সর্বশেষ

ফেবু লিখন

ফেলে আসা শেওড়াপাড়া, ফেলে আসা দিনগুলো...

মুকিত আহসান
মুকিত আহসান

শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:২০ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
সেই কবে... প্রায় সতের বছর আগে এক জুবুথুবু বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যায় বাসে করে এসে নেমেছিলাম এই শেওড়াপাড়ায়। অলিগলির পাকচক্রে পথ হারিয়ে, আবার পথ খুঁজে খুঁজে অবশেষে কাকভেজা হয়ে পৌঁছেছিলাম বন্ধুর মেসের দরজায়।

তখন এই প্রকাণ্ড মেট্রো স্টেশনের জায়গাটাতে কেবল একটা জীর্ণ ফুটওভার ব্রিজ, আর রাস্তার মাঝ বরাবর (এখন মেট্রোরেল লাইন) যতদূর চোখ যায়, সারিবদ্ধ সৈনিকের মতো গাছ, বেশ বড় বড় সাইজের গাছ। শহরের গাছের প্রতি বরাবরই আমার আলাদা একধরনের ফ্যাসিনেশন কাজ করত; এখনও করে; কিছুটা করুণাও! এমন যে, যারা একদা এই সমস্ত চরাচর জুড়ে বিস্তীর্ণময় ছিল, এ মাটির প্রতিটি ইঞ্চি ছিল যাদের শিকড়-বাকড়ের দখলে, যাদের নির্বিচারে উজাড় করে এই নগরায়ণ; সেই পূর্বসূরিদের অস্তিত্বের স্মারকটুকু যেন বইছে আজকের এরা; কী নির্মম প্রহসন।

তখনও শেওড়াপাড়াতে আলো ছিল, কিন্তু সে আলোর এত ঝলকানি ছিল না; সোডিয়াম বাতির হলদেটে আলোর আশেপাশে আবছায়ার জন্য কিছুটা হলেও জায়গা থাকত; সেই আবছায়ার দিকে চোখ মেলে নিজের সঙ্গে একা হয়ে অন্তর্গত বিষাদগুলোকে নাড়াচাড়া করা যেত; আর এখন! এত আলোর প্রাচুর্য যে, একটা সূঁচ হারালেও খুঁজে পেতে দৃষ্টিকে তীক্ষ্ণ করতে হবে না মাইরি!!

এক যুগেরও বেশি এই মহানগরের নাগরিক ছিলাম, যার সিংহভাগটাই কেটেছে এখানে। এ পাড়ার রাস্তা, অলিগলি, টং দোকানে পড়ে আছে আমাদের কত দিবারাত্রির স্মৃতি, বিচিত্র হাসি, গল্প, নিরবতা আর দীর্ঘশ্বাস। তখন আমরা সবাই প্রেমিক, তখন আমরা সবাই বেকার, অথচ প্রেমিকাদের বিবাহের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে, বাড়িতে সুপাত্রের আনাগোনা, প্রেমিকারা অধৈর্য, একটা কিছু কর!

প্রেমিকার কাছ থেকে নিজেদের হারিয়ে ফেলার ভয়ে আমরা চিন্তিত হই, আমরা অস্থির হই, আমাদের হৃদয়ে বিরহ আসে; সেইসব বিরহের উদাস ক্ষণে একটা আস্ত সিগারেট কিনে বন্ধুর হাতে তুলে দিয়ে সচেতন হৃদয়ে অপেক্ষা করি, অর্ধেকটা খেয়ে কখন আমাকে দেবে; আমরা সন্ধ্যায় আলুপুরি খাই, এবং আবিষ্কার করি যে, রঙ চায়ে আলুপুরি ভিজিয়ে খেতে আরও চমৎকার; সেই চমৎকারের আঘাতে আমাদের বিরহ দুর্বল হয়ে পড়ে।

তারপর একদিন কারো প্রেমিকা সত্যিই কোনো সুপাত্রের হস্তগত হয়ে গেলে আমরা বন্ধুর প্রেমাহত কাতর হৃদয়ে হাত বুলোই, বলি, ভাত খা, পেট ভরে ভাত খা, পারলে মাংস দিয়ে খা, যত টাকা লাগে দেব! রাতেই মেসে রান্না হয় খিচুড়ি, আর মেসের ১০ জনের ঢাউস সাইজের কড়াইতে হাফ কেজি গরুর মাংস। খেতে খেতে বলি, বিরহের গালে এর চেয়ে বড় থাপ্পড় আর হয় না!!

