সর্বশেষ

সাহিত্য

১৬ গুণীজনকে সম্মাননা

জাতীয় শিল্পকলা একাডেমিতে আব্দুর রউফ চৌধুরীর জন্মোৎসব

স্টাফ রিপোর্টার
স্টাফ রিপোর্টার

রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬ ৭:০২ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
‘প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দেব দ্রোহী শব্দাবলি’ স্লোগানকে সামনে রেখে দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরীর জন্মোৎসব ২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি-এর চিত্রশালা মিলনায়তনে এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।

দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী স্মৃতি পর্ষদের মহাসচিব কথাসাহিত্যিক শামস সাইদ-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমি-এর সভাপতি, বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক আবুল কাসেম ফজলুল হক।

অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কথাসাহিত্যিক মনি হায়দার।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিফাত বন্যা। এ সময় আব্দুর রউফ চৌধুরীর কবিতা আবৃত্তি করেন কবি সৌম্য সালেক ও মিথিলা শ্রাবন্তী। জীবনী পাঠ করেন এ এইচ এম হক বাপ্পী।

আলোচনা পর্ব শেষে দেশের ১৬ জন গুণীজনের মাঝে সাহিত্য পদক, স্মারক সম্মাননা ও প্রজন্ম প্রান্তিক সম্মাননা প্রদান করা হয়।

সাহিত্য পদক লাভ করেন কথাসাহিত্যিক রফিকুর রশীদ ও আকিমুন রহমান।

স্মারক সম্মাননা পান কবি ও প্রাবন্ধিক বীরেন মুখার্জী, আসাদুল্লাহ, গবেষক ড. শাফিক আফতাব এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক সোহেল মাজহার।

অন্যদিকে তরুণ সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে প্রজন্ম প্রান্তিক সম্মাননা অর্জন করেন আপন অপু (লক্ষ্মীপুর), আলমগীর মাসুদ (ফেনী), ইসরাত জাহান (পটুয়াখালী), কানিজ পারিজাত (ফরিদপুর), কামরুন্নাহার দিপা (মেহেরপুর), রাশেদ রেহমান (সিরাজগঞ্জ), শব্দনীল (বাগেরহাট), সালাহ উদ্দিন মাহমুদ (মাদারীপুর), সিদ্দিকী হারুন (হবিগঞ্জ) এবং সিরাজিয়া পারভেজ (সাতক্ষীরা)।

পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে নগদ অর্থ, ফুলের তোড়া, উত্তরীয় ও ক্রেস্ট তুলে দেন অনুষ্ঠানের অতিথিরা।

দ্রোহ ও মননের দীপ্তিতে অমর: আব্দুর রউফ চৌধুরীর সাহিত্যজীবন

জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী ক্ষুদ্র ব্যবধানই মানুষের আয়ুষ্কাল—কিন্তু জীবনের প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে থাকে তার সৃষ্টিতে, তার চিন্তায়, তার মানবিক দীপ্তিতে। এই সত্যের উজ্জ্বল প্রতিফলন দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী-এর জীবন ও কর্মে।

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ১লা মার্চ, শ্রীহট্ট অঞ্চলের শাখা-বরাক নদীর তীরবর্তী মুকিমপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। সময়ের হিসেবে মাত্র ৬৭ বছরের জীবন—কিন্তু সৃষ্টির পরিধিতে এক বিস্তৃত মহাকাব্য। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ—সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তিনি রেখে গেছেন স্বকীয়তার দীপ্ত স্বাক্ষর।

ফেব্রুয়ারি ও মার্চ—ভাষা ও স্বাধীনতার গৌরবময় দুই মাস—বাঙালির আত্মপরিচয়ের শিকড়। এই চেতনার আগুন, এই আত্মমর্যাদার উচ্চারণ তাঁর সাহিত্যজুড়েই প্রতিধ্বনিত। তাঁর রচনাবলিতে যেমন রয়েছে ইতিহাস-সচেতনতা, তেমনি রয়েছে জাতিসত্তার গভীর অনুসন্ধান।
‘প্রবন্ধগুচ্ছ’, ‘মহান একুশে’, ‘স্বায়ত্তশাসন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা’, ‘একটি জাতিকে হত্যা’, ‘১৯৭১’, ‘যুগে যুগে বাংলাদেশ’, ‘বাঙালির উৎস সন্ধানে’, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’—এসব গ্রন্থে তিনি ইতিহাস ও চেতনার মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।
অন্যদিকে ‘কবিতাগুচ্ছ’, ‘’৭১-এর কবিতা’ তাঁর অন্তর্গত আবেগ ও দ্রোহের ভাষ্য; আর ‘অনিকেতন’, ‘মা’, ‘নতুন দিগন্ত’, ‘পরদেশে পরবাসী’ প্রভৃতি উপন্যাস ও গল্পে ধরা পড়েছে মানুষের অস্তিত্বসংকট, সমাজবাস্তবতা ও অন্তর্জাগতিক টানাপোড়েন।

তিনি শুধু একজন লেখক নন—তিনি ছিলেন এক চিন্তার আন্দোলন। বাংলা সাহিত্যে দ্রোহী কথাসাহিত্যের নির্মাণে তিনি এক অনন্য আধুনিকোত্তর স্রষ্টা। তাঁর লেখার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে জটিল চেতনার ধারা, সময়ের স্পন্দন, আর বিস্ময়ের এক অনির্বচনীয় নান্দনিকতা। তাই তিনি শুধু তাঁর সময়ে নন—আগামী দিনেও বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে।

তাঁকে নিয়ে গুণীজনদের মূল্যায়নও সমানভাবে গভীর ও শ্রদ্ধাবান—
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন মনে করেন, তিনি ছিলেন পশ্চাৎপদতার ঊর্ধ্বে এক মুক্তবুদ্ধির লেখক।
শামসুজ্জামান খান তাঁকে আখ্যায়িত করেছেন এমন এক মনীষী হিসেবে, যিনি সারাজীবন সকল আবিলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন।
মনিরুজ্জামান তাঁর সৃষ্টিকে বলেছেন তীর্যক অভিজ্ঞতা ও মননশীলতার অনন্য সমন্বয়।
কবি মহাদেব সাহা তাঁর ভাষাশৈলীতে খুঁজে পেয়েছেন বঙ্কিমীয় ঐতিহ্যের প্রতিধ্বনি।
কেতকী কুশারী ডাইসন তাঁকে দেখেছেন সংগ্রামী এক সাহিত্যিক হিসেবে, যিনি প্রতিকূলতার ভেতর নিজেকে গড়ে তুলেছেন।
আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেছেন, চল্লিশের দশকের আধুনিকতার উত্তরাধিকার তিনি বহন করেছেন।
হাসান আজিজুল হক তাঁর বহুমাত্রিক প্রতিভার স্বীকৃতি দিয়ে তাঁর রচনার ব্যাপক মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছেন।
এবং সেলিনা হোসেন তাঁর লেখার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন।

সব মিলিয়ে, আব্দুর রউফ চৌধুরী এক অনন্য সাহিত্যভুবনের নির্মাতা—যেখানে দ্রোহ আছে, চিন্তার দীপ্তি আছে, আছে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তাঁর জীবন হয়তো সীমিত, কিন্তু তাঁর সাহিত্য—অসীম।

১৯৮ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন