের গন্ধ—নারীর গন্ধ
কবিতার নৌকো ভেসে চলে জীবনসৈকতে
মেঘে-বজ্রে ঢেকে যায় সপ্তসিন্ধু-আকাশ
প্রেমিকা-চরণে বাজতে থাকে বিরতসঙ্গীত।
[একটি বাতাবিলেবু]
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশাত্ববোধ, গণআন্দোলন, অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষ জীবনদৃষ্টি তাঁর কবিতাকে করেছে বিশিষ্ট। রউফ চৌধুরীর কাব্যভাবনা, চেতনাপ্রবাহ ও জীবনদর্শন আর চিত্রকল্প-উপমা-রূপক-প্রতীক নির্মাণের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রতি ঘৃণা-ক্ষোভ-অবিশ্বাস-বাঁধাগ্রস্ত জীবনের স্রোত প্রকাশিত। তাই বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মফলের ফলাফল হয়ে ওঠেনি, তা রূপান্তরিত হয়েছে বাঙালীর জাতীয় জীবন ও মানসপটভূমির সমগ্রতায়। এটি পরিণত হয়েছে জাগৃতি, নির্মাণ এবং সৃজনকল্পনার রক্তিম ও সুদূরপ্রসারী সূচনাভূমিতে—এই তত্ত্ব যুগপৎভাবে একজন রউফকে শিল্পী ও শ্রমিকের সমান্তর মর্যাদায় অভিষিক্ত করে।
সাতষট্টি বছরের আয়ুষ্কালে দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী কখনোই সাহিত্যকর্ম বা লেখালেখিতে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেননি, ফলে তাঁর সৃজিত সাহিত্যজীবন কলমপেশা লেখকের মতো ধারাবাহিক ছিল না। তাঁর প্রায় সকল রচনায় মনের আনন্দকে বা ক্ষোভকে প্রকাশ করার ফসল। সামাজিক সংষ্কার, অর্থনৈতিক দুরাবস্থা, প্রবাসী জীবনযাপন এবং বৈচিত্রময় কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে দ্রোহী কথাসাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রকাশে তাড়িত করে।
এই শিল্পীর প্রথম প্রকাশিত (পত্রিকা ও সাময়িকীতে) একসাথে রচনা, প্রবন্ধ ও কবিতা। তিনি ক্রমে আধুনিকোত্তর বা সমকালীন বাংলা সাহিত্যের দ্রোহী কথাসাহিত্যিক হিসেবে স্বধর্মে প্রতিষ্ঠিত হন। বাংলা সাহিত্যের নানা শাখায় তিনি জ্যোতিষ্কের মতো বিচরণ করেন। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, অনুবাদ, গবেষণা, সম্পাদনা—বাংলা সাহিত্যের যে শাখাতেই হাত দিয়েছেন, ফলেছে সেখানে স্বর্ণফল। তাঁর সাহিত্যজীবনে ত্রিশের চেয়ে বেশি গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। পাণ্ডুলিপি, পত্র, পত্রিকা, সাময়িকীতে এখনো ছড়িয়ে আছে তাঁর অগ্রসরিত অনেক রচনা। শত প্রতিকূলতা, আর্থিক বিপর্যয়, চাকরিগত অনিশ্চয়তা এবং বৈরী পরিবেশ-প্রতিবেশ অতিক্রম করে আধুনিকোত্তর বাংলা সাহিত্যের বিকাশের ধারায় তিনি এক জ্যোতির্ময় প্রতিষ্ঠান—একথার সতত্য মেলে বিশেষজনদের কথায়।
ইতিহাসবিদ, গবেষক অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন: আব্দুর রউফ চৌধুরী ছিলেন পশ্চাৎপদ ধ্যান-ধারণার ঊর্ধ্বে মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন লেখক। খ্যতির মোহে নয়, বরং জনমনে অগ্রসর চেতনা সৃষ্টি ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের সমুন্নত রাখা ছিল তাঁর সাহিত্যসাধনার মূল প্রেরণা ও লক্ষ্য। যেহেতু তিনি সর্বক্ষণ একত্রীকৃত আলোকিত সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখতেন; ফলে তাঁর সৃষ্ট সমগ্র সাহিত্যকর্মেও এর প্রতিফলন ঘটেছে।
ফোকলোরবিদ শামসুজ্জামান খান মন্তব্য করেছেন: আব্দুর রউফ চৌধুরী একজন মহৎ মানুষ, বড় মাপের মানুষ ছিলেন।
ভাষাবিদ ও সাহিত্যিক ড. মনিরুজ্জামান বলেন: মানুষের প্রতি মমতা ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির প্রতি প্রবল ঘৃণা তাঁর জীবন ও সাহিত্যে এক মানবতাবাদী দর্শনে রূপ নিয়েছিল।
কবি মহাদেব সাহা বলেন: সততায় ও সৎজ্ঞানে এই সমাজের সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে, সমাজের কুকর্মের বিরুদ্ধে তাঁর মানব-দরদী মন বিদ্রোহ করেছে।
কথাশিল্পী সেলিনা হোসেনের মন্তব্য: তাঁর বাক্য-বচন, তাঁর বাক্য-গঠনের বিন্যাস ভিন্ন। এই দক্ষতা অর্জন করা একটি সহজ কাজ নয়।
ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন বলেন: মানুষের মঙ্গল কামনা আব্দুর রউফ চৌধুরী মানবিক দর্শন থেকেই গ্রহণ করেছিলেন—যা আমরা তাঁর রচনায় সবসময় দেখি।
শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক অধ্যাপক যতীন্দ্রদ্র সরকার প্রতিক্রিয়া হলো: আব্দুর রউফ চৌধুরী মানবতাবাদী মানুষ ছিলেন। মানুষের কল্যাণ চিন্তাই ছিল তাঁর অনুধ্যান।
সাহিত্যচর্চায় তাঁর উদ্দেশ্য ছিল মানুষের ভেতর থেকে জানা, তাঁর প্রকৃতিকে উপলব্ধি করা।
কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের কণ্ঠেও অভিন্ন সুর: তিনি বহু গুণে গুণান্বিত মানুষ ছিলেন।
এই গুণী ও মহৎ মানুষের সৃজনকর্ম সম্পর্কে যতো কম অপঠিত থাকবে, ততোই অমঙ্গল আমাদের জন্য।
কথাশিল্পী, কবি আব্দুর রউফ চৌধুরীর ত্রিনয়ন অতীত থেকে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ইতিহাসের ঘাতকদের বিরুদ্ধে ‘নেচার অব জাস্টিস’ চেয়েছিলেন—একারণে, প্রখরভাবে তার মনে, প্রজ্ঞায় দ্রোহের মন্বন্তর মৃত্যু অবধি প্রজ্জ্বলিত ছিল—এতোটাই, যে দেশ ও মানুষের প্রতি প্রগাঢ় প্রেম তাকে প্রবাস ছেড়ে স্বদেশে আসতে বাধ্য করে। তাইতো স্বজাতির, সমাজের এবং সাহিত্যের উন্নয়নে সর্বদা দ্রোহী শব্দের বীজ বুনেছিলেন এই মহামতি শিল্পী আব্দুর রউফ চৌধুরী। এই বীজ ফল-ফসল হয়ে সকল অসত্য, অন্যায়, অবিচার দূর করতে চেয়েছে—বলেই রউফ চৌধুরী আজ দ্রোহী এবং তাঁর এ দ্রোহ অনন্যমাত্রা ও উচ্চতায় পৌঁছে যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, নাট্যকার।
১৯৬ বার পড়া হয়েছে