কখনও পরিযায়ী পাখির মতো উড়ে গেছি আরিফের জুহু হলে। হলের সেই বিখ্যাত সুড়ঙ্গ ছাদ, রাতভর আড্ডা, রাতে শোবার জায়গা বাড়ন্ত, শীতের কনকনে ঠান্ডায় কাঁথা-কম্বল গায়ে জড়িয়ে সারারাত পলাশী থেকে টিএসসি, শাহবাগ থেকে নীলক্ষেত, হাঁটাহাঁটি করে রাত ফুরোলে, সকালের বাস ধরে যার যার ডেরায় ফেরা। আহা দিন!

সকালে যার সমালোচনা আর নিন্দায় মুখর হয়েছি, সন্ধ্যায় তার মুখ না দেখলে ভালো লাগেনি। তখন আমরা এমনই নিন্দুক ছিলাম, প্রবঞ্চক ছিলাম, স্বার্থপর ছিলাম, সবশেষে তখন আমরা অনেক বেশি বন্ধুও ছিলাম।

কর্মসূত্রে প্রথম যখন এ শহর ছেড়ে গেলাম, প্রথম দিকে খুব অস্থির লাগত। ফেরার জন্য সময়-অসময় মনটা ব্যাকুল হতো খুব। মনের সহজাত ধর্ম শেকড় ছড়ানো, কেবল সময় দিতে হয়। ধীরে ধীরে সে ব্যাকুলতা তার শক্তি হারিয়েছিল; তবুও হয়তো বদলিসূত্রে ফিরে আসতাম, কিন্তু এরই মধ্যে নতুন চাকরি, আবার নতুন কর্মস্থল; মাঝে পাঁচটি বছর; কালের বদলে মনেরও বদল ঘটেছে অনেক, তারও বেশি বদল ঘটেছে এই মহানগরীর।

যতবার আসি, টের পাই এ নগরী ক্রমশ আমার অচেনা হয়ে যাচ্ছে। নতুন চাকচিক্যরা ঢেকে দিচ্ছে আমার পুরোনো সব স্মৃতিময় দৃশ্যপট। এখন এ শহরে ঢুকলেই বাতাসটা কেমন ভারী ভারী লাগে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, এত মানুষ, এত ভিড়, হাঁসফাঁস লাগে, মনে হয় কাজ সেরে দ্রুত পালাতে পারলে বাঁচি।

চাইলে হয়তো এ শহরে আবার ফিরতে পারতাম; কিন্তু চাইনি; ভালোবাসা কমেছে এমন নয়, এ মহানগরের কাছে আমি কৃতজ্ঞ; জাহাজডুবিতে সাঁতরে তীরে ওঠা নাবিক যেমন কৃতজ্ঞ থাকে সমুদ্রের কাছে; কিন্তু জীবনের অভিজ্ঞতাকে দিয়ে জেনেছি, ভালোবেসে ফেলে আসা ভালোবাসার কাছে দ্বিতীয়বার ফিরতে নেই; তাতে প্রাপ্তির যোগ কিছু নেই, বরং এতদিন দূরে থেকে যে ভালোবাসাটুকু হৃদয়ে রক্ষিত ছিল, সেটুকুও নিঃশেষ হওয়ার ভয় থাকে।

তাই মনে হয়, কার কাছে ফিরব? সে কি আর তেমন আছে!! কাকে নিয়েই বা ফিরব, আমিও কি আছি আর সেই আমি...!!

লেখক: শিক্ষক।
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)

১৮১ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
ফেবু লিখন নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন